জাতীয় সংবাদ

সিজার কমেছে

Written by CrimeSearchBD

সিজার ছাড়া বাচ্চা হবেই না! এই সমস্যা, সেই সমস্যা! তাহলে করোনাকালে স্বাভাবিক প্রসবের মাধ্যমে শিশুর জন্ম হচ্ছে কীভাবে?
বর্তমানে ৯০ ভাগেরও বেশি শিশুর জন্ম হচ্ছে স্বাভাবিক প্রসবের মাধ্যমে। আশ্চর্যজনক মনে হলেও রংপুর ডেডিকেটেড করোনা আইসোলেশন হাসপাতালে সিজার ছাড়াই তৃতীয় সন্তানের জন্ম দিয়েছেন আশা বেগম (৩২)। ৩ সেপ্টেম্বর দেহে করোনা নিয়ে কোনো প্রকার অস্ত্রোপচার ছাড়াই তৃতীয় সন্তান জন্ম দেন ওই গৃহবধূ। আগের দুটি সন্তান হয় সিজার অপারেশনের মাধ্যমে। তৃতীয় সন্তান স্বভাবত কারণেই সিজারের মাধ্যমে হওয়ার কথা।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে করোনাকালে স্বাভাবিক প্রসবের পরিসংখ্যানে জোর আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন অর্থ কামানোর জন্যই সিজার করতেন চিকিৎসকরা। অনেকে তাদের নিজেদের অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরেছেন।
বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, শারীরিক জটিলতার কারণে ১০ থেকে সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ সিজারের ঘটনা ঘটতে পারে। অথচ বাংলাদেশে ২০১৯ সালে ৫১ শতাংশ বাচ্চার জন্ম হয়েছে এই পদ্ধতিতে। ২০১৯ সালের জুনে তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে সিজারের হার ৮৩ শতাংশ, সরকারি হাসপাতালে ৩৫ শতাংশ ও এনজিও হাসপাতালে ৩৯ শতাংশ।
এবার বাংলাদেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণ শুরুর কয়েক মাস পর তারা তাদের জুলাই মাসের প্রতিবেদনে দাবি করেছে যে, করোনা সঙ্কটের সময়ে বাংলাদেশে সিজারের মাধ্যমে সন্তান প্রসবের প্রবণতা কমেছে।
আবার সরকারি হিসাবেও দেখা যাচ্ছে দেশের সরকারি-বেসরকারি সব হাসপাতাল ক্লিনিক মিলিয়ে জানুয়ারি থেকে জুলাই মাস পর্যন্ত সি-সেকশন বা সিজারের মাধ্যমে সন্তান জন্মদানের হার কমছে।
সরকারি হিসাবেই জানুয়ারি মাসে নরমাল ডেলিভারি বা স্বাভাবিক প্রসব হয়েছে ৫০ হাজার ৮৭৮টি যেখানে সিজার হয়েছে ৪৩ হাজার ৮৭৯টি। পরে ফেব্রুয়ারি মাসে সিজার হয়েছে ৩৯ হাজার ৮৩২টি, মার্চ মাসে ৩৭ হাজার ৪১১টি, এপ্রিল মাসে ৩২ হাজার ৫৯১টি, মে মাসে ৩৩ হাজার ৮০৮টি, জুন মাসে ৩৬ হাজার ৯০টি এবং জুলাই মাসে ৩২ হাজার ১৭৩টি নরমাল ডেলিভারির বিপরীতে সিজার হয়েছে ২৬ হাজার ৮০২টি।
পরিবার পরিকল্পনা অধিদফতরের হিসাবে সরকারি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে সিজারের সংখ্যা খুবই কম। ফেব্রুয়ারি মাসে এসব হাসপাতালে ১৩,৫২৩টি নরমাল ডেলিভারি হয়েছে আর সিজার হয়েছে ৬১১টি। পরবর্তী মাসগুলোতে সিজারের সংখ্যা আরও কমেছে।
প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী মার্চ মাসে সিজার হয়েছে ৫১৪টি, এপ্রিলে ২৯৭টি, মে মাসে ২৫৫ ও জুন মাসে ১১ হাজার ৮৫৭টি স্বাভাবিক প্রসবের বিপরীতে ২৯১টি সিজার হয়েছে।
বাংলাদেশে দুই দশক আগেও ‘সিজারিয়ান অপারেশন’ বিষয়টি প্রায় অপরিচিত ছিল। হাল আমলে সন্তান জন্মদানে সিজার একমাত্র পদ্ধতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ‘স্বাভাবিক প্রসব’ বিষয়টিই যেন অপরিচিত হয়ে উঠতে থাকে।
রাজধানী ঢাকাতে প্রায় ৯০ শতাংশ শিশুর জন্ম হচ্ছে সিজারে। ক্লিনিকগুলোর আয়ের ৯৫ শতাংশই আসে সিজারের মাধ্যমে। ২০০৪ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে সিজার বা প্রসবকালীন অস্ত্রোপচার ৪ থেকে ৩১ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। সিজার নিয়ে এত বিতর্ক শুরু হয়েছিল যে বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছিল। জনস্বার্থে করা এক রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তখন হাইকোর্ট সন্তান প্রসবের ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনে সিজারিয়ান-অস্ত্রোপচার রোধ করতে একটি নীতিমালা তৈরির নির্দেশনা দিয়েছিল। কিন্তু করোনাকালে কমেছে সিজারের প্রবণতা। চলতি বছরের মার্চ থেকেই করোনার কারণে সবকিছু স্থবির। সংক্রমণের ভয়ে প্রসূতিরা হাসপাতালে যেতেও ভয় পাচ্ছে, বন্ধ হয়ে গেছে অনেক ক্লিনিক। সব মিলিয়ে হঠাৎ করেই কমে গেছে সিজারিয়ান সন্তান প্রসব। প্রসূতিরা যেন ফিরে গেছেন সেই দুই দশক আগের অবস্থায়।
করোনার মধ্যে সিজারে বাচ্চা প্রসব কমেছে, তবে বাড়েনি প্রসূতি মায়ের মৃত্যুর হার। এ থেকে বোঝা যায়, বিনা প্রয়োজনে অসংখ্য সিজারের ঘটনা ঘটে দেশের বিভিন্ন হাসপাতাল বা ক্লিনিকে। অথচ প্রত্যেকটি সিজারের আগেই বলা হয়, এটা না করলে মা ও শিশুর জীবন ঝুঁকির মধ্যে পড়বে। কিছু অসৎ চিকিৎসকের এমন কথায় দিশেহারা অভিভাবকরা সিজারে সম্মত হয়ে যান। প্রসূতি মা এবং অভিভাবকদেরও একটা বড় দায় থেকে যায় সিজারিয়ান প্রসবের ক্ষেত্রে। প্রসব যন্ত্রণার ভয়ে অনেক প্রসূতি মা আগেভাগেই এমন সিদ্ধান্ত নিয়ে বসে থাকেন।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলছেন, এই ধারাটি চলমান রাখতে হবে। সিজারে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ে। দীর্ঘমেয়াদে শরীরে নানা সমস্যা দেখা দেয়।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঢাকার ইস্কাটনের ফারজানা আক্তার জানিয়েছেন, নিজের প্রথম সন্তান জন্মের সময় নরমাল ডেলিভারি বা স্বাভাবিক প্রসবের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করেছিলেন তিনি। গর্ভাবস্থার ৩৬ সপ্তাহ পর্যন্ত সব ঠিকই ছিল। প্রসবের প্রত্যাশিত তারিখ অনুযায়ী হাসপাতালে ভর্তি হন। সব কিছুই ঠিকঠাক ছিল। আমার পরিবার চিকিৎসককে নরমাল ডেলিভারির বিষয়ে জানিয়েছিল।
চিকিৎসক একটা টেস্ট করে বললেন পানি কমে গেছে, সিজার করতে হবে। কিন্তু আমার এখনও মনে হয় সিজারটা না করলেও পারত।
ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী রেজিস্ট্রার ডা. ফেরদৌস আহমেদ বলেন, করোনার সময়ে শুধু সিজার নয় বরং হাসপাতালগুলোতে নরমাল ডেলিভারি ও সিজার দুটিই কমেছে। বাড়িতে প্রসব বেড়েছে। এ সময়ে অনেকেই হাসপাতাল এড়াতে চেয়েছেন। অবস্থা জটিল না হলে অনেকেই এমনকি বাড়িতেই স্বাভাবিক প্রসবের ব্যবস্থা করেন।

About the author

CrimeSearchBD

%d bloggers like this: