জাতীয় সংবাদ

বাংলাদেশি নাগরিকত্ব ছাড়ার সংখ্যা বাড়ছে

Written by CrimeSearchBD

ইফতেখার হাসান (পাসপোর্ট নং ইবি ০০৩২৪৬৮) নামে এক ব্যক্তি গত ১৬ মে পাসপোর্ট জমা দিয়ে হংকংয়ের নাগরিকত্ব গ্রহণের জন্য বাংলাদেশি নাগরিকত্ব পরিত্যাগের অনুমতিপত্র পেয়েছেন। একইভাবে গত ৫ এপ্রিল কানিশকা ঘোষ (পাসপোর্ট নং-বিএক্স ০১৫৩২৮৫) ও শাহ মো. আনোয়ারুল ইসলাম (পাসপোর্ট নং বিবি ০৭৮২২৩৪) যুক্তরাজ্যের নাগরিকত্বের জন্য বাংলাদেশি নাগরিকত্ব পরিত্যাগের অনুমতিপত্র পেয়েছেন। এভাবে গত সোয়া চার বছরে বাংলাদেশি নাগরিকত্ব ছেড়েছেন ১১৯৩ জন। এর মধ্যে করোনাকালে ছেড়েছেন ৩৩৫ জন।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বিদেশি নাগরিকত্ব গ্রহণের জন্য বাংলাদেশি নাগরিকত্ব পরিত্যাগের সংখ্যা বাড়ছে। ২০১৭ সালে নাগরিকত্ব ছেড়েছিলেন ১৫২ জন। ২০১৮ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৯ সালের জুন পর্যন্ত দেড় বছরে নাগরিকত্ব ছেড়েছেন ৪০৬ জন এবং ২০১৯ সালের জুলাই থেকে গত ১৬ মে পর্যন্ত নাগরিকত্ব ছেড়েছেন ৬৩৫ জন।

সুরক্ষা সেবা বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বাংলাদেশি পাসপোর্ট জমা দিয়ে তারা নাগরিকত্ব পরিত্যাগের আবেদন করার পর মন্ত্রণালয় তা মঞ্জুর করে। গত সোয়া চার বছরে ১৯টি দেশের নাগরিকত্ব নেওয়ার জন্য বাংলাদেশি নাগরিকত্ব পরিত্যাগের আবেদন এসেছিল। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৪৮২ জন বাংলাদেশি নাগরিকত্ব ছেড়ে জার্মানির নাগরিকত্ব নিয়েছেন। এ ছাড়া অস্ট্রেলিয়ার নাগরিকত্ব নেওয়ার জন্য ২৩৪, ভারতের নাগরিকত্ব নেওয়ার জন্য ১২৬, নরওয়ের জন্য ৫৩, সিঙ্গাপুরের জন্য ৯৯, হংকংয়ের জন্য ১১৫, কোরিয়ার জন্য ৫১, ইউক্রেনের জন্য ১৪, ইরানের জন্য ৯, ইংল্যান্ডের জন্য ৭, শ্রীলঙ্কার জন্য ৮ জন বাংলাদেশের নাগরিকত্ব ছেড়েছেন। এ ছাড়াও রাশিয়ার জন্য ৫, বুলগেরিয়ার জন্য ৬, ইন্দোনেশিয়ার জন্য ৫, সাইপ্রাসের জন্য ৫ এবং দক্ষিণ আফ্রিকা, কুয়েত ও কানাডার নাগরিকত্ব নেওয়ার জন্য একজন করে বাংলাদেশি নাগরিকত্ব ছেড়েছেন। এর বাইরে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব নেওয়ার জন্য এক ও চাকরি নেওয়ার জন্য একজন এবং ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে ৬ জন বাংলাদেশি নাগরিকত্ব ছেড়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান।
সর্বশেষ গত ১৬ মে ইফতেখার হাসান এবং ৫ মে স্বপ্না রানী দাস (পাসপোর্ট নং বিটি ০৬১৪২৫৫), মো. আব্দুল্লাহ হাসনাত (বিএল ০৫৬৮৩৯৩) ও আফিয়া আরিয়া হাসনাত (পাসপোর্ট নং বিটি ০০২৯৫৭১) নামে চারজন হংকংয়ের নাগরিকত্ব গ্রহণের জন্য বাংলাদেশি পাসপোর্ট জমা দিয়ে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পরিত্যাগ করেন। জার্মানির নাগরিকত্ব গ্রহণের জন্য গত বছরের ৫ অক্টোবর ইয়ামিন মার্শেল হাওলাদারসহ (পাসপোর্ট নং বিএল ০৬১৩০৭৬) এক দিনে ৯৯ এবং ২০১৯ সালের ২৮ আগস্ট এক দিনে ১৬৪ জনকে বাংলাদেশি নাগরিকত্ব পরিত্যাগের অনুমতিপত্র দেওয়া হয়। ভারতের নাগরিকত্ব নেওয়ার জন্য গত ৭ ফেব্রুয়ারি সৈয়দা অনিকা মুস্তফা (পাসপোর্ট নং বি জে ০৮২৮০৭৫), সমীর কান্তি বোস (পাসপোর্ট নং বি এম ০৭০৯৯৯৮) ও বিশাখা দত্ত (পাসপোর্ট নং ই এ ০৫২৪৯৯৩) বাংলাদেশি নাগরিকত্ব পরিত্যাগের অনুমতিপত্র পেয়েছেন।

এ ছাড়া ইরানের নাগরিকত্ব নেওয়ার জন্য মো. আল আমিনের (পাসপোর্ট নং-জেড ০৪৫১৮৬৯) বাংলাদেশি নাগরিকত্ব পরিত্যাগের আবেদন এবং রাশিয়ার নাগরিকত্ব নেওয়ার জন্য মাহমুদুল হকের (পাসপোর্ট নং-এ ০৯২৮৯২৭) আবেদন মঞ্জুর করে সরকার। আর বুলগেরিয়ার নাগরিকত্বের জন্য বাংলাদেশি নাগরিকত্ব ছেড়েছেন এমএ রহমান (পাসপোর্ট নং-বিএ ০৭১০১৫৬) নামে একজন।
সুরক্ষা সেবা বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, অস্ট্রেলিয়া ও জার্মানির নাগরিকত্ব নেওয়ার জন্যই সংশ্লিষ্ট দেশের বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে নাগরিকত্ব পরিত্যাগের আবেদন সবচেয়ে বেশি পাওয়া যায়। ওই কর্মকর্তারা জানান, বিদেশে অবস্থানরত কোনো ব্যক্তি যদি বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পরিত্যাগ করতে চান, তা হলে তাকে নির্ধারিত ফর্মে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করার পাশাপাশি নির্ধারিত ফি জমা দিতে হয়। এর জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা এটি যাচাই-বাছাইয়ের পর আবেদনকারীর নাগরিকত্ব পরিত্যাগের আবেদন সরকার গ্রহণ করেছে বলে সিদ্ধান্ত জানিয়ে প্রত্যয়নপত্র দেওয়া হয়। তবে এ ধরনের ঘটনা বেশি ঘটে যখন কোনো ব্যক্তি জার্মানি, অস্ট্রেলিয়া বা সিঙ্গাপুরের মতো কোনো দেশের নাগরিক হতে চান। ওই দেশ তিনটিতে নাগরিকত্ব পাওয়ার শর্ত হিসেবে নিজ দেশের নাগরিকত্ব বর্জন করতে হয়। এ ছাড়া বাংলাদেশের বিদ্যমান আইন অনুযায়ী ভারতসহ সার্কভুক্ত কোনো দেশের নাগরিকত্ব নিতে চাইলেও নিজ দেশের নাগরিকত্ব পরিত্যাগ করতে হয়। এক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তি যদি বাংলাদেশের নাগরিকত্ব ত্যাগ বা বর্জন করতে চান, তা হলে প্রথমেই তাকে বাংলাদেশের পাসপোর্ট সারেন্ডার করতে হবে। তবে ব্যক্তি যদি জন্মসূত্রে বাংলাদেশের নাগরিক হন, তা হলে যেকোনো সময় নিজের পাসপোর্ট পুনরায় ‘ক্লেইম-ব্যাক’ বা ফিরে পাওয়ার আবেদন করতে পারবেন।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগের একজন উপসচিব জানান, যুক্তরাজ্য বা যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব গ্রহণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশি নাগরিকত্ব পরিত্যাগের প্রয়োজন হয় না। তবে ওই দেশগুলোতে চাকরি করার ক্ষেত্রে অনেক সময় শর্ত হিসেবে নিজ দেশের নাগরিকত্ব পরিত্যাগের প্রয়োজন হয়। তিনি জানান, শুধু যে বিদেশি নাগরিক হওয়ার জন্য বাংলাদেশি নাগরিকত্ব ছাড়ে এমনটি নয়। অনেক দেশ রয়েছে যেখানে দ্বৈত নাগরিকত্বের সুযোগ থাকলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচন বা অন্য কোনো নির্বাচনে অংশ নিতে চাইলে নাগরিকত্ব পরিত্যাগের প্রয়োজন হয়।
এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব আব্দুল্লাহ আল মাসুদ চৌধুরী সময়ের আলোকে জানান, বিদেশে থেকে যারা নাগরিকত্ব পরিত্যাগ করতে চান তারা দূতাবাসের মাধ্যমে আবেদন পাঠালে তা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আসে। আইন অনুযায়ী সবকিছু ঠিক থাকলে আবেদন মঞ্জুর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আবেদনকারীর বাংলাদেশি পাসপোর্ট বাতিল করে বিষয়টি সংশ্লিষ্ট দেশের দূতাবাস, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পাসপোর্ট অধিদফতরকে জানিয়ে অনুলিপি দেওয়া হয়।

About the author

CrimeSearchBD