খেলাধুলা

বাংলাদেশ-শ্রীলঙ্কা ওয়ানডে সিরিজ: রাঙানো গেল না শেষটা

Written by CrimeSearchBD

প্রথমবার সিরিজ জয়ের পর হাতছানি ছিল শ্রীলঙ্কাকে প্রথমবার ধবলধোলাই করার, সুযোগ ছিল বিশ^^কাপ সুপার লিগে নিজেদের ঝুলিতে আরও ১০ পয়েন্ট যোগ করার, সেই সুযোগ কাজে লাগানো গেল না। ফিল্ডারদের পিচ্ছিল হাত আর ব্যাখ্যাতীত বাজে ব্যাটিং প্রদর্শনীর কারণে রাঙানো গেল না শেষটা, অধরাই থাকল ‘৩-০’ আর ‘তিনে তিন’ করার রঙিন স্বপ্ন। তাতে প্রথম দুই ম্যাচ জিতে যে তিনটি রেটিং পয়েন্ট নিজেদের ঝুলিতে যোগ করেছিল টাইগারা, খোয়া গেল সেটিও। প্রাপ্তি কেবল ২-১ ব্যবধানে সিরিজ জেতাটাই।
টানা দুই হারের পর আহত সিংহের মতো শ্রীলঙ্কা শেষ ম্যাচে সর্বোচ্চটা দিয়ে হামলে পড়বে, সেটা জানাই ছিল। কিন্তু ব্যাটিং আর বোলিংয়ে এভাবে পরপর মার খাবে টাইগাররা, সেটা বোধকরি ভাবনার চৌহদ্দিতেও ছিল না কারও। সিরিজে প্রথমবার আগে ব্যাটিংয়ে নেমে টাইগার ফিল্ডারদের সহায়তায় শ্রীলঙ্কা তুলল ২৮৬ রান, জবাব দিতে নেমে ১৮৯ রানেই অলআউট বাংলাদেশ, ম্যাচের ৭.৩ ওভার বাকি থাকতেই আনুষ্ঠানিকভাবে লেখা হলো ৯৭ রানের হার। এই ম্যাচে স্বাগতিকদের হার অবশ্য আরও অনেক আগেই লেখা হয়ে গিয়েছিল। আসলে রান তাড়ায় জয়ের সামান্য সম্ভাবনাও এদিন জাগাতে পারেনি তারা।
৫১ রানের ইনিংস খেলে দলে থিতু হওয়ার দাবি জানিয়েছেন মোসাদ্দেক হোসেন। একপ্রান্ত আগলে মাহমুদউল্লাহ ৫৩ রান করে কমিয়েছেন কেবল হারের ব্যবধান। টপঅর্ডার আর লোয়ারঅর্ডার এদিনও চরমভাবে ব্যর্থ। ২৮ রান করা মুশফিকুর রহিমের ব্যাটে এদিন আগের দুই ম্যাচের ধারাবাহিকতা না থাকায় মিডলঅর্ডারও পুরোপুরি বিকশিত হতে পারেনি। তারপরও বাংলাদেশের ইনিংসে যে সর্বোচ্চ ৫৬ রানের জুটিটি হয়েছে, সেটা কিন্তু মিডলঅর্ডারেই এবং সেই জুটিতে মোসাদ্দেকের সঙ্গে মুশফিকই ছিলেন। এই কিপার-ব্যাটার যতক্ষণ ক্রিজে ছিলেন, জয়ের ক্ষীণ একটা আশা দল আর সমর্থকদের মধ্যে বেঁচে ছিল।

আরও একবার শতরানের আগেই (৮৪) চার উইকেট হারিয়ে নিজেদের সামর্থ্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে বাংলাদেশ। লিটন দাসকে বাদ দিয়ে যে নাইম শেখকে ওপেনিংয়ে তামিমের সঙ্গী বানিয়ে দেওয়া হলো, সেই নাইম ফিরলেন দ্বিতীয় ওভারের প্রথম বলেই, অফস্টাম্পের বাইরের বলে ব্যাট চালিয়ে। ব্যাট হাতে সাকিব ব্যর্থ আরও একবার, দশম ওভারে তামিম ফিরলেন তৃতীয় আম্পায়ারের দেওয়া আউটের সিদ্ধান্তে ক্ষোভ ঝাড়তে ঝাড়তে। মাত্র ১৬ রানে ৫ উইকেট নিয়ে বাংলাদেশের ব্যাটিং ধ্বসিয়ে দেওয়া দুস্মন্ত চামিরার বলটি উইকেটরক্ষকের গ্লাভসে জমা পড়ার আগে তামিমের ব্যাট ছুঁয়েছিল কি না, সেটা নিয়ে বিতর্ক হতেই পারে।
তামিম সে যাত্রায় বেঁচে গেলে বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ের চিত্র অন্যরকমও হতে পারত। কিন্তু পরের ব্যাটসম্যানরা যা করেছেন, তাতে এমন দাবি করার যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন থাকে। লঙ্কান বোলারদের কৃতিত্ব প্রাপ্য, তবে বড় রান তাড়ার চাপে স্বাগতিক শিবিরের বেশিরভাগ ব্যাটসম্যানই নিজেদের উইকেট ছুড়ে দিয়ে এসেছেন এলোমেলো শট খেলে। ব্যাটিংয়ে ছিল না পরিকল্পনার ছাপ। যে কারণে ভালো কোনো জুটি গড়ে ওঠেনি, বড় লক্ষ্য তাড়ায় যেটা সব থেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এদিন কেবল ব্যাটিংয়েই নয়, গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো বোলিংয়েও করা হয়ে ওঠেনি। এক্ষেত্রে অবশ্য ফিল্ডারদের দায়ই বেশি। মিস ফিল্ডিং হয়েছে, রানআউটের সহজ সুযোগ হয়েছে হাতছাড়া।
গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ক্যাচ ফেলে দেওয়ার ‘রীতি’ এদিন আরও বেশি করেই পরিলক্ষিত হলো। এক কুশাল পেরেরারই তিনটি ক্যাচ ফেলেছেন ফিল্ডাররা। একের পর এক জীবন পেয়ে লঙ্কান দলপতি খেলেছেন ১২০ রানের ইনিংস, তার ষষ্ঠ সেঞ্চুরি, বাংলাদেশের বিপক্ষে তৃতীয়। লঙ্কানদের সংগ্রহ এদিন তিনশ ছুঁই ছুঁই হওয়ার পেছনে তার ওই ইনিংসটিই ছিল মুখ্য। শুরু থেকেই তিনি ছিলেন আগ্রাসী, আরেক ওপেনার দানুস্কা গুনাথিলাকাও। তাতে ১১.১ ওভারেই ৮২ রানের জুটি। এই যুগলের সামনে টাইগার বোলাররা ছিলেন অসহায়। ওই ওভারের দ্বিতীয় বলে গুনাথিলাকাকে আউট করে জুটি ভাঙেন তাসকিন, ষষ্ঠ বলে ডানহাতি পেসার ফেরান পাথুম নিশাঙ্কাকেও।
তাসকিনের জোড়া আঘাতের পরও টাইগাররা চাপ সৃষ্টি করতে পারেনি পেরেরার দারুণ ব্যাটিংয়ের কারণে। যতটুকু করা গিয়েছিল, সেটাও আলগা করে দিয়েছেন ফিল্ডাররা। কুশাল মেন্ডিসকে নিয়ে তৃতীয় উইকেটে পেরেরা গড়েছেন ৬৯ রানের জুটি, ৩৪ রানেই সেটা ভাঙতে পারত যদি মেন্ডিসকে রানআউট করার সহজ সুযোগটা নষ্ট না হতো। রান নেওয়ার জন্য অনেকটা দৌড়ে গিয়েছিলেন, কিন্তু স্টাম্পের কাছে কেউ ছিলেন না আর ফিল্ডারও সরাসরি স্টাম্পে বল লাগাতে পারেননি। এর থেকেও বড় আফসোস সাকিবের বলে ৬৬ আর ৭৯ রানে পেরেরাকে জীবন দেওয়া। প্রথমবার কঠিন ক্যাচটা হাতে জমাতে পারেননি মোস্তাফিজ, পরের বার সহজ ক্যাচ ফেলেন আফিফ হোসেন।
মোস্তাফিজের বলে মিডঅফে সহজ ক্যাচ নিতে পারলেন না মাহমুদউল্লাহ, পেরেরা তখন ৯৯ রানে। পরের বলেই সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন লঙ্কান দলপতি। এরপর অবশ্য খুব বেশি চড়াও হতে পারেননি তিনি। পারেননি ৫৫ রানে অপরাজিত থাকা ধনঞ্জয়া ডি সিলভাও। সে কারণেই ৩৫.৫ ওভারে ২০০ পূর্ণ করার পরও ৩০০ ছাড়ানো হয়নি শ্রীলঙ্কার। শেষ ১৪.১ ওভার বেশ নিয়ন্ত্রিত বোলিং করেছে টাইগাররা, দিয়েছে ৮৬ রান। সেটাও শেষ ওভারে শরিফুল ইসলাম ১৮ রান দিয়েছেন বলেই। কিন্তু উইকেট সোনার হরিণ হয়েই থেকে গেছে টাইগার বোলারদের কাছে। ব্যতিক্রম ছিলেন তাসকিন। লঙ্কানদের পতন হওয়া ৬ উইকেটের চারটিই নিয়েছেন এই পেসার। সাকিব, মিরাজ, মোস্তাফিজ ছিলেন উইকেটশূন্য।
ফিল্ডিং, বোলিংয়ের পর ব্যাটিং ধূসরতার মধ্যে কিছুটা উজ্জ্বল ছিলেন তাসকিনই। কিন্তু দল হারলে ব্যক্তিগত সাফল্যও যে রঙহীন।

সংক্ষিপ্ত স্কোর
শ্রীলঙ্কা : ৫০ ওভারে ২৮৬/৬ (গুনাথিলাকা ৩৯, পেরেরা ১২০, নিশাঙ্কা ০, মেন্ডিস ২২, ধনঞ্জয়া ৫৫*, ডিকভেলা ৭, হাসারাঙ্গা ১৮, রমেশ ৮*; শরিফুল ১/৫৬, মিরাজ ০/৪৮, তাসকিন ৪/৪৬, মোস্তাফিজ ০/৪৭, সাকিব ০/৩৮)
বাংলাদেশ : ৪২.৩ ওভারে ১৮৯ (তামিম ১৭, নাইম ১, সাকিব ৪, মুশফিক ২৮, মোসাদ্দেক ৫১, মাহমুদউল্লাহ ৫৩, আফিফ ১৬, মিরাজ ০, তাসকিন ০, শরিফুল ৮, মোস্তাফিজ ০*; চামিরা ৫/১৬, বিনুরা ১/৩৩, হাসারাঙ্গা ২/৪৭, রমেশ ২/৪০)
ফল : শ্রীলঙ্কা ৯৭ রানে জয়ী
ম্যাচসেরা : দুস্মন্ত চামিরা
সিরিজসেরা : মুশফিকুর রহিম

About the author

CrimeSearchBD