সারাদেশ

শ্রীমঙ্গলে ইউপি সদস্যের বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ

Written by CrimeSearchBD

শ্রীমঙ্গল উপজেলার ভুনবীর ইউনিয়নের ৭, ৮ ও ৯ নং ওয়ার্ডের একজন ইউপি সদস্যা ৷তার নাম মিনারা বেগম। মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলার ভূনবীর ইউনিয়নের এলাকাবাসী এবং ভুক্তভোগীদের অভিযোগ— বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, গর্ভবতী ভাতা— প্রায় সব ধরনের ভাতা কার্ড করতে গেলেই তাকে কমিশন দিতে হয়। অন্যথায় স্থানীয় সাধারণ মানুষ সরকারি অনেক সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন। অভিযোগ উঠেছে এমন কোনো ভাতা নেই যেখান থেকে এই ইউপি সদস্যা উৎকোচ নেন না। তার বিরুদ্ধে এলাকাবাসীর অভিযোগেরও অন্ত নেই।

উপকারভোগীরা কার্ড করার জন্য কখনো ভাতার পুরো টাকা, কখনো অগ্রিম টাকা, কখনো বা ভাতারা টাকার একটি অংশ দিতে বাধ্য হন ওই ইউপি সদস্যকে।

ইউনিয়নের বিভিন্ন ভাতার কার্ড করে দেওয়ার নামে সাধারণ জনগণের কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা। টাকা না দিলে কার্ড করে দেন না বলেও অভিযোগ করেছেন তার এলাকার ভোটাররা।

বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, গর্ভকালীন ভাতা পাওয়ার জন্য কার্ড পাওয়ার আগে ও পরে পাঁচ হাজার টাকা না দিলে এই নারী ইউপি সদস্য কার্ড বাতিল করার হুমকিও দেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

টাকা দেওয়ার বিষয়টি কাউকে জানালে তার হেনস্তার শিকার হতে হয় সাধারণ জনগণের।

ভুনবীর ইউনিয়নের বাসিন্দা ছমেদ মিয়া বলেন, ‘আমি বয়স্ক ভাতা পাওয়ার যোগ্য। কিন্তু, ভাতা পাই না।

মেম্বারনির কাছে গেলে তিনি বললেন, ভাতা করে দেব, কিন্তু ভাতা পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাকে পাঁচ হাজার টাকা দিতে হবে। আমি টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানাই। তারপর অনেক দিন ঘুরাঘুরি করেও কার্ড পাইনি।’

‘আমি গরিব মানুষ। ভাবলাম, কিছু টাকা দিয়েও যদি কার্ড পাই, অসুবিধা কী। পরে মেম্বারনিকে বলেছি, ভাতার টাকা পেলেই পাঁচ হাজার টাকা দেব। পরে তিনি আমায় কার্ড করে দেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘যেদিন ব্যাংক থেকে আমি বয়স্ক ভাতার টাকা উঠাই, সেদিন তিনি ব্যাংকের নিচে দাঁড়িয়ে ছিলেন। ব্যাংক থেকে বের হওয়ার পরই তিনি পাঁচ হাজার টাকা নিয়ে নেন।’

‘শুধু আমার কাছ থেকেই নয়, আরও কয়েকজনের কাছ থেকেও নেন,’ যোগ করেন ছমেদ মিয়া।

জ্যোৎস্না বেগম নামে একজন বলেন, ‘আমি গর্ভবতী অবস্থায় মিনারা বেগমের কাছে গিয়েছিলাম গর্ভ-ভাতার কার্ড করে দেওয়ার জন্য। তিনি বলেন, টাকা ছাড়া এসব কার্ড করা যায় না। আমার কাছে কোনো টাকা ছিল না। তিনি বলেন, যতবার টাকা পাবে ততবার অর্ধেক টাকা দিতে হবে।’

‘আমি গরিব মানুষ। টাকার দরকার ছিল তাই আমি রাজি হই। আমি চার বার তিন হাজার টাকা করে পাই। এর মধ্যে তিন বার তিনি টাকা উঠানোর সঙ্গে সঙ্গে অর্ধেক (১,৫০০ টাকা) করে নিয়েছেন। শেষবার আমি তাকে টাকা দেইনি।’

জ্যোৎস্না বেগমের আরও অভিযোগ, ‘মেম্বারনি ওই টাকা নেওয়ার জন্য আমার সঙ্গে অনেক খারাপ আচরণ করেছেন। বলেছেন, আর জীবনেও আমার ও আমার পরিবারের কাউকে কার্ড করে দিবেন না। তিনি মোট সাড়ে চার হাজার টাকা আমার কাছ থেকে নিয়েছেন।’

চেরাগ আলী নামে গ্রামের একজন অভিযোগ করে বলেন, ‘কার্ড করতে নাকি অনেক টাকা লাগে। উপজেলার বিভিন্ন কর্মকর্তাকে নাকি ঘুষ দিতে হয়। উপজেলার কর্মকর্তাদের টাকা না দিলে কার্ড করা যায় না— এসব কথা বলে মেম্বারনি আমার কাছ থেকে কার্ড করার আগে পাঁচ হাজার টাকা নেন। আমি ঋণ করে তাকে টাকা দেই। পরে আমাকে অনেক দিন ঘুরিয়ে কার্ড করে দেন।’

নাম প্রকাশ না করে ওই গ্রামের একাধিক বাসিন্দা জানান, তারা কার্ড করার আগেই ইউপি সদস্য মিনারা বেগমকে পাঁচ হাজার টাকা করে দিয়েছেন। যারাই টাকা দিয়েছেন তাদেরই কার্ড হয়েছে। কেউ আগে টাকা না দিলেও পরে ব্যাংক থেকে ভাতা পাওয়ার সময় টাকা তুলে দিতে বাধ্য হয়েছেন।

পাঁচ হাজার টাকা নেওয়ার পরও তিনি আরও টাকা দাবি করেন উল্লেখ করে গ্রামবাসীরা জানান, যদি কেউ মুখ খোলে তাহলে মিনারা বেগম তাদের কার্ড বাতিল করে দেওয়ার হুমকি দেন। তার লোকজন মারধরের হুমকি দেয়। তাই কেউ এই বিষয়ে প্রকাশ্যে মুখ খুলতে চান না।

এদিকে, উপকারভোগীরা যে ব্যাংক থেকে টাকা তুলেন সেই ব্যাংকের নিচে এক ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘মিনারা বেগম প্রায়ই লোকজন নিয়ে এখানে আসেন এবং ব্যাংকের নিচে দাঁড়িয়ে থাকেন।’

ভুনবীর ইউনিয়ন পরিষদের ইউপি সদস্য (ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান) মো. নিয়াজ ইকবাল মাসুদ জানান, ‘আমাদের কাছেও অনেকে ওই ইউপি সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন। তিনি প্রভাবশালী হওয়ায় সাধারণ জনগণ ভয়ে উনার নামে লিখিত অভিযোগ দিচ্ছেন না। তবে আমাদেরকে এলাকার লোকজন প্রায়ই অভিযোগ করছেন। আমরা বিষয়টি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাচ্ছি।’

ঐ একই এলাকার সিএনজি চালক মর্তুজ আলী জানান, তার ছোট ভাইয়ের স্ত্রী জোসনা বেগম কার্ড করতে যান ঐ ইউপি সদস্যার বাড়িতে। ইউপি সদস্যা কার্ড করে দিতে তাৎক্ষণিক ৫০০০ টাকা দাবী করায় তিনি অনেক চেষ্টা করেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত টাকা ম্যানেজ করতে না পারায় ইউপি সদস্যা মিনারা বেগমেকে অনেক অনুরোধ করেও লাভ হয়নি। শেষমেশ তার চাহিদামতো টাকা দিতে না পারায় তার ভাতা কার্ডও করে দেননি তিনি।

এ বিষয়ে অভিযুক্ত ইউপি সদস্যার মুখোমুখি হয় সময়ের আলোর এ প্রতিবেদক, প্রতিবেদক অভিযুক্ত ইউপি সদস্যা মিনারা বেগমের কাছে জানতে চান সাধারণ মানুষের অভিযোগ প্রসঙ্গে।

তিনি সময়ের আলোকে বলেন, ‘টাকা নেওয়ার বিষয়টি সত্য নয়। এটি সম্পূর্ণ মিথ্যা। আমি কোনো ভাতার কার্ড করার জন্য কারো কাছে টাকা-পয়সা চাইনি। আমাকে ষড়যন্ত করে একটি মহল ফাঁসানোর চেষ্টা করছে।’

শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম সময়ের আলোকে বলেন, ‘আমি অভিযোগ পেয়েছি এবং ইতোমধ্যে এই বিষয়টি তদন্তের জন্য দুজনকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।’

তদন্তে দোষী প্রমাণিত হলে ঐ মহিলা ইউপি সদস্যার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় কঠোর ব্যাবস্থা গ্রহণ করা হবে।কোনোভাবেই এমন অপরাধের সাথে সম্পৃক্ত কাউকে ছাড় দেয়া হবে না।’

About the author

CrimeSearchBD

%d bloggers like this: