সারাদেশ

সেলসম্যান থেকে হাজার কোটি টাকার মালিক

Written by CrimeSearchBD

মো. মনির হোসেন ওরফে গোল্ডেন মনির। এক সময় সে রাজধানীর গাউছিয়া মার্কেটের একটি কাপড়ের দোকানে সেলসম্যানের কাজ করত। সেখান থেকে বেরিয়ে শুরু করে ক্রোকারিজের ব্যবসা। এরপর সিঙ্গাপুর ও ভারত থেকে লাগেজে করে কাপড়, কসমেটিক, মোবাইল ও ঘড়িসহ বিভিন্ন সামগ্রী ট্যাক্স ফাঁকি দিয়ে আনা-নেওয়া করত। এরই সূত্র ধরে জড়িয়ে পড়ে স্বর্ণ চোরাকারবারিতে। স্বর্ণ চোরাকারবার আরও বড় আকারে চালাতে বায়তুল মোকাররমে একটি দোকানও নেয়। এভাবেই চলতে থাকে মনিরের স্বর্ণ চোরাকারবারি। এতেও থেমে থাকেনি সে, বাবার রাজউকের চাকরির সুবাদে শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে জমি জালিয়াতি ও দখল করে দ্রুতই হয়ে যায় কোটি কোটি টাকার মালিক। মাত্র কয়েক বছরেই আলাদিনের চেরাগ পাওয়ার মতো তার জীবনও পাল্টে যায়। মনির তার নামের সঙ্গে গোল্ডেন মনির হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠে। তবে
চোরাকারবারি আর জালিয়াতি করে বিপুল সম্পদের মালিক হলেও এবার মনির ধরা খেল র‌্যাবের কাছে।
শনিবার রাজধানীর মেরুল বাড্ডায় রাজউক প্রজেক্টের নিজের আলিশান বাড়ি ঘেরাও করে র‌্যাব গ্রেফতার করেছে মনির হোসেন ওরফে গোল্ডেন মনিরকে। অভিযানস্থলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানিয়ে র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আশিক বিল্লাহ জানান, মনির হোসেনের বাসা থেকে একটি বিদেশি পিস্তল, চার রাউন্ড গুলি, চার লিটার বিদেশি মদ, ৩২টি নকল সিল, ২০ হাজার ৫০০ সৌদি রিয়াল, ৫০১ ইউএস ডলার, ৫০০ চাইনিজ ইয়েন, ৫২০ রুপি, ১ হাজার সিঙ্গাপুরের ডলার, ২ লাখ ৮০ হাজার জাপানি ইয়েন, ৯২ মালয়েশিয়ান রিঙ্গিত, হংকংয়ের ১০ ডলার, ১০ ইউএই দিরহাম ও ৬৬০ থাই বাথ জব্দ করা হয়েছে। এগুলোর মূল্যমান ৮ লাখ ২৭ হাজার ৭৬৬ টাকা। এ ছাড়া ৬০০ ভরি বা ৮ কেজি স্বর্ণালঙ্কার এবং নগদ ১ কোটি ৯ লাখ টাকা জব্দ করা হয়েছে। তিনি জানান, অবৈধভাবে স্বর্ণ চোরাচালান ও জালিয়াতির মাধ্যমে ভূমি দখল করে এখন সে হাজার কোটি টাকার মালিক। মনিরকে অবৈধ কাজে কারা সহায়তা করেছে সে তথ্যগুলো অনুসন্ধানে দুদক, বিআরটিএ, সিআইডি ও এনবিআরকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে র‌্যাবের পক্ষ থেকে অনুরোধ জানানো হবে।
র‍্যাবের মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট কর্নেল আশিক বিল্লাহ আরও জানান, শুক্রবার রাত ১১টা থেকে মনিরের মেরুল বাড্ডার ১৩ নম্বর রোডের ৪১ নম্বর বাড়িতে অভিযান শুরু করে র‍্যাব। নব্বইয়ের দশকে গাউছিয়ায় কাপড়ের দোকানে সেলসম্যান হিসেবে কাজ করত মনির। সময়ের ব্যবধানে বড়মাপের স্বর্ণ চোরাকারবারি ও জমি জালিয়াতির শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলে। এরপর তার নাম হয়ে যায় গোল্ডেন মনির। তিনি জানান, মনিরের বাসার নিচের পার্কিং থেকে তার ও পরিবারের ব্যবহৃত বিলাসবহুল দুটি গাড়ি জব্দ করা হয়েছে। এই গাড়ি দুটির কোনো বৈধ কাগজ তারা দেখাতে পারেনি। এ ছাড়াও মনিরের মালিকানাধীন ‘অটো কার সিলেকশন’ থেকে আরও তিনটি অবৈধ গাড়ি জব্দ করা হয়েছে।
আশিক বিল্লাহ জানান, জালিয়াতির মাধ্যমে মনির অসংখ্য প্লটের মালিক হয়েছে। রাজউক থেকে প্লটসংক্রান্ত সরকারি নথিপত্র চুরি করে এবং অবৈধভাবে রাজউকের বিভিন্ন কর্মকর্তাকে দাফতরিক কাজে ব্যবহার করে রাজউক, পূর্বাচল, বাড্ডা, নিকুঞ্জ, উত্তরা ও কেরানীগঞ্জে নামে-বেনামে দুশতাধিক প্লট নিজের করে নেয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে মনির ৩০টির বেশি প্লটের কথা স্বীকার করেছে। রাজউকের ৭০টি ফ্ল্যাটের নথি নিয়ে গিয়ে আইনবহির্ভূতভাবে হেফাজতে রাখায় ২০১৯ সালে মনিরের বিরুদ্ধে রাজউক কর্তৃপক্ষ একটি মামলা করে। সেটি চলমান রয়েছে। এ ছাড়া অনৈতিকভাবে দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে বিপুল সম্পদ অর্জন করায় তার বিরুদ্ধে দুদকের মামলা চলছে। এর আগে চোরাচালানের দায়ে ২০০৭ সালে বিশেষ ক্ষমতা আইনে রাজধানীর বিভিন্ন থানায় মনিরের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ভূমি জালিয়াতি সম্পর্কে মনির বলেছে, ২০০১ সালে তৎকালীন প্রভাবশালী মন্ত্রী, গণপূর্ত কর্মকর্তা ও রাজউকের কর্মকর্তাদের সঙ্গে অন্তরঙ্গ সম্পর্ক গড়ে সে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে ভূমি জালিয়াতি করে অবৈধভাবে বিপুল সম্পদের মালিক হয়।
আশিক বিল্লাহ আরও জানান, একটি গোয়েন্দা সংস্থার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মনিরের বাড়িতে অভিযান চালায় র‌্যাব। প্রাথমিক তদন্তে র‌্যাব জানতে পেরেছে, রাজউকের কাগজপত্র জালিয়াতি করে সে বিপুল পরিমাণ অর্থ-সম্পদ করেছে। স্বর্ণ চোরাচালানের মাধ্যমে তার সম্পদের পরিমাণ প্রায় ১ হাজার ৫০ কোটি টাকা। প্রাথমিকভাবে তার বিরুদ্ধে আরও কিছু অভিযোগ পাওয়া গেছে। মনিরের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে তদন্তের জন্য দুর্নীতি দমন কমিশন, বিআরটিএ, মানি লন্ডারিংয়ের জন্য সিআইডি এবং ট্যাক্স ফাঁকি সংক্রান্ত বিষয়ে এনবিআরকে অনুরোধ জানানো হবে। মনিরের বিরুদ্ধে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে অস্ত্র ও মাদকের পাশাপাশি অনুমোদনবিহীন বিদেশি মুদ্রা রাখায় বাড্ডা থানায় বিশেষ ক্ষমতা আইনে মোট তিনটি মামলা করবে র‌্যাব। মনিরের রাজনৈতিক পরিচয় সম্পর্কে জানতে চাইলে কোনো দলের নাম না বলে র‌্যাবের মুখপাত্র বলেন, একটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে তার সরাসরি সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে জানা গেছে। সে দলটির অর্থ জোগানদাতা হিসেবেও মনির কাজ করে।
মনির স্বর্ণ ব্যবসায়ী নয়Ñ বাজুস : অন্যদিকে র‌্যাবের হাতে গ্রেফতারকৃত মনিরুল ইসলাম ওরফে গোল্ডেন মনির স্বর্ণ ব্যবসায়ী নয় বলে দাবি করেছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতি (বাজুস)। বাজুস সভাপতি এনামুল হক খান ও সাধারণ সম্পাদক দিলীপ কুমার আগরওয়াল স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিবৃতিতে বলেছেন, বাজুসের তথ্যমতে ওই মনির স্বর্ণ ব্যবসায়ী নয়। বাজুসের কোনো সদস্য এ ধরনের কোনো কর্মকাণ্ড সমর্থন করে না। অধিকন্তু আমরা এ ধরনের অবৈধ কার্যকলাপ নিধনে সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলকে সাধুবাদ জানাই। ভবিষ্যতে যদি প্রয়োজন হয় তবে এ ধরনের অবৈধ কাজ শক্ত হাতে নিধনে আমরা সরকারের পাশে থাকব। বাংলাদেশের সব গণমাধ্যমকে ওই মনিরকে স্বর্ণ ব্যবসায়ী হিসেবে আখ্যায়িত না করার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ জানানো হলো।

About the author

CrimeSearchBD

%d bloggers like this: