সারাদেশ

স্টেশন বাড়লেও রয়েছে জনবল-সরঞ্জাম সঙ্কট

Written by CrimeSearchBD

রাজধানীতে জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে নতুন নতুন জনবসতি। অপরিকল্পিত জনবসতি বাড়ার কারণে অগ্নি দুর্ঘটনাও ঘটছে অনেক বেশি। অন্যদিকে দুর্ঘটনা প্রতিরোধে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ফায়ার স্টেশনের সংখ্যা বাড়লেও সেই হারে বাড়েনি জনবল ও আধুনিক সরঞ্জাম। ফলে বর্তমান সময়ে এসেও অগ্নিনির্বাপণে হিমশিম খেতে হচ্ছে ফায়ার সার্ভিসকে। একইভাবে ছোট দুর্ঘটনা বা ভবনে অগ্নিনির্বাপণের সক্ষমতা থাকলেও বহুতল ভবনের ক্ষেত্রে অনেক বেগ পেতে হয়। সম্প্রতি বেশকিছু বহুতল ভবনে অগ্নিনির্বাপণের সময় সে সঙ্কট চোখে পড়েছে। তবে ফায়ার সার্ভিস সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমানে সবধরনের অগ্নিনির্বাপণের সক্ষমতা রয়েছে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদফতরের। তাদের মতে, আগুন নেভাতে বিলম্ব ও অন্যান্য সঙ্কটের জন্য অপরিকল্পিত ভবন নির্মাণসহ অবকাঠামোগত সমস্যা বেশি দায়ী। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর দেশে দুশোর বেশি নতুন ফায়ার স্টেশন স্থাপিত হয়েছে। একই সঙ্গে জনবলও বেড়েছে অনেক। ধীরে ধীরে দেশের প্রতিটি উপজেলায় একটি করে ফায়ার স্টেশন স্থাপনের কাজও এগিয়ে যাচ্ছে। এই সময়ে অনেক আধুনিক সরঞ্জামও যুক্ত হয়েছে বাহিনীতে। পাশাপাশি দক্ষ জনবল তৈরিতে মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় একাডেমি নির্মাণের জন্য জমি অধিগ্রহণের কাজও শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ফায়ার সার্ভিসের জন্য অন্তত ৩০ হাজার জনবল প্রয়োজন। একই সঙ্গে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বৈষম্য নিরসনে নতুন করে ভাবনা-চিন্তা করা উচিত।
অগ্নিনির্বাপণের বিভিন্ন ঘটনা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ৫ নভেম্বর রাজধানীর ডেমরার কোনাপাড়ার মাদ্রাসা রোডে বহুতল পাশা টাওয়ারে অগ্নিকাণ্ডের পর সেটি নিয়ন্ত্রণে আনতে যথেষ্ট বেগ পেতে হয় ফায়ার সার্ভিসকে। ১০ ঘণ্টা ধরে সংস্থার ১৬টি ইউনিট চেষ্টা চালিয়ে যখন আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে ততক্ষণে পুড়ে যায় ভবনটির ছয়টি তলা। একইভাবে গত বছরের ২০ ফেব্রুয়ারি পুরান ঢাকার চূড়িহাট্টার ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ও একই বছরের ২৮ মার্চ বনানীর একটি বহুতল ভবনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা নিয়ন্ত্রণে আনতে হিমশিম খেতে হয় ফায়ার সার্ভিসকে। আগুন নির্বাপণের আগেই ভবনের বেশিরভাগ অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি অনেক প্রাণহানি ঘটে।
ফায়ার সার্ভিস সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জনবসতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রাজধানীসহ সারা দেশে ফায়ার স্টেশনের সংখ্যাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু সে হারে পর্যাপ্ত জনবল ও আধুনিক সরঞ্জাম বাড়েনি। ফায়ার সার্ভিসের তথ্যে দেখা গেছে, ১০ বছর আগে সারা দেশে ২০৪টি ফায়ার স্টেশন ছিল। বর্তমানে সে সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৩৬টি। অথচ এই সময়ে একইভাবে জনবল বাড়েনি। বর্তমানে এ অধিদফতরের প্রাধিকারপ্রাপ্ত মোট জনবল ১৩ হাজার ১১০ জন। এর মধ্যে কর্মরত ১০ হাজার ৮৯৩ জন, যেখানে ফায়ারম্যানের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রথম শ্রেণির ফায়ার স্টেশনগুলোতে গড়ে ৩৫ জন করে জনবল থাকার কথা। যাদের মধ্যে ফায়ারম্যান থাকার কথা ২২ জন। কিন্তু বাস্তবচিত্র ভিন্ন। প্রথম শ্রেণির স্টেশনেও ১৫-১৬ জনের বেশি ফায়ারম্যান নেই। একইভাবে দ্বিতীয় শ্রেণির ফায়ার স্টেশনগুলোতে মোট জনবল থাকার কথা ২৭ জন। এর মধ্যে ফায়ারম্যান থাকার কথা ১৬ জন। বাস্তবে এসব স্টেশনে ফায়ারম্যানের সংখ্যা ৮-১০ জন।
ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা গেছে, সারা দেশে ল্যাডার (মই) রয়েছে ২০টি। ঢাকায় রয়েছে মাত্র নয়টি। এর মধ্যে সম্প্রতি সর্বোচ্চ ৬৪ মিটারের দুটি ল্যাডার কেনা হয়েছে। এ ছাড়াও ৫৪ মিটার ও ২৭ মিটারের ল্যাডার রয়েছে। বিশেষায়িত গাড়িও বাড়ানো হয়েছে। ফায়ার সার্ভিসে বিশেষায়িত গাড়ির সংখ্যাও প্রায় ৬০০। ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা মনে করেন, দ্রুততর সময়ে বহুতল ভবনে অগ্নিনির্বাপণের জন্য ল্যাডারসহ অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতির সংখ্যা আরও প্রয়োজন।
সূত্র আরও জানায়, অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি সঙ্কট নিরসনে সম্প্রতি জাম্বু কুশন, লাইট ডিউটি রেসকিউ বোট, ডাইভিং অ্যাপারেটাস, এয়ার কম্প্রেসর মেশিন, রিমোট কন্ট্রোল ফায়ার ফাইটিং ইউনিট, হেভি ডিউটি লাইট ইউনিট, টোয়িং ভিহিক্যাল, পোর্টেবল পাম্প, বিদ্রিং অ্যাপারেটাস ও স্মোক ইজেক্টরসহ বিভিন্ন যন্ত্রপাতি যুক্ত করা হয়েছে। তবে প্রয়োজনের তুলনায় তা যথেষ্ট নয়।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নতুন ফায়ার স্টেশন ও আধুনিক যন্ত্রপাতি বাড়ানো হচ্ছে। ফায়ার সার্ভিসকে আধুনিকায়নে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্দেশনায় অনেক কাজ চলছে।
ফায়ার সার্ভিস অধিদফতরের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (মিডিয়া) মো. শাহজাহান শিকদার সময়ের আলোকে জানান, ফায়ার সার্ভিসের সমস্যা নিরসনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনা অনুযায়ী বেশকিছু প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। এর বেশিরভাগই চলমান অবস্থায় রয়েছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দেশে ফায়ার স্টেশনের মোট সংখ্যা ৭০০ ছাড়িয়ে যাবে। এ ছাড়া অধিদফতরের ২৫ হাজারের বেশি জনবল কাঠামো প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে অধিদফতরের তেমন কোনো সঙ্কট থাকবে না। পাশাপাশি বাহিনীর কর্মীদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধিতে মুন্সীগঞ্জে ১০০ একর জমির ওপর ফায়ার একাডেমি করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে জমি অধিগ্রহণের কাজও শুরু হয়েছে।
ফায়ার সপ্তাহ শুরু আজ : ‘প্রশিক্ষণ পরিকল্পনা প্রস্তুতি; দুর্যোগ মোকাবিলায় আনবে গতি’Ñ এই প্রতিপাদ্য নিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে আজ থেকে সারা দেশে শুরু হয়েছে ফায়ার সপ্তাহ-২০২০। ২১ নভেম্বর পর্যন্ত দেশব্যাপী এই সপ্তাহ উদযাপিত হবে। এ উপলক্ষে নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে দুর্যোগে প্রথম সাড়াদানকারী প্রতিষ্ঠান ফায়ার সার্ভিস। ফায়ার সার্ভিস সদর দফতর সূত্র জানায়, আজ সকাল সাড়ে ১০টায় রাজধানীর মিরপুরের ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স ট্রেনিং কমপ্লেক্সে থেকে কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। উদ্বোধন অনুষ্ঠানে সূচনা বক্তব্য রাখবেন অধিদফতরের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. সাজ্জাদ হোসাইন। এ উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগের সচিব মো. শহিদুজ্জামান বাণী দিয়েছেন। ২১ নভেম্বর ফায়ার সার্ভিস সদর দফতরে রাষ্ট্রীয় পদকপ্রাপ্তদের মধ্যে পদক বিতরণ ও সমাপনী অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সপ্তাহব্যাপী কার্যক্রমের সমাপ্তি হবে।
রাষ্ট্রপতি তার বাণীতে অধিদফতরের সব কর্মকর্তা-কর্মচারীকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়েছেন। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হসিনা তার বাণীতে ফায়ার সার্ভিস সপ্তাহের সাফল্য কামনা করে সততা, দক্ষতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে কর্মীরা বঙ্গবন্ধুর ‘সোনার বাংলাদেশ’ গড়ে তুলতে সহায়তা করবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

About the author

CrimeSearchBD