ক্রাইম

কোনো প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে সংবাদ সম্মেলন থেকে পালালেন নুসরাত

Written by CrimeSearchBD

কোনো প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে সংবাদ সম্মেলন থেকে তড়িঘড়ি করে পালালেন মোসারাত জাহান মুনিয়ার বোন নুসরাত জাহান তানিয়া। বুধবার জাতীয় প্রেসক্লাবে মুক্তিযোদ্ধা সন্তান কমান্ড এবং মুক্তিযুদ্ধ প্রজন্ম আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ ঘটনা ঘটে।
দুপুর ১২টায় শুরু হওয়া সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত সাংবাদিকদের প্রশ্ন ছিল, কীভাবে একজন কলেজপড়ুয়া তরুণী এত অভিজাত জীবনযাপন করেছেন? তার আয়ের উৎসই-বা কী ছিল? কাদের সঙ্গে তার সখ্য ছিল? ১ লাখ ৩০ হাজার টাকায় বাসা ভাড়া নেওয়ার জন্য নুসরাতের জাতীয় পরিচয়পত্র কেন ব্যবহার করা হয়েছিল? তিনি কেন বোনকে এত টাকায় বাড়ি ভাড়া করে দিলেন! মুনিয়া কয়টি বিয়ে করেছেন? কোনো প্রশ্নের জবাব নুসরাত দেননি বরং এসব প্রশ্নের জবাবে রীতিমতো বিব্রতবোধ করেন নুসরাত। একপর্যায়ে তিনি বলতে বাধ্য হন, তার বোন অবাধ্য ছিল। তিনি আরও বলেন, মুনিয়ার এসব আচরণ মেনে নেওয়া ছাড়া কোনো উপায় ছিল না। বোনকে তো আর ফেলে দিতে পারি না!

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া এক হুইপপুত্র শারুনের সঙ্গে তার নানা চ্যাটিংয়ের বিষয়ে প্রশ্নে নীরব ছিলেন নুসরাত। সদুত্তর মেলেনি শারুনকে অভিযুক্ত করে তাদের একমাত্র সহোদর ভাইয়ের মামলার আবেদনের বিষয়েও।
জানতে চাওয়া হয় মুনিয়ার চলচ্চিত্র প্রযোজকদের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়েও। নীরব থাকেন নুসরাত। থানায় যাওয়ার সময় নুসরাতের ব্যবহার করা তিনটি দামি গাড়ির মালিক কেÑ সেই প্রশ্নের জবাবও তিনি দেননি। কোনো প্রশ্নের জবাব না পেয়ে উপস্থিত সাংবাদিকরা হতবাক বনে যান। একপর্যায়ে মুনিয়ার মৃত্যুর ঘটনায় সুষ্ঠু বিচার চেয়ে দলবল নিয়ে সংবাদ সম্মেলন ত্যাগ করেন তিনি।কথায় আছে, অসৎ উদ্দেশ্যে করা কোনো কাজের ফল পাওয়া যায় না। উল্টো হিতে বিপরীত হয়। যেমনটা হয়েছে আলোচিত মোসারাত জাহান মুনিয়া হত্যার বিচার চাওয়ার নামে কাউকে ফাঁসানোর চেষ্টা করতে গিয়ে। যদিও মুনিয়া খুন হয়েছেন নাকি আত্মহত্যা করেছেন সে বিষয়টিই এখনও ফয়সালা হয়নি।
ঘটনার সূত্রপাত হয় ২৬ মে বুধবার জাতীয় প্রেসক্লাবে মুনিয়া হত্যার বিচারের দাবিতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলন থেকে। যেকোনো অপরাধ বা অন্যায়ের বিচার চেয়ে সংবাদ সম্মেলন করা একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কিন্তু প্রকৃত সত্য বেরিয়ে এলো যখন সংবাদ সম্মেলন শেষ হলো। জানা গেছে, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সন্তান কমান্ড নামে একটি সংগঠন বড় অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে এমন আয়োজনে অংশ নেয়। যার পিছনের কারিগর হত্যা মামলার আসামি জাতীয় সংসদের হুইপ ও চট্টগ্রাম-১২ (পটিয়া) আসনের সংসদ সদস্য সামশুল হক চৌধুরীর ছেলে নাজমুল করিম চৌধুরী শারুন। বিষয়টি আরও পরিষ্কার হলো যখন দেখা গেল সংবাদ সম্মেলন শেষে টাকার ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে প্রকাশ্যে তর্কাতর্কি।

অনুষ্ঠান শেষে প্রেসক্লাবের পিছনের গেটে কয়েকজন জড়ো হয়ে সংগঠনের এক নেতার কাছে টাকার ভাগ দাবি করলে জবাবে তিনি বলেন, আমি যা পেয়েছি তা আপানাদের ভাগ করে দিয়েছি। আমাকে কি আপনারা বিশ^^াস করেন না? তখন পিছনে থাকা এক নারী বলে ওঠেন, কীভাবে বিশ^^াস করি! যা কথা হয়েছিল তা তো পাইনি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সংগঠনের এক সদস্য বলেন, আমাদের এখানে আনার আগে বলা হয়েছিল মাথাপিছু ৫ হাজার টাকা করে দেওয়া হবে। কিন্তু সংবাদ সম্মেলন শেষে টাকা পেয়েছি মাত্র ৫০০ টাকা। শুনেছি শারুন সাহেব লাখ লাখ টাকা খরচ করেছেন আজকের সংবাদ সম্মেলনকে ঘিরে। অন্যায়ের বিচার চাইতে গিয়ে আমরাই বড় অন্যায়ের স্বীকার।
আরও জানা যায়, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সন্তান কমান্ডের সভাপতি মেহেদী হাসানের নেতৃত্বে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে অংশ নেওয়া অধিকাংশই ছিল বহিরাগত। এমনকি রাজাকারদের সন্তান ও জামায়াত-শিবির সদস্যদের নিয়ে এমন সংগঠন গড়েছেন। শারুনের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ পেয়ে এমন অনুষ্ঠান আয়োজন করেন তিনি। শুধু তাই নয়, সংবাদ সম্মেলনে অধিকাংশ প্রশ্নের জবাব দিতে পারেননি। বরং প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত সাংবাদিকদের কাছে ক্ষমা চাইতে বাধ্য হন। প্রকৃত অর্থে টাকার লোভে এমন আয়োজন করেছেন বলে তার সহযোগীরা জানিয়েছেন।
এদিকে বোন হত্যার বিচার চেয়ে মামলা করেই বড় বিপদে আছেন মুনিয়ার বড়ভাই সবুজ। বাদী হয়ে মামলা করার পর থেকে অনবরত হুমকির মুখে রয়েছেন তিনি। স্থায়ী নিবাস কুমিল্লার নিজ বাড়িতে থাকতে পারছেন না হামলার ভয়ে। কারণ আসামি শারুনের পক্ষ থেকে তাকে মামলা তুলে নিতে নানা হুমকি দেওয়া হচ্ছে অনবরত।
এ বিষয়ে আশিকুর রহমান সবুজ বলেন, ‘আমরা তিন ভাইবোনের মধ্যে মুনিয়া তৃতীয়। তার বয়স ২১ বছর। সে মাধ্যমিক শেষ করে মিরপুর ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজে একাদশ শ্রেণিতে পড়ত। আমরা পরিবারের পক্ষ থেকে পড়াশোনার জন্য যথাসাধ্য সহযোগিতা করে আসছিলাম। ইতোমধ্যে আসামি নাজমুল করিম চৌধুরী শারুনের সঙ্গে আমার বোনের পরিচয় হয়। পরিচয়ের পর থেকে মাঝেমধ্যে আসামি শারুনের সঙ্গে কথাবার্তা ও দেখা-সাক্ষাৎ হতো মুনিয়ার। আমার বোনকে হত্যার আগে তার কাছ থেকেই আমি এসব কথা জেনেছি ও শুনেছি। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখ ও পরিতাপের বিষয়, দুই বছর আগে আমার বোন নুসরাত জাহান তানিয়া ও তার স্বামী মিজানুর রহমানের জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করে গুলশানে ১২০ নম্বর সড়কের ১৯ নম্বর বাড়িতে ফ্ল্যাট ভাড়া করা হয়। সেখানে আমার ছোটবোন নুসরাত মুনিয়াকে ওই বাসায় অবস্থানের নির্দেশ দেয়। তাদের নির্দেশে মুনিয়া সেখানে থাকা শুরু করে। সেই বাসা থেকেই তার লাশ উদ্ধার করা হয়।’
তিনি বলেন, ‘আমার বোন আত্মহত্যা করতে পারে না। তাকে খুন করা হয়েছে। যে কারণে আমি মামলা দায়ের করি। মামলা দায়ের করার পর থেকেই আসামিপক্ষ ক্রমাগত হুমকি দিয়ে আসছে। হুমকির মুখে নিজের ঘরে থাকতে পারছি না। ভয় আমাকে তাড়া করছে। বোনের বিচার চাওয়া কি আমার অপরাধ? আমি বোন হত্যার বিচার চাই। আপনাদের সহযোগিতা চাই।’
অভিযোগ করে মুনিয়ার ভাই সবুজ বলেন, ‘মুনিয়ার অবাধ চলাফেরা শুরু থেকেই আমি অপছন্দ করতাম। এমনকি মুনিয়ার মৃত্যুর খবরও শুরুতে আমাকে দেওয়া হয়নি। ঘটনার দিন সন্ধ্যা ৬টা ৪৯ মিনিটে আমাকে জানানো হয় মুনিয়া আত্মহত্যা করেছে। মুনিয়ার বিষয়ে নুসরাত ও তার স্বামী অনেক তথ্যই গোপন করে আমার কাছে।’

About the author

CrimeSearchBD