সারাদেশ

সীমান্তে হত্যা বন্ধ হবে কবে

Written by CrimeSearchBD

নানা প্রতিশ্রæতির পরও থামছে না সীমান্ত হত্যা। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে একের পর এক ঘটছে নৃশংস হত্যাকাÐ। বিভিন্ন সময়ে সীমান্তে হত্যা বন্ধের বিষয়ে নিজেরাই আশ^স্ত করলেও কথা রাখছে না ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)। সীমান্তে কারণে-অকারণেই চালানো হয় মারণাস্ত্র। গুলি করে বা ধরে নিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয় নিরীহ বাংলাদেশিদের। এমন পরিস্থিতিতে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলেছেন, দুটি দেশের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকা সত্তে¡ও সীমান্তে এভাবে নিরীহ বাংলাদেশিদের নৃশংসভাবে হত্যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য মতে, গত দুই দশকে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে বিএসএফের হাতে প্রায় ১২০০ বাংলাদেশি নাগরিক নৃশংস হত্যাকাÐের শিকার হয়েছে! দুদেশের মধ্যে দীর্ঘ আলোচনার পর মাঝখানে কয়েক বছর হত্যাকাÐের সংখ্যা কিছুটা কমলেও গত বছর থেকে এই নৃশংসতা আবারও বেড়ে গেছে। চলতি বছরের প্রথম ৬ মাসেই বিএসএসফের হাতে ২৫ বাংলাদেশি নাগরিক নিহত হয়েছে। এ ছাড়া জুলাই থেকে এ পর্যন্ত আরও প্রায় ১২ বাংলাদেশি সীমান্ত হত্যার শিকার হয়েছে। এর মধ্যে গত ১০ দিনে হত্যার শিকার হয়েছে ৩ জন। অন্যদিকে শুধু জানুয়ারি মাসেই
প্রাণ হারিয়েছে ১২ জন। তথ্য মতে, ২০১০ সালের আগে সীমান্তে ব্যাপকহারে বাংলাদেশি নাগরিক হত্যাকাÐের শিকার হতো। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে এক দশক ধরে সম্পর্ক ভালো হলেও অবস্থার তেমন উন্নতি ঘটেনি। গত ১৮ আগস্ট দুদিনের সফরে ঢাকায় এলে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব হর্ষবর্ধন শ্রিংলার সঙ্গে পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের বৈঠকে সীমান্ত হত্যা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে ঢাকা। বৈঠক শেষে উপস্থিত সাংবাদিকদের পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন জানান, অমীমাংসিত বিভিন্ন বিষয়ের সঙ্গে সীমান্ত হত্যা বেড়ে যাওয়ার বিষয়ে ভারতের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে। সীমান্তে অনাকাক্সিক্ষত মৃত্যুর ঘটনা যাতে না ঘটে সেজন্য তারা বিএসএফকে নির্দেশনা দেবেন বলে আমাদের জানিয়েছেন। শ্রিংলার আশ^াসের পরও সীমান্তে গত সপ্তাহে একাধিক হত্যাকাÐের ঘটনা ঘটেছে।
বিজিবির মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফয়জুর রহমান বলেন, সীমান্ত হত্যা সংঘটিত হওয়ার অন্যতম একটি কারণ হলো সীমান্তবর্তী মানুষের অসচেতনতা। ইতোমধ্যে মানুষের মধ্যে সচেতনতা ও দায়িত্ববোধ বাড়ায় সীমান্ত হত্যা কমে আসছে। এ বিষয়ে বিজিবি সর্বদা যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (বিস) সাবেক চেয়ারম্যান ও সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সী ফয়েজ আহমেদ বলেন, দুদেশের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকা অবস্থায় সীমান্তে হত্যাকাÐ কাম্য নয়। বাংলাদেশি সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি কখনও গুলি না করলেও সাধারণ ঘটনায় বিএসএফ সদস্যরা গুলি করে। তিনি দুদেশের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নেতৃত্বের আলোচনার পাশাপাশি নিয়মিত আলোচনা ও পতাকা বৈঠকের ওপর গুরুত্ব দিতে বলেন।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, ভারতের সঙ্গে অন্যান্য দেশের সংঘাতপূর্ণ সীমান্ত থাকলেও বাংলাদেশের ক্ষেত্রে অবস্থা ভিন্ন। সে কারণে দুদেশের সীমান্তে এমন কোনো সেনা রাখা যাবে না যারা সম্পর্কের বিষয়টি বুঝতে পারবে না। এ ছাড়া সীমান্তরক্ষীদের হাতে বিচারবহিভর্‚তভাবে কোনো দেশের নাগরিক হত্যা আন্তর্জাতিক আইনে সমর্থন করে না।
গণমাধ্যমের তথ্যে দেখা গেছে, বৃহস্পতিবার ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার বেওরঝাড়ি সীমান্তে শরিফুল ইসলাম ওরফে খুটা মোহাম্মদ (৩০) নামে এক বাংলাদেশি জেলেকে গুলি করে হত্যা করেছে বিএসএফ। ৫ সেপ্টেম্বর চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার তেলকুপি সীমান্তে মো. বাদশাহ (২৭) নামে এক যুবককে গুলি করে হত্যা করা হয়। ঘটনার পর ৬ দিন পার হলেও এখন পর্যন্ত তার লাশ ফেরত দেওয়া হয়নি। ৩ সেপ্টেম্বর ভোরে কুড়িগ্রামের নাগেশ^রী উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়নের পাখিউড়া সীমান্তে ছবিল উদ্দিন (৩৬) নামে এক বাংলাদেশি যুবককে গুলি করে হত্যা করা হয়। এর আগে ৩১ আগস্ট যশোরের শার্শা সীমান্তে অজ্ঞাতনামা এক যুবককে গুলি করে বিএসএফ সদস্যরা লাশ নিয়ে যায় বলে জানায় স্থানীয়রা। ১৪ আগস্ট কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে আবুল কাশেম (৩৫) নামে এক যুবককে হত্যার ১৪ দিন পর ২৮ আগস্ট লাশ ফেরত দেয় বিএসএফ।
মানবাধিকার সংস্থা ‘আইন ও সালিশ কেন্দ্রের’ (আসক) প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন মাস পর্যন্ত প্রথম ৬ মাসে বিএসএফের গুলি ও নির্যাতনে ২৫ জন বাংলাদেশি নাগরিক নিহত হয়েছে। যাদের মধ্যে ২১ জনেরই মৃত্যু হয়েছে গুলিতে আর চারজন নির্যাতনে মারা গেছে। সংস্থাটির মতে, গত বছরের (২০১৯) প্রথম ৬ মাসের তুলনায় চলতি বছরের প্রথম ৬ মাসে হত্যাকাÐের সংখ্যা বেশি। গত বছর একই সময়ে বিএসএফের গুলি ও নির্যাতনে ২০ বাংলাদেশি নিহত হয়। এর মধ্যে গুলিতে ১৮ জন আর নির্যাতনে মারা যায় দুজন বাংলাদেশি।
আসকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছর (জানুয়ারি-ডিসেম্বর) বিএসএফের গুলি ও নির্যাতনে ৪৩ বাংলাদেশি নিহত হয়। এর মধ্যে গুলিতে ৩৭ ও নির্যাতনের কারণে ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। অথচ ২০১৮ সালে সীমান্তে বিএসএফের হাতে নিহতের সংখ্যা ছিল খুবই কম। সে বছর ১৪ বাংলাদেশি নিহত হয়। অথচ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে ২০১৯ সালে সীমান্তের হত্যা প্রায় তিন গুণ বেড়ে যায়। এ ছাড়া এ বছর আগস্ট পর্যন্ত ৩৪ জন হত্যার শিকার হয়েছেন।
মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’-এর পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে ১২ জন বাংলাদেশি নিহত হয়েছে। এ সময়ে তিনজন আহত ও একজন অপহৃত হয়েছে। একইভাবে ফেব্রæয়ারিতে তিনজন নিহত ও দুজন আহত হয়। আবার মার্চ থেকে সারা বিশে^ করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব শুরুর পর ওই মাসে নিহত ও আহতের সংখ্যা ছিল শূন্যের কোঠায়, আবার এপ্রিলে দুজন নিহত ও সাতজন আহত হলেও মে মাসে একজন নিহত ও আহতের সংখ্যা ছিল শূন্য। অন্যদিকে জুন থেকে করোনার প্রাদুর্ভাব কিছুটা কমতে শুরু করলে ওই মাসে বিএসএফের হাতে ছয় বাংলাদেশি নিহত হওয়া ছাড়াও আহত হয় আরও চারজন।
আসকের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, চলতি বছর জানুয়ারিতে ১২, ফেব্রæয়ারিতে ৩, মার্চে শূন্য, এপ্রিলে ২, মে মাসে ১, জুনে ৭ ও জুলাই মাসে ৪ বাংলাদেশি নাগরিক হত্যার শিকার হয়েছে। এ ছাড়া আগস্টে ৫ ও সেপ্টেম্বরের প্রথম ১০ দিনে আরও ৩ জন বিএসএফের হাতে হত্যার শিকার হয়েছে। এর মধ্যে আগস্ট পর্যন্ত হত্যার শিকার ৩৪ জনের মধ্যে ২৯ জন গুলিতে ও ৫ জন নির্যাতনে মারা গেছে।
অধিকারের প্রতিবেদনে আরও দেখা গেছে, ২০০০ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত দুদশকে সীমান্তে বিএসএফের হাতে ১ হাজার ১৮৫ বাংলাদেশি নাগরিক হত্যাকাÐের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ২০০০ সালে ৩১, ২০০১ সালে ৮৪, ২০০২ সালে ৯৪, ২০০৩ সালে ২৭, ২০০৪ সালে ৭২, ২০০৫ সালে ৮৮, ২০০৬ সালে ১৫৫, ২০০৭ সালে ১১৮, ২০০৮ সালে ৬১, ২০০৯ সালে ৯৮, ২০১০ সালে ৭৪, ২০১১ সালে ৩১, ২০১২ সালে ৩৮, ২০১৩ সালে ২৯, ২০১৪ সালে ৩৫, ২০১৫ সালে ৪৪, ২০১৬ সালে ২৯, ২০১৭ সালে ২৫, ২০১৮ সালে ১১, ২০১৯ সালে ৪১ জন হত্যাকাÐের শিকার হয়। একই সময়ে ভারতীয় বাহিনীর হাতে ১ হাজার ১১৮ জন আহত, ১ হাজার ৪০১ জন অপহরণ ও ১১১ জন নিখোঁজ হয়। এ ছাড়া আসকের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০১৩ সাল থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত গত ৮ বছরে বিএসএফের গুলিতে ২৩৩ বাংলাদেশি মারা গেছে।
নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশ এবং ভারতের মধ্যে সম্পর্কের উন্নতি ঘটলেও দুদেশের সীমান্তে এর কোনো প্রতিফলন দেখা যায়নি। সীমান্ত হত্যা বন্ধে দুদেশের মধ্যে কয়েক দফা আলোচনা হলেও কার্যত বাস্তব অবস্থা একই রয়ে গেছে। ২০১৬ সাল থেকে মাঝখানে তিন বছর হত্যাকাÐের সংখ্যা কিছুটা কমলেও গত বছর থেকে তা আবার বেড়ে যায়। এর কারণ হিসেবে আগে গরু পাচারের কথা বলা হলেও সেটি এখন অনেক কমেছে। এ ছাড়া মারণঘাতী নয় এমন অস্ত্র ব্যবহার করার কথা থাকলেও উল্টো সেগুলোই বেশি ব্যবহার করা হচ্ছে। যার কারণে সীমান্ত হত্যা বন্ধের দাবিতে প্রতিবাদসহ এখনও নানা কর্মসূচি পালন করছে বাংলাদেশিরা।
গত ২৫ জুলাই সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার বিভিন্ন সীমান্তে বাংলাদেশি নাগরিকদের হত্যা বন্ধে সচেতনতামূলক প্রতীকী মানব দেওয়াল তৈরি কর্মসূচি পালিত হয়।
ওই সময় বক্তারা বলেন, অনেক সময় সীমান্তরেখার বিষয়টি বুঝতে না পেরে বাংলাদেশি নাগরিকরা সীমান্ত অতিক্রম করে ওপারে চলে যায়। যাকে আইনত অবৈধ অনুপ্রবেশ হিসেবে বিবেচনা করা হলেও বিষয়টি না বোঝার কারণে হয়ে থাকে। এসব ক্ষেত্রে ভারতীয় খাসিয়াসহ সীমান্তরক্ষী বাহিনীর হাতে বাংলাদেশিরা গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হয়।
গত বছরের ১১ জুলাই জাতীয় সংসদে এক প্রশ্নের উত্তরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল জানিয়েছিলেন, গত ১০ বছরে সীমান্তে বিএসএফের হাতে ২৯৪ জন প্রাণ হারিয়েছে। এর মধ্যে ২০০৯ সালে ৬৬, ২০১০ সালে ৫৫, ২০১১ সালে ২৪, ২০১২ সালে ২৪, ২০১৩ সালে ১৮, ২০১৪ সালে ২৪, ২০১৫ সালে ৩৮, ২০১৬ সালে ২৫, ২০১৭ সালে ১৭ ও ২০১৮ সালে তিন বাংলাদেশি নিহত হয়।

About the author

CrimeSearchBD

%d bloggers like this: