ক্রাইম

ভারত ফেরত তরুণীর মুখে নির্যাতনের বীভৎস বর্ণনা

Written by CrimeSearchBD

ভারতে পাচারের শিকার নারীকে নিপীড়নের ভিডিও প্রকাশের পর এ চক্রের হোতাদের গ্রেফতার করা শুরু হয়েছে। অন্যদিকে টিকটকের স্টার হওয়ার আশায় পাচার হওয়া ভারত ফেরত তরুণী পাচারকারী ও নিপীড়কদের বীভৎস নির্যাতনের ভয়ঙ্কর তথ্য তুলে ধরেছে পুলিশের কাছে। এই চক্রের মূল হোতা বস রাফি ছাড়াও টিকটক হৃদয় অন্যতম সমন্বয়ক। চক্রটির হাতেই গত কয়েক বছরে হাজারের অধিক মানুষ ভারতে পাচারের শিকার হয়েছেন। এদের মধ্যে কতজন পুরুষ ও কতজন নারী তা যাচাই করছে পুলিশ। এ ছাড়া গত মঙ্গলবার ফিরে আসা তরুণী জানিয়েছেন, তিনি ভারতে পাচার হওয়ার পর সেখানে অবস্থানের সময় সেখানে আরও বাংলাদেশি নারীকে দেখেছেনÑ যারা বিভিন্ন সময়ে পাচারের শিকার হয়েছেন।
বুধবার সকালে নিজ কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে ফেরত আসা তরুণীর বরাত দিয়ে এসব তথ্য তুলে ধরেন ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ। তিনি জানান, ভারতে পাচার হওয়া নারীর খবর প্রকাশের পর নিত্যদিন পাচারের অভিযোগ আসছে। সেগুলো তারা যাচাই-বাছাই করছেন।

সংবাদ সম্মেলনে তেজগাঁও বিভাগের ডিসি বলেন, ভারত ফেরত ওই তরুণীর সঙ্গে ২০১৯ সালে হাতিরঝিলে মধুবাগ ব্রিজে হৃদয় বাবুর পরিচয় হয়। টিকটক স্টার বানাতে চেয়ে ও ভালো বেতনের চাকরির অফার দিয়ে ভিকটিমকে প্রলুব্ধ করার চেষ্টা করে হৃদয় বাবু। ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে নারায়ণগঞ্জের অ্যাডভেঞ্চার ল্যান্ড পার্কে ৭০ থেকে ৮০ জনকে নিয়ে টিকটক হ্যাংআউট এবং ২০২০ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর গাজীপুরের আফরিন গার্ডেন রিসোর্টে ৭০০ থেকে ৮০০ তরুণ-তরুণীকে নিয়ে পুল পার্টির আয়োজন করে হৃদয় বাবু। ২০২১ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি কুষ্টিয়ায় বাউল লালন শাহর মাজারে আয়োজিত টিকটিক হ্যাংআউটে নিয়ে যাওয়ার কথা বলে আন্তর্জাতিকভাবে সক্রিয় এই মানব পাচারকারী চক্রের অন্য সহযোগীদের সহায়তায় কৌশলে ভিকটিমকে ভারতে পাচার করে হৃদয় বাবু।
ডিসি আরও জানান, পাচারকারী চক্রের খপ্পরে পড়ার পর থেকে পালিয়ে দেশে ফেরা পর্যন্ত তার লোমহর্ষক করুণ কাহিনি কল্পনাকেও হার মানিয়েছে। ভারতে পাচারের পর ভিকটিমকে ব্যাঙ্গালুরুর আনন্দপুর এলাকায় পর্যায়ক্রমে কয়েকটি বাসায় রাখা হয়। কয়েকদিন পর তাকে চেন্নাইয়ের একটি হোটেলে ১০ দিনের জন্য পাঠানো হয়। অমানবিক শারীরিক ও বিকৃত যৌন নির্যাতনে সময় সামান্য করুণাও দেখায়নি চক্রের সদস্যরা। বরং কৌশলে নেশাজাতীয় দ্রব্য খাইয়ে কিংবা জোরপূর্বক বিবস্ত্র করে ভিডিও ধারণ করে পরিবারের সদস্য ও পরিচিতদের তা পাঠিয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়ে জিম্মি করে রাখা হয় ভিকটিমকে। ভারতে পাচারের ৭৭ দিন পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল ভিডিওর ঘটনার ভিকটিম তরুণীর সহযোগিতায় হাতিরঝিল থানায় অভিযোগকারী ভিকটিমসহ আরও ২ বাংলাদেশি ভিকটিম এ চক্রের ব্যাঙ্গালুরুতে অবস্থিত আস্তানা থেকে পালিয়ে বাংলাদেশ আসতে সক্ষম হয়। ওই দুই তরুণীর বিষয়েও খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে।

ডিসি জানান, গ্রেফতারকৃত আসামি মেহেদী হাসান বাবু মামলার ভিকটিমসহ এক হাজারের বেশি মানুষ পাচারে জড়িত বলে স্বীকার করেছে। তবে এই সংখ্যার কতজন নারী ও পুরুষ তা যাচাই করা হচ্ছে। সে প্রায় ৭ থেকে ৮ বছর ধরে মানবপাচারে জড়িত। তার কাছ থেকে উদ্ধারকৃত মোবাইল ও ডায়রিতে হৃদয় বাবু, সাগর, সবুজ, ডালিম ও রুবেলের ভারতীয় মোবাইল নম্বর পাওয়া গেছে। পাশাপাশি তার কাছ থেকে উদ্ধারকৃত ডায়রিতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল ভিডিওর ঘটনার ভিকটিম জেসমিন মীমের নম্বর ও ভারতে পাচারকৃত উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ভিকটিমের নাম ও মানবপাচারে জড়িত ব্যক্তিদের বিস্তারিত তথ্য পাওয়া গেছে। গ্রেফতার অন্য দুই আসামি মহিউদ্দিন ও আব্দুল কাদের আলোচ্য ভিকটিমসহ পাঁচ শতাধিক ভিকটিমকে সীমান্তবর্তী এলাকায় পাচারের কাজে ব্যবহারের জন্য নির্মিত কক্ষে অবস্থানে সহায়তার পাশাপাশি মোটরসাইকেলযোগে সীমান্তের শেষ প্রান্তে ভারতীয় দালালের হাতে তুলে দেওয়ার কথা স্বীকার করেছে। এ চক্রের অন্য সদস্যদের ধরতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলেও জানান ডিসি শহিদুল্লাহ।
এর আগে ভারতে শারীরিক নির্যাতন ও বিকৃত যৌন নির্যাতনের শিকার ওই বাংলাদেশি তরুণী ৭৭ দিন পর দেশে ফিরে মঙ্গলবার রাতে হাতিরঝিল থানায় মানবপাচার প্রতিরোধ আইনে ১২ জনকে আসামি করে একটি মামলা করেন। এর মধ্যে ৫ জন বর্তমানে দেশে অবস্থান করছে বলে তথ্য ছিল পুলিশের কাছে। পরে মঙ্গলবার রাতে সাতক্ষীরার সীমান্তবর্তী দাবকপাড়া কালিয়ানী এলাকা থেকে ৩ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তারা হল মেহেদী হাসান বাবু, মহিউদ্দিন ও আবদুল কাদের।
অন্যদিকে টিকটকের মডেল বানানো ও উচ্চ বেতনে চাকরির প্রলোভনে নারী পাচারকারী চক্রের অন্যতম মূল হোতা আশরাফুল ইসলাম ওরফে বস রাফিসহ র‌্যাবের হাতে গ্রেফতার চারজনের পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। ভারতের বেঙ্গালুরুতে সম্প্রতি এক বাংলাদেশি তরুণীকে বর্বর নির্যাতন ও যৌন হয়রানির ঘটনায় মূল অভিযুক্ত সবুজ ভারতীয় পুলিশের গুলিতে আহত হয়েছে বলে ভারতীয় গণমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে।
বস রাফিসহ রিমান্ডে ৪ : টিকটকের ফাঁদে নারী পাচারকারী চক্রের অন্যতম মূল হোতা আশরাফুল ইসলাম ওরফে বস রাফিসহ র‌্যাবের হাতে গ্রেফতার চারজনের পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। অন্য তিন আসামি হলোÑ বস রাফির অন্যতম নারী সহযোগী সাহিদা বেগম ম্যাডাম সাহিদা (৪৬), মো. ইসমাইল সরদার (৩৮) ও মো. আব্দুর রহমান শেখ ওরফে আরমান শেখ (২৬)। বুধবার তাদের ঢাকা মহানগর হাকিম আদালতে হাজির করা হয়। এরপর মামলার সুষ্ঠু তদন্তের জন্য তাদের দশ দিনের রিমান্ডের আবেদন করে পুলিশ। শুনানি শেষে ঢাকা মহানগর হাকিম বেগম ইয়াসমিন আরা প্রত্যেকের পাঁচ দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন। এর আগে গত সোমবার রাতে ঝিনাইদহ ও যশোরসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় অভিযান চালিয়ে রাফিসহ চারজনকে গ্রেফতার করে র‌্যাব। রাফিচক্রের মাধ্যমে পাঁচ শতাধিক নারীকে পাচার করা হয়েছে বলে জানায় র‌্যাব।

About the author

CrimeSearchBD