ক্রাইম সারাদেশ

ছড়িয়ে পড়ছে ভয়ঙ্কর মাদক: সচ্ছল পরিবারের সদস্যরাই ক্রেতা

Written by CrimeSearchBD

মদ, গাঁজা, হেরোইন ও ইয়াবার বিস্তারের পাশাপাশি সম্প্রতি নতুন ধরনের ‘ভয়ঙ্কর’ কিছু মাদক ছড়িয়ে পড়ছে দেশে। তবে নতুন মাদকগুলো অত্যন্ত দামি হওয়ায় সচ্ছল পরিবারের সদস্যরাই এগুলোর ক্রেতা ও গ্রহণকারী।

বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া একশ্রেণির তরুণ-তরুণী এসব নতুন মাদকে আসক্ত। ভয়াবহ এসব মাদক গ্রহণে বড় ধরনের শারীরিক ক্ষতি ছাড়াও মৃত্যুর ঘটনাও ঘটছে। সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনায় ‘এলএসডি’ নামে নতুন এক ধরনের মাদকের সংশ্লিষ্টতা পাওয়ায় ফের আলোচনায় উঠে এসেছে ‘নতুন মাদক’।

এলএসডি ছাড়াও নিকট অতীতে ভয়ঙ্কর নতুন মাদকের মধ্যে খাট বা খাত, আইস, এনপিএস এ দেশে ধরা পড়েছে। একশ্রেণির অসাধু চক্র সীমান্তের পাশাপাশি আকাশপথ ও পার্সেলের মাধ্যমে দেশে এসব মাদক যুবসমাজে ছড়িয়ে দিচ্ছে। নতুন ধরনের ভয়ঙ্কর এসব মাদক ছড়িয়ে পড়ায় তরুণ-তরুণীসহ যুবসমাজ ধ্বংস হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সমাজবিজ্ঞানী ও অপরাধ গবেষকরা। তবে সব ধরনের মাদক প্রতিরোধে সোচ্চার বলে দাবি করেছে মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদফদরসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক সমাজ ও অপরাধ গবেষক তৌহিদুল হক বলেন, সময়ের পরিক্রমায় নতুন নতুন মাদক বিস্তার লাভ করে। এক সময় যুবসমাজের মধ্যে হেরোইন ছড়িয়ে পড়ে। পরে এক যুগ ধরে ইয়াবা মহামারি আকারে যুবসমাজসহ সব শ্রেণির মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। তিনি বলেন, এরই ধারাবাহিকতায় গত কয়েক বছরে কিছু নতুন মাদক এ দেশে প্রবেশ করেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি পারিবারিক ও সামাজিকভাবে সোচ্চার হলে এসব মাদকের ভয়াবহতা রোধ করা সম্ভব।

বাংলাদেশে কতগুলো মাদকের অস্তিত্ব এবং কী পরিমাণ মাদকসেবী রয়েছে তার সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই। তবে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার হিসাবে এ সম্পর্কে একটি ধারণা পাওয়া যায়। বাংলাদেশের জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের কয়েক বছর আগের একটি হিসাবে দেখা গেছে, দেশে মাদকাসক্ত মানুষের সংখ্যা প্রায় ৩৬ লাখ। তবে বেসরকারি হিসাবে এ সংখ্যা ৭০ লাখের কাছাকাছি। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মাদক ব্যবহারকারী আছে ঢাকা বিভাগে।

অন্যদিকে র‌্যাবের সাবেক কর্মকর্তা কর্নেল মো. এমরানুল হাসান কয়েকদিন আগে গণমাধ্যমকে দেওয়া এক তথ্য থেকে জানা যায়, বাংলাদেশে প্রায় ৭৫ লাখ মানুষ মাদকাসক্ত। বেকারদের একটি বড় অংশই মাদকে জড়িয়ে পড়েছে। বিভিন্ন উৎসের বরাতে তিনি বলেন, মোট মাদকাসক্তের ৪৮ শতাংশ শিক্ষিত ও ৪০ শতাংশ নিরক্ষর। এ ছাড়া সারা দেশে প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার মাদক কারবারি রয়েছে।

মাদক নিয়ন্ত্রণ সংশ্লিষ্ট সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্রে জানা যায়, দেশে ২০ ধরনের বেশি মাদকের অস্তিত্ব রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে ধরা পড়ার ভিত্তিতে এ সংখ্যা নির্ধারিত হয়ে থাকে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের হিসাব অনুযায়ী, দেশে ১৫-২০ রকমের মাদক ব্যবহার হয়। তবে র‌্যাব-পুলিশের অধিকাংশ অভিযানে ৬-১০ ধরনের মাদক ধরা পরে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দেশে পাওয়া মাদকের মধ্যে রয়েছে ইয়াবা, ফেনসিডিল, হেরোইন, গাঁজা, চোলাই মদ, দেশি-বিদেশি মদ, বিয়ার, রেক্টিফাইড স্পিরিট, ডিনেচার্ড স্পিরিট, তাড়ি, প্যাথেডিন, বুপ্রেনরফিন (টিডি জেসিক ইনজেকশন), বুপ্রেনরফিন (বনোজেসিক ইনজেকশন), ভাং, কোডিন ট্যাবলেট, ফার্মেন্টেড ওয়াশ (জাওয়া), মরফিন, আইচ পিল, ভায়াগ্রা, সানাগ্রা, টলুইন, পটাশিয়াম পারম্যাংগানেট ও মিথাইল-ইথাইল কিটোন। এর বাইরে গত কয়েক বছরের ভয়ঙ্কর মাদক হিসেবে যুক্ত হয়েছে আইস, খাট, ফেনইথাইলামিন। আর সর্বশেষ যুক্ত হলো অতি ভয়ঙ্কর মাদক এলএসডিও।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, সম্প্রতি ঢাবি শিক্ষার্থী হাফিজুর রহমানের মৃত্যুতে এলএসডির সম্পৃক্ততা মেলায় নতুন করে আলোচনায় এসেছে মাদকের ভয়াবহতা। গোয়েন্দারা জানায়, ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে গ্রুপ খুলে নতুন এসব মাদকের কেনাবেচা চলে। এলএসডিও ফেসবুকে গ্রুপ ও আইডি খুলে বিকিকিনি হয়। হাফিজের মৃত্যুর ঘটনার সূত্র ধরে গত বুধবার রাতে ৬ লাখ টাকা মূল্যের ২০০ ‘ব্লট’ (দাগ) এলএসডি মাদক জব্দ করেছে ডিবির রমনা বিভাগ। এগুলোর প্রতিটি ব্লটের মূল্য ৩-৪ হাজার টাকা।
এ ঘটনায় গ্রেফতার তিনজনের একজন নেদারল্যান্ডস থেকে কুরিয়ারে এলএসডি বাংলাদেশে আনে। তারা ‘বেটার ব্রাওরি অ্যান্ড বেয়ন্ড’ নামে ফেসবুক গ্রুপ খুলে এ মাদক বিক্রি করত। এ গ্রুপে প্রায় এক হাজার সদস্য রয়েছে। এলএসডি ছাড়াও এমডিএমএ, এনএম-ডাইমথাইলিটিপেনিয়া, সিলোসাইবিন মাশরুমসহ এলএসডি-২৫, অ্যাসিড, ডেলিসিড ইত্যাদি ছদ্মনামে ডাকে মাদকসেবীরা।

বিভিন্ন ওয়েবসাইটের তথ্যে দেখা গেছে, এলএসডি (লাইসার্জিক অ্যাসিড ডাইথ্যালামাইড) হচ্ছে স্বচ্ছ ও গন্ধহীন একটি পদার্থ। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিনের মতে, এটি পাউডার, তরল, ট্যাবলেট বা ক্যাপসুলের আকারে পাওয়া যায়। এ ধরনের মাদকের প্রভাবে সাধারণত মানুষ নিজের আশপাশের বাস্তবতাকে ভিন্নভাবে অনুভব করে এবং কখনও কখনও ‘হ্যালুসিনেট’ বা অলীক বস্তুও প্রত্যক্ষ করে থাকে।

ওয়েবসাইটের তথ্যে দেখা গেছে, বিশে^র নানা দেশে বিষণ্নতা, দুশ্চিন্তা, মানসিক অবসাদের মতো অসুস্থতার চিকিৎসায় এলএসডি শুরুর দিকে ব্যবহার হলেও পরে এটি মাদক হিসেবে প্রসার লাভ করায় নিষিদ্ধ করা হয়। রিসার্চগেট নামে একটি গবেষণা ওয়েবসাইটে ২০১৭ সালে প্রকাশিত গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ১৯৫৩ থেকে ২০০৭ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও কানাডায় এলএসডি গ্রহণের পরবর্তী জটিলতায় মোট ৬৪ জনের মৃত্যু হয়।

ডিএনসির কর্মকর্তারা জানান, সম্প্রতি এলএসডিসহ তিনজন গ্রেফতারের আগে ২০১৯ সালে রাজধানীর কাফরুলে পাঁচ গ্রাম এলএসডিসহ ইয়াসের রিদোয়ান আনাস নামে ধনাঢ্য পরিবারের এক তরুণকে গ্রেফতার করা হয়। ডিএনসির মতে, সেটিই ছিল দেশের প্রথম চালান। কানাডা থেকে আনাস এলএসডি এনেছিলেন বলে স্বীকার করেন। পরে আর এ মাদক ধরা পড়েনি। তবে এবার ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ছাত্র হাফিজুর রহমানের অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনায় এলএসডির সংশ্লিষ্টতা পেলে গোয়েন্দারা এটিকে নতুন বলে দাবি করে।

ডিএনসির মহাপরিচালক (ডিজি) মোহাম্মদ আহসানুল জব্বার বলেন, নতুন করে তিন বিশ^বিদ্যালয় শিক্ষার্থীর কাছে এলএসডি পাওয়ায় স্বল্প পরিসরে এটি ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। তাই আরও নজরদারি বাড়াতে হবে। তিনি বলেন, নতুন ধরনের ভয়ঙ্কর মাদক ছড়িয়ে পড়ছে বললে ভুল হবে। তবে গত কয়েক বছরে বেশ কয়েকটি চালান এ দেশে ঢুকলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধরা পরে। পরে সেভাবে আর বিস্তার লাভ করতে পারেনি। এ ছাড়া পার্সেলে অন্য ধরনের মাদক পাচার বন্ধে নতুন নতুন পদক্ষেপের পাশাপাশি নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

ভয়ঙ্কর মাদক ‘আইস’ : এলএসডি ছাড়াও আইস নামে আরও একটি ভয়ঙ্কর মাদক ধরা পড়েছে এ দেশে। কোথাও ক্রিস্টাল মেথ, এক্সথেসি, ‘ম্যাড-ড্রাগ’সহ বিভিন্ন নামে পরিচিত এ আইস। কাচ বা হীরকখণ্ডের মতো ছোট সাদা স্বচ্ছ দানা বলে এর নাম ‘ক্রিস্টাল মেথ’। যতদূর জানা যায়, ১৮০০ সালের শেষ দিকে যুদ্ধবিমান চালকদের সারাক্ষণ নির্ঘুম রাখতে জার্মানিতে এ ড্রাগ ব্যবহারে উৎসাহিত করা হতো। ২০১০ সালে অস্ট্রেলিয়া হয়ে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, লাওস, চীন, থাইল্যান্ড, মিয়ানমার হয়ে বাংলাদেশে এর ব্যবহার শুরু হয়। তবে দাম অনেক বেশি হওয়ায় সাধারণের মধ্যে এর ব্যবসা জমে ওঠেনি।

ক্রিস্টাল মেথ বা আইসের ক্ষতিকর দিকগুলোও খুবই ভয়ঙ্কর। ইয়াবা তৈরির মূল উপাদান অ্যামফেটামিন দিয়ে এ আইস তৈরি হয়। তবে ইয়াবায় অ্যামফেটামিন ২০ ভাগ আর আইসে ব্যবহার করা হয় শতভাগ। উন্নত পদ্ধতিতে প্রসেস করে অতি উচ্চমাত্রার মাদকদ্রব্য এটি। ফলে এটি সেবনে অনিদ্রা ও অতি উত্তেজনা তৈরি হয়। এর ফলে স্মৃতিভ্রম ও মস্তিষ্ক বিকৃতি, স্ট্রোক, হৃদরোগ, কিডনি, লিভার নষ্ট হয়। দাঁত ক্ষয়, অতিরিক্ত ঘাম, চুলকানি, রাগ ও আত্মহত্যার প্রবণতা তৈরি হয়। সেবনের পর রাগ-ক্ষোভ থেকে অন্যকে খুন করার ইচ্ছা জাগে। এ ছাড়া স্বাভাবিক যৌন ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গণ্যমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যে দেখা গেছে, ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে মোহাম্মদপুর থেকে ৮ গ্রাম আইসসহ তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়। একই বছরের ২৭ জুন আইসসহ নাইজেরীয় এক নাগরিককে আটক করা হয়। গত বছরের ৪ নভেম্বর ডিবি সদস্যরা ৬০০ গ্রাম আইসসহ ছয় ব্যক্তিকে গ্রেফতার করেন। এ ছাড়া চলতি বছর ১৪ জানুয়ারি রাজধানীর হাতিরপুল ও হাতিরঝিল মহানগর প্রজেক্ট এলাকায় পৃথক অভিযান চালিয়ে অন্য মাদকের সঙ্গে ৪৫ গ্রাম আইসসহ ৪ মাদক কারবারিকে গ্রেফতার করা হয়। ৫ মে কক্সবাজারের টেকনাফে পুলিশের অভিযানে ১০০ গ্রাম আইসসহ নুর মোহাম্মদ নামে এক রোহিঙ্গাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। অতি মূল্যবান এ ড্রাগ আসক্তদের কাছে ১০ গ্রাম এক লাখ টাকায় বিক্রি করা হয় বলে জানা গেছে।
গ্রিন টির মতো দেখতে ‘খাট’ : গত কয়েক বছরে ধরা পড়া প্রাণঘাতী ভয়ঙ্কর নতুন আরেক মাদকের নাম খাট বা খাত। দেখতে অনেকটা গ্রিন টির মতো ‘খাট’ বা ‘মিরা’ নামের এই উদ্ভিদটি নিউ সাইকোট্রফিক সাবস্ট্যান্সেস বা এনপিএস নামে পরিচিত।

অনেকের কাছে এটি ‘আরবের চা’ হিসেবে পরিচিত। মাদকসেবীরা এই পাতাটিকে চিবিয়ে বা পানিতে ফুটিয়ে চায়ের মতো পান করে থাকে। এই মাদক মূলত পূর্ব আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ বিশেষ করে সোমালিয়া ও ইথিওপিয়াতে উৎপন্ন হয়। ২০১৮ সালে ঢাকায় এনপিএসের কয়েকটি চালান শুল্ক বিভাগ বাজেয়াপ্ত করে। পরে ডিএনসসিহ আরও অনেকের অভিযানে এ মাদক ধরা পড়েছে।
খাটের অনেক ভয়াবহ প্রভাব রয়েছে। এর মধ্যে সেবনকারী নিজের প্রতি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে ও প্রচুর অর্থহীন কথা বলে, বিভ্রান্ত ও নির্লিপ্ত হয় ও নিজেকে নিঃসঙ্গ মনে করে। ঘুমের সমস্যা ও তীব্র মানসিক উদ্বেগ তৈরি হয়। বারবার চিবানোর ফলে দাঁত সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায় ও মুখে ক্যানসার হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এ ছাড়া যৌন ক্ষমতা হ্রাস পায়।

এদিকে গত বছর চট্টগ্রামে ফেনইথাইলামিন মাদক উদ্ধার করা হয়। গত বছর ১০ আগস্ট চট্টগ্রামের খুলশী থানার ফয়স লেক এলাকায় অভিযান চালিয়ে দেশে প্রথমবারের মতো ৭৭৭ গ্রাম ফেনইথাইলামিনসহ ফিরোজ খান নামের এক ব্যক্তিকে আটক করে র‌্যাব। মাদকটি দেখতে সাদা পাউডার জাতীয় এবং অনেকটা কোকেনের মতো বলে জানিয়েছে র‌্যাব।

About the author

CrimeSearchBD