সারাদেশ

সবজিতে আগুন

Written by CrimeSearchBD

মাছ, মাংস, দুধ, ডিমÑ এগুলো প্রতিদিনকার খাদ্য তালিকায় জোটাতে পারে না অনেক পরিবারই। অনেক মধ্যবিত্ত পরিবার তো বটেই, নিম্ন মধ্যবিত্ত ও স্বল্প আয়ের মানুষেরও এগুলো প্রতিদিন খাওয়ার সামর্থ্য এখন নেই। হয়তো এক প্লেট ভাতের সঙ্গে কিছু সবজি দিয়ে তারা তিন বেলা পেট ভরাতেন এতদিন। কিন্তু এখন আর সে সুযোগও নেই। কেননা সবুজ সবজিতে এখন দেশের মানুষের বেজায় কষ্ট।
অধিকাংশ সবজির দামই এখন ১০০ টাকার ওপরে। ৮০ টাকার নিচে সবজি আছে হাতেগোনা দুয়েকটি। ভোক্তারা তাই দুয়েকটি বা আড়াইশ গ্রাম-আধা কেজি সবজি কিনছেন বাজারে গিয়ে। সবজির দাম বৃদ্ধিতে ভোক্তার যেমন কষ্ট বেড়েছে, তেমনি আয় কমেছে বিক্রেতাদেরও। তা ছাড়া সবজির অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে বাজারে ক্রেতা-বিক্রেতাকে বাকবিতণ্ডায় জড়াতেও দেখা যাচ্ছে। সব মিলিয়ে সবজির ক্রেতা ও বিক্রেতার কেউই ভালো নেই এখন।
বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, এমনিতেই প্রতিবছর সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে সারা দেশের বাজারে সবজির দাম অন্য যেকোনো মাসের চেয়ে বেশি থাকে। তার ওপর এবার কয়েক দফা বন্যার কারণে সবজি খেত নষ্ট হওয়ায় বাজারে সবজির সরবরাহ কমেছে। কিন্তু এসব কারণে যেটুকু না দাম বেড়েছে সবজির তার চেয়ে বেশি বেড়েছে সঙ্কটকে পুঁজি করে ব্যবসায়ীদের অতি মুনাফার লোভের কারণে। এসব কথা বলেছেন ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন কনজুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান। সময়ের আলোকে তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের দেশে যেকোনো পণ্যের দাম বৃদ্ধির পেছনে হঠাৎ কোনো সঙ্কট যতটুকু না দায়ী, তার চেয়ে বেশি দায়ী ব্যবসায়ীদের অতি মুনাফার লোভ। বাজারে এখন সবজির সরবরাহ কিছুটা কম, তাই দাম বাড়তি। তাই বলে টানা দুই-তিন মাস সবজির দাম এত বাড়তি থাকবেÑ এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তাই সময় এসেছে এই সঙ্কটের সময় কীভাবে সবজির সরবরাহ বাড়ানো যায়, সে বিষয়ে সরকারের চিন্তাভাবনা করার। এ ক্ষেত্রে ভরা মৌসুমে যখন প্রচুর সবজি উৎপাদন হয়, তখন সবজি সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা। অর্থাৎ হিমাগারের ব্যবস্থা করা। দ্বিতীয়ত সবজির উৎপাদন বৃদ্ধিতে কৃষককে বিভিন্নভাবে প্রণোদনা দেওয়া। সেই সঙ্গে সঙ্কটকে পুঁজি করে বাজার ব্যবসায়ীরা যাতে অস্থিতিশীল করতে না পারে তার জন্য বাজারে সরকারি মনিটরং জোরদার করা দরকার।’
এ বছর অবশ্য করোনার শুরু থেকেই সবজির বাজার চড়া। সে হিসাবে মার্চ-এপ্রিল থেকেই সবজির দাম বৃদ্ধি পায়। তখন থেকে দাম বাড়তে বাড়তে এখন সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছেছে সবজির দাম। গত কয়েকদিন রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, দুটি সবজি এখন ডাবল সেঞ্চুরি হাঁকিয়েছে। অর্থাৎ ২০০ টাকা ছাড়িয়ে ৩০০ টাকার পথে সবজি দুটি। সবজি দুটি হচ্ছে কাঁচামরিচ, শিম। কাঁচামরিচের কেজি ২৮০ টাকায় ঠেকেছে। দুয়েকটি বাজারে ৩০০ টাকাতেও বিক্রি করতে দেখা গেছে। শিম বিক্রি হচ্ছে ১৮০-২০০ টাকায়।
এরপর সেঞ্চুরি হাঁকানো সবজির তালিকাও বেশ লম্বা। এক কেজি টমেটোর দাম এখন ১০০-১২০ টাকা। বেগুনের কেজি ১০০-১১০ টাকা। তা ছাড়া শসা, করলা ও গাজরের কেজিও তিন অঙ্কের কোটায় বা ১০০ টাকা। আর সেঞ্চুরির কাছাকাছি আছে গোটা দশেক সবজি। যেমনÑ কাঁকরোল ৮০-৯০, ঝিঙ্গা-চিচিঙ্গা ৮০, পটোল ৮০ ও ঢেঁড়স ৮০ টাকা। তা ছাড়া খেতে কিছুটা গন্ধ হওয়ায় যে মুলা অনেকেই খান না সেই মুলার কেজিও এখন ৮০ টাকা। এ ছাড়াও ধুন্দল ৮০, লাউ ৭০, এক কেজি লতি ৭০, কচুরমুখী ৭০ ও মিষ্টি কুমড়ার কেজি ৬০ টাকা। বাজারে এখন সবচেয়ে সস্তা যে সবজিটি সেটিও হাফ সেঞ্চুরি হাঁকিয়েছে। সবজিটি হচ্ছে পেঁপে, ৫০ টাকায় মিলছে এক কেজি। এর আগে কবে পেঁপের কেজি ৫০ টাকা এবং মুলার কেজি ৮০ টাকা হয়েছে তাও স্মরণ করে বলতে পারলেন না কোনো সবজি বিক্রেতা।
কথায় আছেÑ ‘বোঝার ওপর শাকের আঁটি’। দাম বৃদ্ধির দিকে দিয়ে শাকও পিছিয়ে নেই। এ জন্য ক্রেতার জন্য শাকের আঁটিও এখন অনেক ভারী। কারণ এক আঁটি লাউ শাক কিনতে হলে এখন ক্রেতাকে গুনতে হবে ৪০-৫০ টাকা। এক আঁটি পুঁই শাকের দাম ৪০ টাকা। তা ছাড়া এক আঁটি পাটশাক ২০, লালশাক ১৫, কলমিশাক ১৫ ও কচুশাক ১০ টাকা। অথচ মাস খানেক আগেও অন্তত শাকের দাম এত বেশি ছিল না। এক মাসে সব ধরনের শাকের দাম বেড়েছে আঁটিপ্রতি ৫-২০ টাকা পর্যন্ত।
ক্রেতার কষ্ট বেড়েছে, কমেছে খাওয়া : বাজারে কোনো পণ্যের দাম বাড়লে ভোক্তার কষ্টটা সবচেয়ে বেশি। আর সবজির দাম বাড়লে তো কথাই নেই। ক্রেতারা এখন সবজি কেনা এবং খাওয়া-দুটিই কমাতে বাধ্য হয়েছেন। কারণ অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধির ফলে সবজি কিনলেই পকেট ফাঁকা হয়, অন্য পণ্য কীভাবে কিনবেন। তাই সবজি কম করে কিনে অন্য পণ্য কিনছেন অল্পবিস্তর। কারণ চাল, ডাল, তেলসহ অন্য সব পণ্যের দামও বেড়েছে অস্বাভাবিক।
রাজধানীর হাতিরপুল বাজারে সবজি কিনতে আসা ক্রেতা দেলোয়ার হোসেন সময়ের আলোকে বলেন, ‘মানুষ এখন কি খেয়ে বাঁচবে। বউ বাজারের ফর্দ হাতে ধরিয়ে দেয়, সেটি নিয়ে বাজারে আসলে দাম শুনে তো মাথা ঘুরে যায়। একটি ভোগ্যপণ্যও এখন আমাদের মতো মধ্যবিত্ত পরিবারের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে নেই। মাছ-মাংস এক দিন-দুই দিন না খেলেও চলে, কিন্তু সবজি তো প্রতিদিন দরকার। সেই সবজিও এখন নাগালের বাইরে। তাহলে আমরা কি খেয়ে বাঁচব। সংসার চালানো এখন কঠিন হয়ে পড়েছে। আয়ের চেয়ে ব্যয় বেড়ে গেছে কয়েকগুণ। তাই ধারদেনা করে সংসার চালাতে হচ্ছে।’
একই বাজারের আরেক ক্রেতা বিলকিস বেগম বলেন, আমার স্বামী মাত্র ১৫ হাজার টাকা বেতনে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের গাড়িচালক। আমাদের পাঁচ জনের সংসার। সপ্তাহে এক দিন মাছ বা মাংস খেতাম। বাকি দিনগুলো সবজি দিয়েই ভাত খেতাম। এখন সে সুযোগও নেই। কারণ আগে এককেজি বেগুন কিনলে এখন দুটির বেশি কিনতে পারি না। কাঁচামরিচ ১০০ গ্রামের বেশি কেনার সামর্থ্য নেই। এভাবে কোনো সবজিও এক পোয়া বা আধা কেজির বেশি কিনতে পারি না। তাই দিনের তিন বেলার মধ্যে এক বেলা শুধু ভর্তা আর ভাত, বাকি দুই বেলা অল্প সবজি দিয়ে ভাত খেতে হচ্ছে। আসলেই আমাদের মত অল্প আয়ের মানুষের খুব কষ্ট হচ্ছে, কিন্তু আমাদের কষ্ট দেখারও কেউ নেই, বলারও কেউ নেই।
হাতিরপুল বাজারের সবজি বিক্রেতা মো. হেলাল উদ্দিন বলেন, বিগত ২০ বছর ধরে তিনি এ বাজারে সবজি বিক্রি করেন। সময়ের আলোকে বুধবার তিনি বলেন, এই দীর্ঘ সময়ে আমি কখনও এক সঙ্গে সব ধরনের সবজির দাম এত বৃদ্ধি পেতে দেখিনি। দাম বাড়ায় ক্রেতার যেমন কষ্ট বেড়েছে তেমনই আমাদেরও কষ্ট বেড়েছে। কেননা একদিকে সবজির বিক্রি কমেছে, আবার লাভও কমেছে। অন্যদিকে আগে ১০ হাজার টাকার সবজি আনলে দোকান ভরে যেত, কিন্তু এখন ৪০ হাজার টাকার সবজিতেও দোকান খালি থাকছে। সবজির দাম কমলে ক্রেতার মতো আমরাও স্বস্তি পাই। তবে শীতের সবজি ভরপুর না ওঠা পর্যন্ত সবজির দাম কমার কোনো সম্ভাবনা নেই।

About the author

CrimeSearchBD

%d bloggers like this: