আন্তর্জাতিক আবহাওয়া

ঘূর্ণিঝড়ে লন্ডভন্ড ওড়িশা নিহত ২

Written by CrimeSearchBD

ভারতের ওড়িশার বালেশ্বর দক্ষিণে আছড়ে পড়েছে ঘূর্ণিঝড় ইয়াস। ভারতীয় সময় সকাল ৯টা ১৫ মিনিট নাগাদ স্থলভাগে আছড়ে পড়ে ইয়াস। স্থলভাগে আছড়ে পড়ার সময় ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের গতিবেগ ঘণ্টায় ছিল ১৩০ থেকে ১৪০ কিলোমিটার। পরে এটি ১৫৫ কিলোমিটারে পৌঁছে যায়। প্রায় ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা ধরে চলে ইয়াস তাণ্ডব।

ভারতের আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, ওড়িশার স্থলভাগে আঘাত করে ঘূর্ণিঝড় ইয়াস চলে যাবে ঝাড়খণ্ডের দিকে। এদিকে ঘূর্ণিঝড়ের জেরে পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম সমুদ্রসৈকত দীঘায় ব্যাপক জলোচ্ছ্বাস শুরু হয়। সমুদ্রের ঢেউ পৌঁছে যায় নারিকেল গাছের মাথার ওপরে। পানি ঢুকে যায় উপকুলবর্তী গ্রামগুলোতে।

রাস্তায় পানির তোড়ে ভেসে যায় একের পর এক গাড়ি। সমুদ্রের ধারের গার্ডওয়াল ছাপিয়ে পানি উঠে যায় দীঘার রাস্তায়। রাস্তা দিয়ে বইতে শুরু করে তীব্র পানির স্রোত। পানিতে একের পর এক ডুবে যায় রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা গাড়ি। রাস্তার ওপর দিয়ে প্রবল গতিতে পানির স্রোত বয়ে যেতে থাকে। আর সেই স্রোতে ভেসে যেতে শুরু করে একাধিক গাড়ি ও মোটরসাইকেল। একই সঙ্গে রাস্তার ধারে থাকা দোকানগুলোর ভেতরে পানি থই থই অবস্থা। পানিতে ভেসে যায় দোকানের সামগ্রী। এই দুর্যোগের মধ্যেই অনেক দোকানদার চেষ্টা করছে যদি কিছু জিনিস বাঁচানো যায়। স্মরণকালের মধ্যে সমুদ্রের পানির এমন ছবি মনে করতে পারছে না দীঘাবাসী। দীঘার রাস্তার পাশে থাকা একের পর এক দোকানের চাল উড়ে গেছে। গার্ডওয়ালের পাথর উড়িয়ে এনে ফেলেছে রাস্তার ওপরে।

ইয়াসের প্রভাবে লন্ডভন্ড চারদিক। ভেঙে গেছে কংক্রিটের রাস্তাও। উত্তাল সমুদ্রের পানির তোড়ে ভেঙে গেছে সমুদ্রের ধারের একাধিক বোল্ডারের পাঁচিল। গার্ডওয়াল টপকে পানি ঢুকছে জনপদে। দীঘার মতো একই ছবি মন্দারমনিতেও। মন্দারমনিতে ঝড়ের দাপটে উড়ে গেছে একের পর এক হোটেলের চাল। দীঘা ও শঙ্করপুরে আছড়ে পড়েছে ৩০ ফুট উচ্চতার ঢেউ। ডুবেছে সাগরে কপিলমুনির আশ্রম। কপিলমুনি আশ্রমে বুকসমান পানি। পশ্চিমবঙ্গের পূর্ব মেদিনীপুর থেকে দক্ষিণ চব্বিশপরগনা জেলাজুড়ে একের পর বাঁধ ভেঙে বানভাসি হতে শুরু করেছে গ্রামের বাসিন্দারা। গ্রামের পর গ্রাম প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। কোমরসমান পানির তলায় বিভিন্ন গ্রাম। দীঘার পাশাপাশি শঙ্করপুর ও মন্দারমনিতেও ভেঙে গেছে বাঁধ। ভেঙে গেছে রাস্তাও। সমুদ্রের পানি ঢুকেছে মৌসুনি দ্বীপের গ্রামেও। উদ্ধার কাজে নেমে পড়েছে সেনা ও বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীর জওয়ানরা।

সমুদ্রের পানিতে প্লাবিত পশ্চিমবঙ্গের দীঘা, তাজপুর, মন্দারমনিসহ বিস্তীর্ণ এলাকা। অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গের পূর্ব মেদিনীপুরে নদীর বাঁধ ভেঙে প্লাবিত হচ্ছে একের পর এক গ্রাম। শুধু দীঘাতে ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় সেনাবাহিনীর ৭০ জনের দল গিয়ে পৌঁছেছে। দক্ষিণ চব্বিশপরগনার কুলতলি ও গোসাবার বিস্তীর্ণ এলাকা পানির তলায় চলে গেছে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছেন, শঙ্করপুর, দীঘা ও মন্দারমনির বড় অংশ বন্যাকবলিত হয়ে পড়েছে। লো লাইন এলাকায় বন্যা হয়েছে। পূর্ব মেদিনীপুরে মোট ৫১টি বাঁধ ভেঙে গেছে। দক্ষিণ চব্বিশপরগনার ১৫টি গ্রামের বাড়িঘর পানির তোড়ে ভেসে গেছে। নন্দীগ্রামের সোনাচূড়াসহ বিভিন্ন গ্রাম ঝড়ের তাণ্ডবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়েছে।

প্রাথমিক পাওয়া খবর অনুযায়ী, ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের তাণ্ডবে রাজ্যে প্রায় ২০ হাজার বাড়ি ভেঙে পড়েছে। ঝড়ের ব্যাপক প্রভাব পড়েছে পশ্চিমবঙ্গের সুন্দরবন সন্নিহিত পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ চব্বিশপরগনা জেলাতেও। সেখানে গোসাবা, ক্যানিং, কুলতলি, ফ্রেজারগঞ্জ, সাগর, পাথরপ্রতিমাসহ বিভিন্ন এলাকার নদীর বাঁধ ভেঙে পানি ঢুকে পড়েছে গ্রামের পর গ্রামে। পশ্চিমবঙ্গের ৫১টি বাঁধে ফাটল ধরেছে। এ ছাড়া বহু নদীর বাঁধেও দেখা দিয়েছে ফাটল। ইয়াস মোকাবিলায় মঙ্গলবার সারারাত পশ্চিমবঙ্গের মুখ্য প্রশাসনিক কার্যালয় নবান্নে রাত জেগে তদারক করেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

তিনি জানান, প্রায় ১৫ লাখ মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। দুর্যোগ মোকাবিলায় নামানো হয়েছে ১৭ কোম্পানি সেনাবাহিনী। পশ্চিমবঙ্গের হাওড়া, হুগলি এবং পূর্ব ও পশ্চিম মেদিনীপুরে নামানো হয়েছে সেনা। নামানো হয়েছে দুর্যোগ মোকাবিলা বাহিনীকেও। রাজ্যের উপকূলবর্তী এলাকায় ঘূর্ণিঝড়ের পরও চলছে বৃষ্টি এবং ঝড়ো হাওয়ার দাপট। তবে ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের প্রভাব আম্ফানের মতো পড়েনি কলকাতার বুকে। আবহাওয়া দফতরের পূর্বাঞ্চলীয় প্রধান সঞ্জীব বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছেন, কলকাতার বুকে আম্ফান ঘূর্ণিঝড়ের মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়নি।

ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের প্রভাবে শহর কলকাতায় ৬৫ থেকে ৭৫ কিলোমিটার বেগে ঝড়ো হাওয়া বয়ে যায়, যা বেড়ে সর্বোচ্চ ঘণ্টায় ৮০ থেকে ৮৫ কিলোমিটার পর্যন্ত হয়। তবে ইয়াসের প্রভাবে কলকাতায় ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা থাকছেই। তবে ইয়াসের ল্যান্ডফলে ভয়ঙ্কর অবস্থা ওড়িশার বালেশ্বর ও ধামরায়। সেখানে প্রাথমিক ল্যান্ডফলেই দিশেহারা অবস্থা। স্থানীয় মানুষজনের মতে, তারা জীবদ্দশায় এমন প্রাকৃতিক তাণ্ডব দেখেননি। ভেঙে পড়েছে একের পর এক গাছ, কাঁচা বাড়ি, লাইটের পোস্ট। ইয়াসের ল্যান্ডফলের পরও সেখানে ঝড়ের সঙ্গে চলছে প্রবল বৃষ্টিপাত।

About the author

CrimeSearchBD