সারাদেশ

ভুঁইফোড় হাসপাতালে প্রতারণা

Written by CrimeSearchBD

কেরানীগঞ্জে পপুলার গ্যাস্ট্রোলিভার অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতালে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের বড় বড় সাইনবোর্ড। কিন্তু সেখানে দেড় বছর ধরে সার্জন সেজে রোগীর অস্ত্রোপচার করছিল একজন আয়া। সোমবার অস্ত্রোপচারের সময় তাকে হাতেনাতে ধরে ফেলেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। অনুমোদন ছাড়া চিকিৎসা বাণিজ্য করা ক্লিনিকটি সিলগালা করা হয়েছে, মালিককে চার লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এমনিভাবে ঢাকার আদাবরের মাইন্ড এইড হাসপাতালে পুলিশ কর্মকর্তা আনিসুল করিমকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনার পর জানা যায়, ওই হাসপাতালের সেবা দেওয়ার অনুমোদনই নেই। খোদ রাজধানীতেই এমন অসংখ্য অনুমোদনহীন হাসপাতাল ও ক্লিনিক চলছে। সেখানে চিকিৎসাসেবা নিতে গিয়ে প্রতারিত হচ্ছে রোগী ও তার স্বজনরা।
রিজেন্ট হাসপাতাল, জেকেজি, আল-আশরাফ হাসপাতালে করোনাকালে চিকিৎসা জালিয়াতির ঘটনা বেরিয়ে আসে। রাজধানী জুড়ে এমন ভুয়া হাসপাতালে প্রতারিত হচ্ছে রোগী ও তাদের স্বজনরা। বেশিরভাগ হাসপাতাল ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে গড়ে উঠেছে। বাইরে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের নাম ব্যবহার করে ঝুলছে সাইনবোর্ড। কিন্তু হাসপাতালের নিজস্ব চিকিৎসক-নার্সও নেই। দালালরা ভুল বুঝিয়ে রোগী ধরে আনে। রোগী এলে চিকিৎসকদের ডেকে আনা হয়। জনস্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টরা বলছেন, করোনাকালে স্বাস্থ্য খাতের ভগ্নদশার চিত্র বেরিয়ে এসেছে। দুর্বল মনিটরিংয়ের সুযোগে সাহেদের মতো অসাধুরা ভুঁইফোড় হাসপাতাল খুলে রমরমা বাণিজ্য করছে। মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের অনুমোদন এবং যথাযথ সুযোগ-সুবিধা ছাড়াই চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাচ্ছে দেশের ১১ হাজার ৯৪০টি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনোস্টিক সেন্টার। এর মধ্যে ২ হাজার ৯১৬টি হাসপাতাল ও ক্লিনিক লাইসেন্সের জন্য কোনো আবেদনই করেনি। ৯ হাজার ২৪টি হাসপাতাল-ক্লিনিকের মধ্যে কোনো কোনোটি লাইসেন্সের জন্য আবেদন করে চিকিৎসা দেওয়া শুরু করলেও এখনও অনুমোদন পায়নি। আবার কোনো কোনোটির লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে, সেই অর্থে
সেগুলোও অবৈধ। ১৯৮২ সালের মেডিকেল অ্যান্ড প্রাইভেট ক্লিনিকস অ্যান্ড ল্যাবরেটরিস অর্ডিন্যান্স অনুযায়ী, স্বাস্থ্য অধিদফতরের অনুমোদন ছাড়া কোনো হাসপাতাল, ক্লিনিক বা ডায়াগনোস্টিক সেন্টার চালানোর সুযোগ নেই।
আর সোমবার ঢাকার আদাবরের মাইন্ড এইড হাসপাতালে বরিশাল মহানগর পুলিশের সহকারী কমিশনার আনিসুল করিমকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনার পর জানা যায়, ওই হাসপাতালও সেবা দেওয়ার অনুমোদন পায়নি। গত ১০ নভেম্বর সারা দেশে অনুমোদিত এবং অনুমোদনহীন বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের তালিকা পাঠাতে বিভাগীয় পরিচালকদের নির্দেশ দেয় স্বাস্থ্য অধিদফতর। বিভাগীয় কার্যালয়গুলো পাঠানো তথ্য নিয়ে লাইসেন্সবিহীন ক্লিনিক-ডায়াগনোস্টিক সেন্টারের তালিকা তৈরি করেছে স্বাস্থ্য অধিদফতর। অনুমোদনহীন যেসব চিকিৎসা সেবাকেন্দ্র চিহ্নিত করা হয়েছে, তার মধ্যে ৩ হাজার ৫৩৫টি ঢাকা বিভাগে, ২ হাজার ২৩২টি চট্টগ্রাম বিভাগে, ১ হাজার ৫২৩টি খুলনা বিভাগে, ১ হাজার ৪৩৮টি রাজশাহী বিভাগে, ১ হাজার ৯৯টি রংপুর বিভাগে, ৯৬৩টি ময়মনসিংহ বিভাগে, ৬০৩টি বরিশাল বিভাগে এবং ৫৪৬টি সিলেট বিভাগে।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম বলেন, তালিকা ধরে এসব হাসপাতাল-ক্লিনিকে অভিযান চালিয়ে সেগুলো বন্ধ করা হবে। তবে একসঙ্গে সব জায়গায় হয়তো অভিযান চালানো যাবে না। আমাদের এত জনবল নেই যে একসঙ্গে সব বন্ধ করে দিতে পারব। আমি সিভিল সার্জনদের বলেছি, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এসব হাসপাতাল বন্ধ করে দেওয়ার জন্য। তিনি বলেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায়, এসব অবৈধ ক্লিনিক-ডায়াগনোস্টিক সেন্টারের সঙ্গে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা, জনপ্রতিনিধি, ডাক্তারসহ প্রভাবশালীরা জড়িত। এ কারণে বন্ধ করতে গেলেই সমস্যা তৈরি হয়। আপনারা এ ব্যাপারে সাহায্য করতে পারেন। যারাই এসবের সঙ্গে জড়িত থাকুক, তাদের নাম যেন প্রকাশ করে দেওয়া হয়। কেউ যদি বাধা দেয় সেটা যেন বলা হয় যে তারা বাধা দিচ্ছে।
একজন সিনিয়র এএসপিকে চিকিৎসার নামে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় আলোচিত ‘মাইন্ড এইড’ নামের ক্লিনিকটি মানসিক রোগীর চিকিৎসার কোনো প্রতিষ্ঠান নয়। এ প্রতিষ্ঠানটি মাদক নিরাময় কেন্দ্রের অনুমতি নিয়ে মানসিক রোগের ‘চিকিৎসা’ করে আসছিল। মাদক নিরাময় কেন্দ্রের লাইসেন্স দেয় মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর। তবে কেন্দ্রটি মানসিক রোগের চিকিৎসার জন্যও লাইসেন্স চেয়েছিল স্বাস্থ্য অধিদফতরে আট মাস আগে। অধিদফতর তাদের লাইসেন্সের আবেদন প্রত্যাখ্যান করলেও তারা মানসিক রোগীর ‘চিকিৎসা’ অব্যাহত রাখে। শুধু তাই নয়, তারা নিরাময় কেন্দ্রটির নামও প্রতারণামূলকভাবে পরিবর্তন করে ফেলেছিল। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরে তাদের নিবন্ধিত নাম হলো ‘মাইন্ড এইড মানসিক এবং মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র’। কিন্তু তাদের সাইনবোর্ডে লেখা ‘মাইন্ড এইড, মাইন্ড কেয়ার ইনস্টিটিউট’। চলতি বছরের জানুয়ারি মাসের তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে মোট ৩২৪টি এ ধরনের নিবন্ধিত মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র আছে।
বাংলাদেশ প্রাইভেট ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনোস্টিক সেন্টার অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য ১০ হাজারের বেশি। তবে এর মধ্যে হাসপাতাল ও ক্লিনিক কতটি সে হিসাব তাদের কাছে নেই। বাংলাদেশ প্রাইভেট ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনোস্টিক সেন্টার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ডা. মনিরুজ্জামান বলেন, মাইন্ড এইড হাসপাতাল আমাদের সদস্য নয়। যাদের লাইসেন্স নাই তাদের সদস্য করি না। যাদের লাইসেন্স নাই তাদের বিরুদ্ধে আমরা বার বার ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ করেছি। কিন্তু কাজ হয় না। সাহেদের রিজেন্ট হাসপাতাল অবৈধ হলেও স্বাস্থ্য অধিদফতরই তাদের কোভিড হাসপাতাল হিসেবে পরিচালনার সুযোগ দিয়েছিল।

About the author

CrimeSearchBD