শিক্ষা সারাদেশ

বিপাকে ৪ কোটি শিক্ষার্থী, ছুটি বাড়ল ১৭ দফা

Written by CrimeSearchBD

মহামারি করোনা পরিস্থিতির কারণে বুধবার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছুটির মেয়াদ আরও এক দফা বাড়ানো হয়েছে। এ পর্যন্ত ১৭ দফায় ছুটি বাড়াল শিক্ষা মন্ত্রণালয়। দফায় দফায় ছুটিতে ১৫ মাস ধরে দেশের সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে।

ফলে প্রাক-প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা স্তরে পড়ুয়া ৪ কোটি শিক্ষার্থী পড়েছে বিপাকে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে দীর্ঘমেয়াদের এই ছুটিকে নজিরবিহীন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে ইউনিসেফ।

গত ৩ মার্চ ইউনিসেফ প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, গত বছরের মার্চ থেকে এই বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বাংলাদেশের মতো এত দীর্ঘ সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে বিশে^র মাত্র ১৩টি দেশে। এই দেশগুলোর মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র দেশ হচ্ছে শুধু বাংলাদেশ। দীর্ঘ সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে ১৬ কোটি ৮০ লাখ শিক্ষার্থীর। এর মধ্যে বাংলাদেশেরই রয়েছে প্রায় কোটি শিক্ষার্থী। ভারত, শ্রীলঙ্কা, নেপাল ও পাকিস্তানসহ দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় সবকটি দেশ করোনার প্রভাব কমার সঙ্গে সঙ্গেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দিয়েছিল। তবে পরিস্থিতি খারাপ হলেও আবার বন্ধ করা হয়েছে। একমাত্র বাংলাদেশে টানা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হয়েছে।

কয়েক দশক ধরে পূর্বনির্ধারিত শিক্ষাসূচি পুরোটা এলোমেলো হয়ে গেছে। টানা বন্ধে পাবলিক বিশ^বিদ্যালয়ে দুই বছরের বেশি সেশনজট তৈরি হয়েছে। বিনা পরীক্ষায় ওপরের শ্রেণিতে উত্তীর্ণ করা হয়েছে প্রথম থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত। এই সময়ে কোনো পাবলিক পরীক্ষা নেওয়া হয়নি। ‘অটো পাস’ করেছে এইচএসসি শিক্ষার্থীরা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি প্রক্রিয়া থেমে রয়েছে। চলতি বছরের এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা নিয়েও রয়েছে অনিশ্চয়তা। অনলাইন, মোবাইল ও টেলিভিশনে পাঠদান চালু রয়েছে। তবে গবেষণা বলছে, নানা প্রতিবন্ধকতায় ৬৯ শতাংশ শিক্ষার্থীই দূরশিক্ষণের বাইরে রয়েছে। অন্যদিকে এক দল শিক্ষার্থী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার দাবি জানিয়েছে। অন্যদিকে অভিভাবকরা বলছেন, করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা হোক।

অনলাইনভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রম আরও বাড়ানো যেতে পারে। শতভাগ শিক্ষার্থীদের অনলাইনে যুক্ত হওয়ার জন্য সরকারের প্রণোদনার যুক্তিও তুলে ধরছেন তারা। দফায় দফায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছুটি কেবলই বাড়ানো হয়েছে। ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীদের অনেকে ঘাটতি নিয়ে ওপরের ক্লাসে উঠেছে। কতটুকু শিখল, সেটাও যাচাই করা যাচ্ছে না।

গবেষণায় দেখা গেছে, করোনাভাইরাসের কারণে বন্ধ প্রাথমিকের ১৯ শতাংশ এবং মাধ্যমিকের ২৫ শতাংশ শিক্ষার্থী শিখতে না পারার বা শিক্ষণ ঘাটতির ঝুঁকিতে আছে। এমন অবস্থায় শিক্ষার এ ক্ষতি পুষিয়ে নিতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার তাগিদ দিচ্ছেন শিক্ষাবিদরা। যেসব এলাকায় সংক্রমণ নেই বা কম, সেসব এলাকায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ারও সুপারিশ করেছেন তারা।
এডুকেশন ওয়াচের সমীক্ষায় বলা হয়, মহামারি করোনাকালে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে ৬৯ শতাংশ শিক্ষার্থীই দূরশিক্ষণের বাইরে রয়েছে। সংসদ টিভি, অনলাইন, রেডিও ও মোবাইল ফোন প্রক্রিয়ায় দূরশিক্ষণে ৩১ দশমিক ৫ শতাংশ শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করেছে। আর ৬৯ দশমিক ৫ শতাংশ অংশগ্রহণ করেনি। তবে ৩৭ দশমিক ৮ শতাংশ শিক্ষার্থী পরিবার বা অন্যদের কাছ থেকে এ কার্যক্রমে সহায়তা পেয়েছে। ওই প্রতিবেদনেও ঝরে পড়াকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

ভার্চুয়ালি শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আগামী ১২ জুন পর্যন্ত বন্ধের নতুন তারিখ জানান। শিক্ষাক্ষেত্রে ক্ষতি পুষিয়ে নিতে এক গুচ্ছ পরিকল্পনা দেন তিনি। তিনি বলেন, এক বছরের বেশি সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীদের কি পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে তা খতিয়ে দেখতে সরকার তথ্য সংগ্রহ করছে। যেহেতু আমরা এখন নানা ধরনের প্রযুক্তির ওপর নির্ভর হয়ে গেছি, তাই সেই ক্ষতিটা আরও কম সময়ে আমরা পূরণ করতে পারব। ক্ষতিটা নিরূপণ যত তাড়াতাড়ি হবে, ক্ষতি কীভাবে কত সময়ে পূরণ করতে পারব; সেটা বুঝতে পারব।

মন্ত্রী বলেন, গত বছরের এইচএসসি পরীক্ষার মতো আর পরীক্ষা ছাড়া এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার মূল্যায়ন হবে না। সংক্ষিপ্ত পাঠ্যসূচির ভিত্তিতে শ্রেণিকক্ষে ক্লাস করিয়েই এ বছরের এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা হবে। একইভাবে ২০২২ সালের এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষাও হবে সংক্ষিপ্ত পাঠ্যসূচির ভিত্তিতে। তবে অষ্টম শ্রেণির জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) ও জুনিয়র দাখিল সার্টিফিকেট (জেডিসি) পরীক্ষার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হলো, যদি পরীক্ষা নেওয়ার মতো পরিস্থিতি হয় তা হলে পরীক্ষার মাধ্যমে মূল্যায়ন করা হবে। অন্যথায় অ্যাসাইনমেন্টের ভিত্তিতে এই পরীক্ষার মূল্যায়ন হবে।

শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি বলেন, এ বছর সংক্ষিপ্ত পাঠ্যসূচির ভিত্তিতে ৬০ দিন ক্লাস করিয়ে এসএসসি এবং ৮৪ দিন ক্লাস করিয়ে এইচএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। আগামী বছরের এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষাও হবে সংক্ষিপ্ত পাঠ্যসূচির ভিত্তিতে। এজন্য এসএসসি পরীক্ষার জন্য ১৫০ দিন এবং এইচএসসি পরীক্ষার জন্য ১৮০ দিন ক্লাস করানোর জন্য সংক্ষিপ্ত পাঠ্যসূচি করা হয়েছে। এ ছাড়া এসব শিক্ষার্থীর জন্য আগামী জুন থেকে সপ্তাহে দুটি করে অ্যাসাইনমেন্ট দেওয়া হবে। তিনি বলেন, স্কুল-কলেজ হয়তো আগেই খুলে দেওয়া যাবে। কিন্তু বিশ^বিদ্যালয় খোলার বিষয়টি হয়তো টিকার ওপর খানিকটা নির্ভর করছে। শিক্ষার্থীদের টিকা দেওয়ার তথ্য বিশ^বিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) কাছে চাওয়া হয়েছে। তবে ধরে নেওয়া যায়, যেহেতু শিক্ষার্থীদের বয়স ৪০-এর নিচে, তাই অধিকাংশই হয়তো টিকা নিতে পারেননি। তবে টিকা দিয়ে বিশ^বিদ্যালয় ছাড়াও বিকল্প কী করা যায়, সেটা ইউজিসি ও বিশ^বিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে আলোচনা করে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। বিশ^বিদ্যালয়গুলো অনলাইনে পরীক্ষা নিতে পারবে।

প্রাথমিকে শতভাগ শিক্ষার্থী ভর্তির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করেছিল বাংলাদেশ। মহামারি করোনা পরিস্থিতিতে আর্থিক দৈন্যদশায় এবং অনেকেই শহর ছেড়ে গ্রামে চলে গেছে। এতে শিক্ষার্থীদের একটি অংশের ঝরে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ড্রপআউট শিক্ষার্থী বাড়লে দেশে শিশুশ্রম বাড়বে।

শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের আবারও স্কুলমুখী করা সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। সরকারের নানা উপবৃত্তি কার্যক্রমের কারণে দেশে মেয়েদের শিক্ষার হার বাড়ছে। ইতোমধ্যে প্রাথমিক, মাধ্যমিকে ছেলে ও মেয়েদের অংশগ্রহণ সমানে সমান। উচ্চ মাধ্যমিকেও মেয়েরা শিক্ষায় এগিয়েছে। কিন্তু করোনাকালে মেয়েদের শিক্ষায় ড্রপআউট বাড়ছে। এতে করে অনেক এলাকায় বাল্যবিয়ে বেড়েছে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছুটি বাড়ানোর সিদ্ধান্তে সরকারকে সাধুবাদ জানিয়ে অভিভাবক ঐক্য ফোরামের সভাপতি জিয়াউল কবির দুলু বলেন, দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। শিক্ষার্থীদের ওপর এর প্রভাব পড়েছে। তবে আমাদের অভিভাবকদের দাবি হচ্ছে করোনা মহামারি নিয়ন্ত্রণে না আসা পর্যন্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হোক। তিনি বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দিলে সংক্রমণ বাড়বে। কারণ ছেলেমেয়ে নিয়ে অভিভাবকরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভিড় করবেন। সামাজিক দূরত্ব মানা সম্ভব হবে না। স্বাস্থ্যবিধি ব্যাহত হবে। তিনি বলেন, সরকারের কাছে অনুরোধ অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রম আরও জোরদার করা। শিক্ষকদের এই প্রযুক্তিতে আরও দক্ষ করে তোলা।

এ প্রসঙ্গে সাবেক উপদেষ্টা ও গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। করোনাকাল কাটিয়ে শিক্ষাকে সচল করা নতুন চ্যালেঞ্জ। ইতোমধ্যে ড্রপআউট ও বাল্যবিয়ে বিষয় দুটি বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। তিনি বলেন, শিক্ষাদানে ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার হচ্ছে। কিন্তু সে ক্ষেত্রে সবাই এই প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারছে না। সবার জন্য শিক্ষা নিশ্চিতের বিষয়টিতে জোর দেওয়ার দাবি জানান তিনি। আগামী বাজেটেও তিনি এর প্রতিফলন আশা প্রকাশ করেন।

About the author

CrimeSearchBD