অর্থনীতি

সয়াবিন তেল: লিটারে বাড়ল ১২ টাকা

Written by CrimeSearchBD

ভোজ্য তেলের বাজারে রীতিমতো নৈরাজ্য সৃষ্টি হয়েছে। বিশ্ববাজারে দাম বৃদ্ধির কথা বলে দেশের বাজারে ভোজ্য তেলের দাম বৃদ্ধিতে রেকর্ড সৃষ্টি করেছে ব্যবসায়ীরা। দেশের ইতিহাসে একবারে এক লিটার বোতলে ১২ টাকা এবং ৫ লিটারের বোতলে ৫৮ টাকা দাম বাড়ানোর ঘটনা ঘটেছে।

নৈরাজ্যের এটি গেল একটি দিন, এর আরেক দিকে হচ্ছে বৃহস্পতিবার দাম বাড়ানোর ঘোষণা দিয়ে বলা হয়, নতুন দাম কার্যকর হবে শনিবার (আজ) থেকে। অথচ শুক্রবার থেকেই এই বাড়তি দামে ভোজ্য তেল বিক্রি করেছে খুচরা ও পাইকারি ব্যবসায়ীরা।

আগের দামে কেনা হলেও শুধু ঘোষণার কারণেই বাড়তি দামে বিক্রি করে এক দিনে ব্যবসায়ীরা লুটে নিয়েছে শত শত কোটি টাকা। বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, ভোজ্য তেলের বাজারে এ নৈরাজ্যের শেষ কোথায়। ব্যবসায়ীরা দাবি জানাচ্ছে, আর সরকার দফায় দফায় দাম বাড়ানোর অনুমতি দিচ্ছে। দেশের মানুষের কথা কেউ ভাবছে না।

এদিকে ভোজ্য তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে গত ১০ এপ্রিল সয়াবিন ও পাম তেল আমদানিতে ৪ শতাংশ অগ্রিম কর প্রত্যাহার করে এনবিআর। এতে সুবিধা পেয়েছে ভোজ্য তেলের আমদানিকারক অর্থাৎ মিলমালিকরা। কিন্তু তার কোনো সুফল দেশের মানুষ পেল না, উল্টো দফায় দফায় দাম বাড়ায় ক্রেতার পকেট থেকে খসছে বাড়তি টাকা।

এ বিষয়ে কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট হুমায়ুন কবীর ভূঁইয়া শুক্রবার জানান, ‘বিশ^বাজারে ভোজ্য তেলের দাম বেড়েছে এটি অস্বীকার করার উপায় নেই। তাই বলে দেশের বাজারে দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে এভাবে নৈরাজ্য করা তো মোটেই সমীচীন নয়। আমি নৈরাজ্য বলছি এ কারণে যে, বিশ^বাজারে কিন্তু এক লাফে এত দাম বাড়েনি, যে হারে দেশের বাজারে দাম বাড়ানো হলো। একবারে কীভাবে লিটারে ১২ টাকা দাম বাড়ানো হয় সয়াবিনের। ৫ লিটারের বোতলে কীভাবে ৫৮ টাকা দাম বাড়ানো হয় একবারে। যারা দাম বাড়িয়েছে, তারা কি একবারও চিন্তা করেনি যে, দেশের মানুষের এত চড়া দামে ভোজ্য তেল কেনার সক্ষমতা আছে কিনা।’

তিনি আরও বলেন, ব্যবসায়ীরা সরকারের কাছে দাম বাড়ানোর দাবি তুলছে, সরকারও দাম বৃদ্ধির অনুমতি দিচ্ছে। সরকারও দেশের মানুষের কথা চিন্তা না করে ব্যবসায়ীদের স্বার্থ দেখছে। গত তিন-চার মাসে দেশের বাজারে কয়েক দফায় যে হারে ভোজ্য তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে, বিশে^র কোনো দেশে এত দাম বাড়ানো হয়নি। এর আগে যে কয়েকবার দাম বাড়ানো হয়েছে তাতে লিটারে ২ থেকে সর্বোচ্চ ৫ টাকা পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু এবার যে হারে বাড়ানো হলো তাতে দেশের মানুষের সঙ্গে অন্যায্য কাজ করা হলো। সরকারের কাছে আমার অনুরোধ, নতুন দাম পুনর্মূল্যায়ন করে যেন দাম কমানো হয়।

গত বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ভোজ্য তেলের দাম বৃদ্ধির যে ঘোষণা দেয় তাতে দেখা যায়, প্রতিলিটার খোলা সয়াবিন তেল ১২৯ টাকা, বোতলজাত সয়াবিন তেল ১৫৩ টাকা, পাম সুপার তেল ১১২ টাকা এবং ৫ লিটার সয়াবিন তেলের বোতল ৭২৮ টাকায় বিক্রি হবে। এর আগে রোজার মধ্যে প্রতিলিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম ৫ টাকা বাড়িয়ে ১৪৪ টাকা করার ঘোষণা দিয়েছিল ব্যবসায়ীরা। তবে মে মাসের শুরুতে বোতলজাত সয়াবিনের দাম সর্বোচ্চ ১৪১ টাকা নির্ধারণ করেছিল বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের অনুরোধে তা মেনেও নিয়েছিল ব্যবসায়ীরা। এ হিসাবে প্রতিলিটার সয়াবিন তেলের দাম বাড়ছে ১২ টাকা। সাম্প্রতিক সময়ে একবারে এতটা দাম বাড়ানোর নজির নেই।

সর্বশেষ ৩ মে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা করে করোনা ও ঈদের জন্য ‘মানবিক বিবেচনায়’ লিটারে ২ টাকা দাম বাড়ানোর অনুমোদন দেয়। তখন থেকে ১ লিটারের বোতল ১৪১, ৫ লিটারের বোতল ৬৭০ এবং খোলা সয়াবিন তেল ১১৯ টাকা দরে বিক্রি হয়ে আসছিল। ফলে বোতলজাত সয়াবিনে এক লিটারে বাড়ল ১২ টাকা, ৫ লিটারে বাড়ল ৫৮ টাকা আর খোলা সয়াবিনে বাড়ল লিটারে ১০ টাকা।

মিলমালিকরা ভোজ্য তেলের দাম বাড়াল, আর সরকার তাতে সায় দিল, কিন্তু বাজারে ভোজ্য তেল নিয়ে যে নৈরাজ্য দেখা দিয়েছে সেটি কে দেখবে। শুক্রবার রাজধানীর বেশ কয়েকটি বাজারে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, শনিবার থেকে নতুন দামে ভোজ্য তেল বিক্রি হওয়ার কথা থাকলেও শুক্রবার থেকেই বাড়তি দামে বিক্রি হয়েছে।

রাজধানীর কল্যাণপুর নতুনবাজার ঘুরে দেখা গেছে, ৫ লিটারের রূপচাঁদা, তীরসহ কয়েকটি ব্র্যান্ডের সয়াবিন মুদি দোকানদাররা বিক্রি করছে ৭২০ থেকে ৭২৮ টাকায়। ১ লিটার বিক্রি করছে ১৫৩ টাকায় এবং খোলা সয়াবিন বিক্রি করছে ১২৯ টাকায়। বাজারের সবচেয়ে বড় মুদি দোকান কবীর জেনারেল স্টোরের মালিক কবীর হোসেনের কাছে জানতে চাওয়া হয় আজই কেন বাড়তি দামে ভোজ্য তেল বিক্রি করছেন? জবাবে তিনি বলেন, মিলমালিকরা দাম বাড়ানোর এক সপ্তাহ আগে থেকেই তাদের বিক্রয় প্রতিনিধিরা বাড়তি দামে তেল দিয়েছে আমাদের। এ জন্য আমরাও বাড়তি দামেই বিক্রি করছি সয়াবিন তেল। তার মানে ঘোষণা দেওয়ার আগে থেকেই বাড়তি দামে ভোজ্য তেল সরবরাহ করেছে কোম্পানিগুলো।

একইভাবে এ বাজারের আরেক মুদি দোকানদার সানোয়ার হোসেন বলেন, যখন ভোজ্য তেলের দাম বাড়ে তার ৫ থেকে ৭ দিন আগেই কোম্পানিগুলোর বিক্রয় প্রতিনিধিরা আমাদের সিগন্যাল দেন যে আবার দাম বাড়বে। শুধু তাই নয়, যে দিন তারা দাম বাড়ানোর ঘোষণা দেয়, তার দু-তিন দিন আগে থেকেই ওই বাড়তি দামের ভোজ্য তেল তারা বাজারে সরবরাহ করে। সুতরাং এখানে আমাদের কিছুই করার থাকে না।

তবে একই বাজারের মুন্না জেনারেল স্টোরে দেখা গেল আগের মূল্য লেখা লেবেল দেওয়া বোতলজাত সয়াবিন রয়েছে। তিনিও বিক্রি করছেন বাড়তি দামে। তবে এক লিটারের গায়ে ১৪১ টাকা লেখা থাকায় তিনি খুব বেশি নয়, কারও কাছে ১৪৫ টাকায়, কারও কাছে ১৫০ টাকায় বিক্রি করছেন।

কারওয়ান বাজারের অন্যতম বৃহৎ মুদি দোকান ইউসুফ জেনারেল স্টোর। শুক্রবার কথা হয় স্টোরটির মালিক মো. ইউসুফের সঙ্গে। তিনি জানান, তিন দিন আগে বাড়তি মূল্যের অর্থাৎ ১৫৩ টাকার মূল্যমান লেখা বোতল আমাদের দোকানে সরবরাহ করেছে কোম্পানিগুলো। এ জন্য আমরাও বাড়তি দামে বিক্রি করছি।

পাইকারি বাজারেও শুক্রবার থেকেই বাড়তি দামে বিক্রি হচ্ছে সয়াবিন তেল। রাজধানীর বৃহত্তম পাইকারি বাজার মৌলভীবাজারে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, খোলা সয়াবিন এখানে এতদিন ১১৮ থেকে ১২০ টাকায় বিক্রি হলেও এখন বিক্রি হচ্ছে ১২২ থেকে ১২৫ টাকায়। পাইকারি ভোজ্য তেল ব্যবসায়ী সমিতির জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি মোহাম্মদ আলী ভুট্টো জানান, আমরা যতটা জেনেছি, কেউ কেউ বাড়তি দামে বিক্রি করছে, তবে শনিবার থেকেই বাড়তি মূল্যে বিক্রি হওয়ার কথা।

দাম বৃদ্ধির বিষয়ে বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও টিকে গ্রুপের পরিচালক মোস্তফা হায়দার জানান, বিশ্ববাজারে লাগাতার দাম বেড়েছে সয়াবিন ও পাম তেলের। ফলে বাধ্য হয়ে আমরা দেশের বাজারে দাম বাড়িয়েছি। আসলে আমরা বিশ্ববাজারের সঙ্গে দামের সমন্বয় করেছি মাত্র। এখনও বিশ্ববাজারে যে দাম তাতে আমাদের আমদানি ও উৎপাদন খরচ ধরলে দাম আরও বেশি হওয়ার কথা। কিন্তু আমরা যেটা না বাড়ালেই নয়, সেটা বাড়াতে বাধ্য হয়েছি।

আপনারা বলেছিলেন, শনিবার থেকে বাড়তি দাম কার্যকর হবে কিন্তু শুক্রবার থেকেই তো বাজারে বাড়তি দামে বিক্রি হচ্ছে এবং কয়েকটি কোম্পানি বাড়তি মূল্যেও বোতলজাত সয়াবিন বাজারে ইতোমধ্যে সরবরাহ করেছে। এ বিষয়ে তিনি বলেন, শনিবারের জায়গায় খোলাবাজারে যদি শুক্রবার থেকেই বাড়তি দামে বিক্রি হয় তা হলে তার দায় তো আর আমাদের নয়, এটি সরকারের দেখার বিষয়। আর আমার জানা মতে কোনো সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান আগে থেকে বাড়তি মূল্যের বোতলজাত সয়াবিন বাজারে সরবরাহ করার কথা না, যদি কোনো প্রতিষ্ঠান সেটি করে থাকে তা হলে তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বিশ্ববাজারের কী অবস্থা
বিশ্ববাজারে ভোজ্য তেলের দাম বাড়ছে মূলত গত বছরের সেপ্টেম্বর মাস থেকে। বাংলাদেশ ট্যারিফ কমিশন সূত্রে জানা গেছে, গত সেপ্টেম্বরে বিশ্ববাজারে প্রতিটন অপরিশোধিত সয়াবিনের দাম ছিল ৮৯০ থেকে ৯০০ ডলার। পরে দাম বাড়তে বাড়তে এখন সেটি ১৪শ ডলারে ঠেকেছে। বিশ্ববাজারের ভোগ্যপণ্যের মূল্য পর্যবেক্ষণ করে ইনডেক্সমুন্ডি নামে একটি প্রতিষ্ঠান। তাদের মূল্য পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, শুক্রবার বিশ^বাজারে প্রতিটন অপরিশোধিত সয়াবিন বিক্রি হয়েছে ১ হাজার ৪৪৯ ডলারে। সুতরাং বিশ্ববাজারে সয়াবিনের দাম এখনও বেশ চড়া।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পর্যবেক্ষণ : বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আমদানি ও অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য অনুবিভাগের দ্রব্যমূল্য পর্যালোচনা ও পূর্বাভাস সেলের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ২০১৪ থেকে ২০২০ সালের জুন পর্যন্ত ভোজ্য তেলের বাজার মোটামুটি স্থিতিশীল ছিল। জুন, ২০২০-এর পর থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে অস্বাভাবিক ঊর্ধ্বগতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। বিগত এক বছরে আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্য তেলের দাম প্রায় ১৬০ শতাংশ বেড়েছে। বিপরীতে দেশের বাজারে দাম বেড়েছে ৩৫ শতাংশ। সেই হিসাবে এর আগে দেশের বাজারে ভোজ্য তেলের দাম বাড়ানোকে যৌক্তিক মনে করছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।

এক বছর আগে আন্তর্জাতিক বাজারে সয়াবিন তেলের দাম ছিল প্রতিকেজি ৫২ টাকা ১১ পয়সা; বর্তমানে সেই দাম ১৩৫ টাকা ৮৪ পয়সা। আর দেশি বাজারে সর্বশেষ মূল্য ১৩০ টাকা। এক বছর আগে দেশে ভোজ্য তেলের দাম ছিল ৮৮ থেকে ৯৩ টাকা।

About the author

CrimeSearchBD