আন্তর্জাতিক

এখনও ফিরছেন প্রবাসীরা

Written by Mahmudul Hasan

যুক্তরাজ্য ছাড়া বিশে^র সব দেশের সঙ্গে আকাশপথের যোগাযোগ বিচ্ছিন্নের সরকারি ঘোষণা দিলেও এখনও বিদেশ থেকে ফিরছেন প্রবাসীরা। গত তিন দিনে ২১ হাজার বিদেশফেরত ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে দেশে প্রবেশ করেছেন তারা।
দেশ জুড়ে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে বিদেশফেরত প্রবাসীরা নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। সর্বোচ্চ সতর্কতার অংশ হিসেবে বাংলাদেশে বিদেশ থেকে আসা সব যাত্রীর কোয়ারেন্টাইন বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। কিন্তু কোয়ারেন্টাইনে থাকছেন না প্রবাসীরা। বিদেশ থেকে আসা ব্যক্তিরা তাদের বাড়িতে থাকবেন, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলবেন, ঘর থেকে বের হবেন নাÑ সরকারের পক্ষ থেকে এমন নির্দেশনা থাকলেও মানছে না কেউ।
বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, গত তিন দিনের গড় হিসাবে প্রতিদিন সাত হাজার যাত্রী আসছেন। যেসব ফ্লাইট আসছে তার সবগুলো করোনা আক্রান্ত দেশ থেকে। বিদেশফেরতরা ইমিগ্রেশন পার করেই অপেক্ষমাণ স্বজনদের জড়িয়ে ধরছেন। কোলাকুলি করছেন। কেউ নিজেকে আলাদা রাখছেন না। এতে করে করোনা আক্রান্তের ঝুঁকি বাড়ছে।
বৃহস্পতিবার করোনায় আক্রান্ত নতুন তিনজনসহ দেশে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ১৭ তে দাঁড়িয়েছে। আর করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন একজন। বিদেশফেরত এক ব্যক্তির সংস্পর্শে আসায় করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছিলেন ওই বৃদ্ধ। তার বয়স সত্তরের ওপর। তিনি ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, কিডনির জটিলতায় ভুগছিলেন। বিশ^ জুড়ে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার পর ৮ মার্চ প্রথম বাংলাদেশে তিনজন এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার খবর জানায় আইইডিসিআর। ওই তিনজনের মধ্যে দুজন ইতালি থেকে এসেছিলেন। ইতালিফেরত একজনের পরিবারের সদস্য ছিলেন আক্রান্ত তৃতীয়জন।
বৃহস্পতিবার নতুন আক্রান্তের তিনজনের একজন নারী ও দুজন পুরুষ। আক্রান্ত নারীর বয়স ২২ বছর। আর দুজন পুরুষের বয়স একজনের ৬৫ এবং অন্যজনের ৩২ বছর। তারা সবাই একই পরিবারের সদস্য। তাদের পরিবারের একজন ইতালি থেকে এসেছেন।
বিদেশফেরতদের হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকার কথা বলা হলেও তা মানছে না। মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিবের নেতৃত্বে বৃহস্পতিবার মাঠ প্রশাসনের সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সে বিষয়টি উঠে এসেছে।
চুয়াডাঙ্গার জেলা প্রশাসক মো. নজরুল ইসলাম সরকার জানান, কোয়ারেন্টাইনের শর্ত ভঙ্গ করায় চুয়াডাঙ্গা সদরের ইউএনও কর্তৃক একজনকে পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। নওগাঁ জেলা প্রশাসক জানান, নওগাঁ জেলায় গত ২৪ ঘণ্টায় হোম কোয়ারেন্টাইনে নতুন অন্তর্ভুক্ত বিদেশফেরত ব্যক্তির সংখ্যা ৪১ জন। নতুন করে ছয়জনের কোয়ারেন্টাইন শেষ হয়েছে। নতুন ১৩৪ জনকে হোম কোয়ারেন্টাইনে নেওয়া হয়েছে।
জেলা-উপজেলায় কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে। জেলা ও উপজেলা প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট সবাই তৎপর রয়েছেন। কোয়ারেন্টাইনের শর্ত ভঙ্গ করায় ইউএনও পতœীতলা কর্তৃক একজনকে ১০ হাজার টাকা এবং অন্য দুজনকে পাঁচ হাজার টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
করোনাভাইরাস প্রতিরোধে মানিকগঞ্জ জেলা পুলিশের উদ্যোগে বিভিন্ন থানা এলাকায় বিভিন্ন স্থানে জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম, লিফলেট বিতরণ করা হয়েছে। করোনাভাইরাস থেকে সুরক্ষায় বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকা ব্যক্তিরা যাতে যথাযথভাবে নিয়ম-কানুন মেনে বাড়িতে অবস্থান করেন সে জন্য থানা পুলিশ, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও লোকজনের সমন্বয়ে এলাকাভিত্তিক তদারকি টিম গঠন করা হচ্ছে বলে জানানো হয়। ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসক বলেন, হোম কোয়ারেন্টাইনে না থাকায় সুরুজ আলি (৪০) নামে একজনকে মালয়েশিয়াফেরতকে জেলে পাঠানো হয়েছে মুক্তাগাছা উপজেলায়।
যারা বিদেশ থেকে আসছেন তারা অবশ্যই ১৪ দিন হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকার আহŸান জানিয়ে স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ বলেন, যারা হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকবেন তারা অত্যাবশ্যকীয় না হলে বাড়ির বাইরে যাবেন না। গেলে অবশ্যই মাস্ক ব্যবহার করবেন।
তিনি বলেন, কিছুক্ষণ পর পর ২০ সেকেন্ড ধরে স্যানিটাইজার বা সাবান দিয়ে দুই হাত ধুতে হবে। অপরিষ্কার হাতে নাক, মুখ স্পর্শ করবেন না। এরই মধ্যে আক্রান্ত হয়েছে এমন ব্যক্তিদের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলুন। কাঁশি আসলে শিষ্টাচার মেনে চলুন। এ সময় কাপড় বা টিস্যু দিয়ে নাক, মুখ ঢেকে রাখুন। তিনি আরও বলেন, অসুস্থ হলে ঘরে থাকুন, অত্যাবশ্যকীয় না হলে বাইরে যাওয়া থেকে বিরত থাকুন। গেলে মাস্ক ব্যবহার করুন। কারও সঙ্গে হাত মেলানো বা হ্যান্ডশেক, কোলাকুলি থেকে বিরত থাকুন। বিদেশ ভ্রমণ থেকে বিরত থাকুন।
যারা দেশের বাইরে আছেন তাদের দেশে আসতে নিরুৎসাহিত করে তিনি বলেন, সবার সুস্থতার স্বার্থে আমাদের পরামর্শ মেনে চলার অনুরোধ জানাই। এই সময়ে বাংলাদেশিদের বিদেশ থেকে ফিরতে কিংবা বিদেশে না যেতে অনুরোধ করে সরকারের রোগতত্ত¡, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) পরিচালক অধ্যাপক মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা বলেন, করোনাভাইরাস সংক্রমণের লক্ষণ দেখা দিলে বা এমন সন্দেহ হলে প্রথমেই আক্রান্ত ব্যক্তিকে আশপাশের লোকজন থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন থাকতে হবে। সেলফ-আইসোলেশনে প্রথমে ঘরে থাকতে হবে। কর্মস্থলে, স্কুলে বা লোক সমাগম হয় এমন যেকোনো প্রকাশ্য স্থানে যাওয়া বন্ধ করে দিতে হবে। কোনো পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ব্যবহার করা যাবে নাÑ অর্থাৎ বাস, ট্রেন, ট্রাম, ট্যাক্সি বা রিকশা যাই হোক না কেন।
এমন একটা ঘরে থাকতে হবে যাতে জানালা আছে, ভালোভাবে বাতাস চলাচল করতে পারে। বাসার অন্য লোকদের থেকে আলাদা থাকতে হবে। কেউ যেন দেখতে না আসে তা নিশ্চিত করতে হবে। যদি বাজার-হাট করতে হয় বা কোনো ওষুধ বা অন্য কিছু কিনতে হয়Ñ তাহলে অন্য কারও সাহায্য নিতে হবে বলে তিনি জানান। করোনাভাইরাস সংক্রমণ ঠেকাতে ব্যক্তি সচেতনতা সবচেয়ে গুরুত্ব বলে তিনি উল্লেখ করেন।


About the author

Mahmudul Hasan

Leave a Comment