আন্তর্জাতিক

লকডাউন হলো শিবচর

Written by Mahmudul Hasan

নতুন করে তিনজনের শরীরে করোনাভাইরাস ধরা পড়ার খবর জানিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ। এ নিয়ে দেশে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দাঁড়াল ১৭-তে। অন্যদিকে করোনাভাইরাস ঠেকাতে মাদারীপুরের শিবচর লকডাউন করা হয়েছে। এ ছাড়া চুয়াডাঙ্গায় ইতালিফেরত যুবক করোনায় আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
আর করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন একজন। নতুন আক্রান্ত তিনজনের একজন নারী এবং দুজন পুরুষ। আক্রান্ত নারীর বয়স ২২ বছর। আর দুজন পুরুষের বয়স একজনের ৬৫ এবং অন্যজনের বয়স ৩২ বছর। তারা সবাই একই পরিবারের সদস্য। তাদের পরিবারের একজন ইতালি থেকে এসেছেন। এখন পর্যন্ত প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনে ৪৩ এবং আইসোলেশনে রাখা হয়েছে ১৯ জনকে।
অন্যদিকে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেছেন, বাংলাদেশে এখনও পর্যন্ত যাদের দেহে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বেশি হয়েছে তারা মাদারীপুর, ফরিদপুর ও শিবচর এলাকার বাসিন্দা। যদি প্রয়োজন হয় তাহলে মাদারীপুর এবং ফরিদপুর জেলার এসব এলাকাকে লকডাউন বা পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হবে। সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, এসব এলাকায় তুলনামূলকভাবে বেশি আক্রান্তের ল²ণ দেখা যাচ্ছে। যে ১৭ জনের দেহে এখন পর্যন্ত করোনাভাইরাস সংক্রমিত হয়েছে, তাদের বেশিরভাগই এসব এলাকার বলে স্বাস্থ্যমন্ত্রী উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, আমরা যেটা খবর পাই, ওখানকার লোক কোয়ারেন্টাইনেও বেশি, বিদেশে থাকেও বেশি। সেজন্য এসব জায়গাকে আমরা বেশি ঝুঁকিপূর্ণ মনে করি। মাদারীপুর ও ফরিদপুরে বহু বাসিন্দা ইতালি প্রবাসী। ইতালিতে করোনাভাইরাসের প্রকোপ ছড়িয়ে পড়ার সময় অনেকে বাংলাদেশে ফিরেছেন।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, পুরো বাংলাদেশে এখন পাঁচ হাজারের বেশি মানুষকে বাড়িতে কোয়ারেন্টাইনে থাকতে বলা হয়েছে। সরকার মনে করছে করোনাভাইরাস সংক্রমণের পরিস্থিতি বাংলাদেশে এখনও উদ্বেগজনক হয়নি, তবে সংক্রমণ ঠেকানোর জন্য সরকার নানা পদক্ষেপ নিয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বিভিন্ন জেলা প্রশাসন সূত্রে ১৫ জেলায় হোম কোয়ারেন্টাইনের সংখ্যা জানা গেছে। সূত্র জানিয়েছে, চাঁদপুরে ৬০৮, মানিকগঞ্জে ১৬৯, শরীয়তপুরে ১৪৯, কিশোরগঞ্জ ৫৮, মাদারীপুরে ২৯, ঝিনাইদহে ২২, নারায়ণগঞ্জে ১২, চট্টগ্রামে ৭, জামালপুরে ৬, পাবনায় ৫, নেত্রকোনায় ৪, রাজবাড়ীতে ৪, যশোরে ৭, নাটোরে ২ ও নোয়াখালীতে ১ জন হোম কোয়ারেন্টাইনে আছেন।
করোনাভাইরাস আক্রান্তদের চিকিৎসায় প্রস্তুতির বিষয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেন, সে জন‌্য টঙ্গীতে বিশ^ ইজতেমার মাঠ প্রস্তুত করা হচ্ছে। সেখানে দায়িত্বে থাকবে সেনাবাহিনী। করোনাভাইরাসে আক্রান্ত সন্দেহে সারা দেশে পাঁচ হাজার মানুষকে কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়েছে। বর্তমানে দুই হাজার মানুষের চিকিৎসার ব্যবস্থা আছে। প্রয়োজন হলে বিশ^ ইজতেমা মাঠে বড় পরিসরে চিকিৎসার ব‌্যবস্থা করা হবে। আগামী দুয়েক দিনের মধ্যে যুক্তরাজ্যের সঙ্গে ফ্লাইটও বন্ধ করা হবে বলে জানান তিনি।
অন্যদিকে নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ জানান, যারা বিদেশ থেকে আসছেন তারা অবশ্যই ১৪ দিন হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকবেন। যারা হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকবেন তারা অত্যাবশ্যকীয় না হলে বাড়ির বাইরে যাবেন না। গেলে অবশ্যই মাস্ক ব্যবহার করবেন।
তিনি বলেন, কিছুক্ষণ পর পর ২০ সেকেন্ড ধরে স্যানিটাইজার বা সাবান দিয়ে দুই হাত ধুতে হবে। অপরিষ্কার হাতে নাক, মুখ স্পর্শ করবেন না। এরই মধ্যে আক্রান্ত হয়েছে এমন ব্যক্তির সংস্পর্শ এড়িয়ে চলুন। কাশি এলে শিষ্টাচার মেনে চলুন। এ সময় কাপড় বা টিস্যু দিয়ে নাক, মুখ ঢেকে রাখুন।
তিনি আরও বলেন, অসুস্থ হলে ঘরে থাকুন, অত্যাবশ্যকীয় না হলে বাইরে যাওয়া থেকে বিরত থাকুন। গেলে মাস্ক ব্যবহার করুন। কারও সঙ্গে হাত মেলানো বা হ্যান্ডশেক, কোলাকুলি থেকে বিরত থাকুন। বিদেশ ভ্রমণ থেকে বিরত থাকুন। যারা দেশের বাইরে আছেন তাদের দেশে আসতে নিরুৎসাহিত করুন। সবার সুস্থতার স্বার্থে আমাদের পরামর্শ মেনে চলবেন আশা করি।
দেশ জুড়ে করোনাভাইরাস মোকাবেলায় ওয়াজ, মাহফিলসহ সব ধরনের ধর্মীয়, রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সমাবেশ বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে সরকার। মাঠ পর্যায়ের প্রশাসনের সঙ্গে এক ভিডিও কনফারেন্সে কেন্দ্রীয় প্রশাসন এ নির্দেশনার কথা জানিয়েছে। এতে বলা হয়, সব ধরনের সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ। ধর্মীয় বা অন্য যেকোনো ধরনের জমায়েতও বন্ধ। এটা কঠোরভাবে নিশ্চিত করতে হবে। যেকোনোভাবে সব ধরনের সমাবেশ বা জমায়েত বন্ধ রাখতে হবে।
ভিডিও কনফারেন্সে মাঠ প্রশাসনকে কঠোরভাবে এ নির্দেশ দেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম ও প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব আহমদ কায়কাউস। সচিবালয়ের কেবিনেট ডিভিশন থেকে মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ভিডিও কনফারেন্সে সংযুক্ত হন।
চুয়াডাঙ্গায় আরও একজন করোনা রোগী শনাক্ত : চুয়াডাঙ্গায় করোনাভাইরাসে আক্রান্ত একজনকে শনাক্ত করা হয়েছে। তিনি গত ১ মার্চ ইতালি থেকে দেশে এসেছেন। বৃহস্পতিবার চুয়াডাঙ্গার সিভিল সার্জন এএসএম মারুফ হাসান এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
তিনি বলেছেন, আক্রান্ত ব্যক্তি গত চার দিন ধরে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে আইসোলেশনে ছিলেন। পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত বলে শনাক্ত হয়েছেন।

শিবচর লকডাউনমাদারীপুর প্রতিনিধি জানান, করোনাভাইরাস প্রতিরোধে মাদারীপুরের শিবচর উপজেলা লকডাউন (অবরুদ্ধ) ঘোষণা করা হয়েছে। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এ লকডাউন বলবৎ থাকবে। তবে ওষুধ, কাঁচামাল ও মুদি দোকান লকডাউনের আওতামুক্ত থাকবে।
বৃহস্পতিবার বিকালে শিবচর লকডাউনের ঘোষণা দেয় উপজেলা প্রশাসন। এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন শিবচর ইউএনও মো. আসাদুজ্জামান। বিকালে জরুরি সংবাদ সম্মেলন ডেকে ইউএনও বলেন, করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে শিবচর উপজেলার ওষুধ, কাঁচামাল ও মুদি দোকান বাদে সব দোকানপাট ও গণপরিবহন বন্ধ থাকবে।
ইউএনও আরও বলেন, যেহেতু শিবচর করোনার ঝুঁকিতে রয়েছে সেহেতু বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৭টা থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য সব ধরনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকবে। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দোকান ও ফার্মেসি খোলা থাকবে। বিশেষ করে বিদেশফেরত ব্যক্তিদের নিজ বাড়িতে অবস্থান করতে হবে। যদি কেউ হোম কোয়ারেন্টাইন না মানে তাহলে শিবচর নন্দকুমার ইনস্টিটিউশনের প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনে নেওয়া হবে।
এর আগে করোনার কারণে প্রয়োজনে শিবচর ও মাদারীপুর লকডাউন করা হবে বলে বৃহস্পতিবার এক প্রেস ব্রিফিংয়ে জানিয়েছিলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক। তিনি বলেন, শিবচর ও মাদারীপুর ভালনারেবল। এ জেলায়ই করোনা আক্রান্ত দেশ থেকে বেশি মানুষ এসেছে। সেখানেই বেশি নজরদারি করা হচ্ছে। প্রয়োজনে লকডাউন করা হবে। তার এ বক্তব্যের পরই বিকালে শিবচর লকডাউন করা হলো।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, কিছু কিছু এলাকা আছে যেখানে বিদেশফেরত অনেক মানুষজন কোয়ারেন্টাইন মানছেন না। কিছু এলাকায় অনেক বেশি বিদেশফেরত মানুষ অবস্থান করছেন। এসব এলাকাও প্রয়োজনে লকডাউন করা হবে।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে জাহিদ মালেক বলেন, মাদারীপুর, শরীয়তপুর ও ফরিদপুরসহ বেশ কয়েকটি এলাকায় প্রয়োজনে লকডাউন করার কথা ভাবছে সরকার। এর আগে মাদারীপুর জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্র জানায়, মাদারীপুরে ২১২ জনকে হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি দুজনকে ঢাকায় আইসোলেশনে রাখা হয়েছে।
স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্যমতে, করোনাভাইরাস প্রতিরোধে মাদারীপুর সদর হাসপাতালের নতুন ভবনে ১০০ শয্যা প্রস্তুত করা হয়েছে। সদর হাসপাতালের পুরাতন ভবনের দুটি কেবিনের চারটি বেড প্রস্তুত করা হয়েছে। চারটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দুটি করে বেড প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
জাতীয় রোগতত্ত¡, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) দেওয়া তথ্যমতে, দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে আরও তিনজনের শরীরে করোনা শনাক্ত হয়েছে। এ নিয়ে মোট আক্রান্তের সংখ্যা ১৭ জনে দাঁড়িয়েছে। এরই মধ্যে করোনায় একজনের মৃত্যু হয়েছে গত মঙ্গলবার।

About the author

Mahmudul Hasan

Leave a Comment