আইন-আদালত

মন্ত্রিসভায় অনুমোদন : ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড

Written by CrimeSearchBD

সম্প্রতি একের পর এক ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের ঘটনায় দেশজুড়ে প্রতিবাদ ও বিক্ষোভের মধ্যে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড থেকে বাড়িয়ে মৃত্যুদণ্ড করার প্রস্তাবে সায় দিয়েছে মন্ত্রিসভা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে সোমবার মন্ত্রিসভার ভার্চুয়াল বৈঠকে ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন’ সংশোধন করে অধ্যাদেশ আকারে জারির জন্য এর খসড়ার নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম সভা শেষে সচিবালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, ‘সংসদ অধিবেশন হওয়ার আগ পর্যন্ত এটি রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশ আকারে জারি করতে পারবেন।’ আর আইনমন্ত্রী আনিসুল হক এদিন বলেন, ‘আগামীকালই (আজ মঙ্গলবার) অধ্যাদেশ জারি করা হবে।’ অর্থাৎ আজ থেকেই ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হবে।
এদিকে আইনমন্ত্রী সোমবার আরও বলেছেন, ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য প্রধান বিচারপতিকে ‘প্র্যাকটিস নির্দেশনা’ জারির অনুরোধ করা হবে।’ ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি বাড়িয়ে মৃত্যুদণ্ড করার প্রস্তাবে মন্ত্রিসভা সায় দেওয়ার পর গুলশানে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এ বিষয়ে কথা বলেন তিনি। এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, ‘সাজা বাড়ানোর যে ব্যাপারটা, এটা পরিস্থিতির কারণে। আপনারা জানেন বিশে^ মৃত্যুদণ্ডের ব্যাপারে অনেক বিতর্ক আছে। তারপরও আমাদের দেশে এই ঘৃণ্য অপরাধটির যে চিত্র দেখতে পাচ্ছি, সে কারণে প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছেন এটা বাড়ানো উচিত। সে পরিপ্রেক্ষিতে আমরা মৃত্যুদণ্ডের ব্যাপারটি সংশোধনীতে এনেছি।’
অন্যদিকে ধর্ষণের সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিত করা হলে অপরাধীদের মধ্যে ভীতি থাকবে বলে মন্তব্য করেছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। সোমবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ মন্তব্য করে বলেন, ‘ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি বাড়িয়ে মৃত্যুদণ্ড করতে আইন সংশোধনে সায় দিয়েছে ম‌ন্ত্রিসভা। ধর্ষণের সর্বোচ্চ সাজা নিশ্চিত হলে ক্রিমিনালদের মধ্যে একটা ভীতিও থাকতে পারে। বিষয়টি যেভাবে বাড়ছে। সহিংসতা ও ধর্ষণ বন্ধ করতে হলে এ ধরনের কঠোর আইন প্রয়োগের প্রয়োজন রয়েছে।’
মন্ত্রিসভার বৈঠকের পর সচিবালয়ে সীমিত আকারে অনুষ্ঠিত প্রেস ব্রিফিংয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, ‘সংশোধিত অধ্যাদেশে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি করা হয়েছে মৃত্যুদণ্ড। মামলা শুরু থেকে বিচার শেষ করতে হবে ৬ মাস বা ১৮০ দিনের মধ্যে। বিচারক বদলি হলেও মামলার ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকবে। তদন্ত বিচার পদ্ধতি সবকিছুই এর মধ্যে উল্লেখ রয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানান, গত কিছু দিনের ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে মহিলা ও শিশু মন্ত্রণালয় ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০০০’-এর খসড়া অনুমোদনের জন্য মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করা হয়। আইনের ৯(১) ধারায় পরিবর্তন আনার প্রস্তাব করা হয়েছিল। এতে প্রধানমন্ত্রীসহ সবাই একমত পোষণ করেছেন। তবে যেহেতু এখন সংসদের অধিবেশন নেই এবং আশু ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে, তাই রাষ্ট্রপতির ক্ষমতাবলে অধ্যাদেশ করতে পারবেন। ভেটিংয়ের পরিপ্রেক্ষিতে ফাইনাল কার্যকর হয়ে যাবে। তিনি বলেন, ‘এ সংশোধনী শুধু আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে নয়, বিভিন্ন দেশের সার্বিক পরিস্থিতি আমরা দেখেছি। আমাদের বর্তমান পরিস্থিতিসহ সবকিছু মিলিয়েই এ সিদ্ধান্ত এসেছে। সরকারের পক্ষ থেকেও এটি আলোচনায় এসেছে। মানুষের অ্যাওয়ারনেসটাই গুরুত্বপূর্ণ। এই সংশোধনীর ফলে মৃত্যুদণ্ডের বিষয়ে ব্যাপক ক্যাম্পেইন হচ্ছে। ফলে একটি পজিটিভ ইমপ্যাক্ট পড়বে সাধারণ মানুষের মধ্যে। যারা এই ক্রাইমটি করবে তারা চিন্তা করবে এতে তো মৃত্যুদণ্ডের আদেশ রয়েছে।’
এ ব্যাপারে সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ সোমবার সময়ের আলোকে বলেন, ‘মন্ত্রিসভার এমন সিদ্ধান্ত খুবই সময়োপযোগী। প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ। এখন আইনের জটিলতা দূর করে বিচার পাওয়ার পথ সহজ করতে হবে। সে সঙ্গে সামাজিকভাবে বিষয়টি মোকাবিলা করা জরুরি।’
মানবাধিকার নেত্রী অ্যাডভোকেট তৌফিকা করিম বলেন, ‘ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড করায় সরকারকে ধন্যবাদ। তবে আগের মতো এসব মামলায় যেন দীর্ঘসূত্রতা না থাকে। দ্রুত রায় কার্যকর করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে। মামলা যেন ঝুলে না থাকে।’
অ্যাটর্নি জেনারেল এএম আমিন উদ্দিন বলেন, ‘ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড হওয়ায় আশা করছি এ ধরনের ঘৃণ্য ঘটনা কমবে। এখন ধর্ষণের মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করে রায় কার্যকর করা হলে অপরাধীদের মধ্যে ভয় ঢুকতে বাধ্য। এতে করে ধীরে ধীরে ধর্ষণ ও নির্যাতনের ঘটনা কমে আসবে।’
সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী মো. জে আর খন রবিন বলেন, ‘ধর্ষণের শাস্তি এখন থেকে মৃত্যুদণ্ড, এই মেসেজটা সারা দেশে ছড়িয়ে দিতে হবে। যাতে এমন কাজ যারা করার চিন্তা করবে তারা যেন ফাঁসির চিন্তাটাও করে।’
এদিকে মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মাত্র ৯ মাসে দেশে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ৯৭৫টি। এ সময়ে গণধর্ষণের শিকার হয়েছে ২০৮ জন নারী। এ ছাড়া ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হয়েছে ৪৩ জন এবং আত্মহত্যা করেছে ১২ জন নারী। এ ছাড়া ন৯ মাসে যৌন হয়রানির শিকার হয়েছে ১৬১ জন। আর যৌন হয়রানির প্রতিবাদ করতে গিয়ে তিন নারী এবং ছয় পুরুষ নিহত হয়েছে। গত ৯ মাসের মানবাধিকার লঙ্ঘনের সংখ্যাগত প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা গেছে, এ সময়কালের মধ্যে সারা দেশে নারীর প্রতি সহিংসতার ঘটনা, বিশেষত ধর্ষণ, হত্যা, যৌন নিপীড়ন ও পারিবারিক নির্যাতনের সংখ্যা এবং ঘটনার ধরনে ভয়াবহতা বৃদ্ধি পেয়েছে। গত ২০ সেপ্টেম্বর সাভারে প্রেমের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় স্কুলছাত্রী নীলা রায়কে প্রকাশ্যে ছুরিকাঘাতে হত্যার ঘটনা ঘটে। ২৩ সেপ্টেম্বর রাতে খাগড়াছড়ির বলপিয়ে আদাম এলাকায় চাকমা সম্প্রদায়ের এক নারীকে গণধর্ষণের পাশাপাশি তার ওপর বর্বর নির্যাতন চালানো হয়। ২৫ সেপ্টেম্বর সিলেট নগরীর টিলাগড় এলাকায় এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে স্থানীয় ছাত্রলীগের কয়েকজন কর্মী স্বামীকে বেঁধে রেখে গৃহবধূকে গণধর্ষণ করে। ওই ঘটনায় সারা দেশে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। তবে সব ঘটনাকে ছাপিয়ে যায় নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে স্বামীকে আটকে রেখে এক নারীকে নগ্ন করে নির্যাতন ও এর ভিডিও প্রকাশের ঘটনা। ভিডিওতে ওই নারীর আর্তচিৎকার নাড়িয়ে দেয় সারা দেশকে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এ ঘটনা সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘বর্বরতার চরম সীমা দেখলাম।’
ঘটে যাওয়া এসব যৌন নিপীড়নের ঘটনায় রাজধানীসহ সারা দেশে প্রতিবাদ-বিক্ষোভ চলছে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে সংশোধিত আইনের খসড়ায় সায় দিলো মন্ত্রিসভা।

About the author

CrimeSearchBD