ক্রাইম

শিবপুরে স্ত্রীসহ তিনজনকে কুপিয়ে হত্যা, স্বামী আটক

Written by CrimeSearchBD

শিবপুরের একটি বাড়িতে রোববার ভোরে স্বামীর হাতে স্ত্রীসহ তিনজন নৃশংসভাবে খুন হয়েছেন। পুলিশ ও স্থানীয়রা জানিয়েছেন, পারিবারিক কলহের জেরে ভোরে উপজেলার কুমরাদী গ্রামে ভাড়াটিয়া বাদল মিয়া তার স্ত্রী নাজমা বেগমকে (৪০) ধারালো অস্ত্র দিয়ে হত্যা করে। এ সময় নাজমাকে বাঁচানোর চেষ্টা করে বাধা সৃষ্টি করায় বাদল বাড়িওয়ালা তাইজুল ইসলাম (৫৫) ও তার স্ত্রী মনোয়ারা বেগমকেও (৪৫) কুপিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করে। একইভাবে বাদলকে ঠেকাতে গিয়ে এ ঘটনায় আহত হয়েছেন বাড়িওয়ালা তাইজুলের মেয়ে কুলসুম (২৩) ও নিহত নাজমার আগের স্বামীর পক্ষের ছেলে সোহাগ আহমেদ (১৫)। এ ঘটনার পরপরই স্থানীয়রা পেশায় কাঠমিস্ত্রি বাদলকে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করেন।
সরেজমিনে গতকাল সকালে ঘটনাস্থলে দেখা গেছে কুমরাদী গ্রামের তাইজুলের টিনশেডের বেড়া ও ছাউনিযুক্ত বাড়ির একটি কক্ষের মেঝে ও দেওয়ালের বিভিন্ন স্থানে ছোপ ছোপ রক্তের দাগ। বাড়ির আঙিনাতেও বিভিন্ন স্থানে রক্ত লেগেছিল। ঘটনাস্থল বাড়িটি ঘিরে সেখানে জড়ো
হয়েছিলেন হাজারো কৌতূহলী মানুষ।
নিহতদের স্বজনরা এ ঘটনায় কান্না আর বিলাপ করছিলেন। তদন্ত সংশ্লিষ্ট পুলিশ, পিবিআই, সিআইডি ও র‌্যাবসহ বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তা ও সদস্যরা সেখানে ঘটনার আলামত সংগ্রহসহ প্রতিবেশীদের সঙ্গে কথা বলছিলেন।
এ সময় প্রতিবেশীরা সময়ের আলোকে জানান, তাইজুলের টিনশেডের দুই কক্ষের বাসা ভাড়া নিয়ে বসবাস করতেন বাদল ও নাজমা। দীর্ঘদিন ধরে বাদল ও নাজমার মধ্যে দাম্পত্য ও পারিবারিক কলহ বিরাজ করছিল। তারই ধারাবাহিকতায় গতকাল ভোর সাড়ে ৪টার দিকে স্ত্রী নাজমা বেগম ও স্বামী বাদল মিয়ার মধ্যে তুমুল ঝগড়া হয়। একপর্যায়ে বাদল স্ত্রী নাজমা ও তার আগের সংসারের এক ছেলে সোহাগকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে আহত করে। তাদের চিৎকার শুনে এ সময় বাড়ির মালিক তাইজুল, তার স্ত্রী মনোয়ারা ও মেয়ে কুলসুম এগিয়ে এলে তাদেরও ছুরি দিয়ে কুপিয়ে আহত করে বাদল। পরে স্থানীয়রা আহতদের রক্তাক্ত অবস্থায় উদ্ধার করে নরসিংদী সদর হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক নাজমা ও মনোয়ারাকে মৃত ঘোষণা করেন। সেখান থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য গুরুতর অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে মারা যান বাড়ির মালিক তাইজুল ইসলাম।
প্রতিবেশীরা আরও জানান, রক্তমাখা ধারালো অস্ত্র নিয়ে বাদল ভয়ঙ্করভাবে ছোটাছুটি করছিল। এ সময় প্রতিবেশী যেই এগিয়ে যাচ্ছিল তাকেই ছুরি নিয়ে হামলার জন্য তেড়ে যাচ্ছিল। একপর্যায়ে নাজমার বড় ছেলে নাদিম হোসেন (১৮) একটু দূর থেকে ইটের টুকরো বাদলের দিকে ছুড়ে মারলে গায়ে লেগে ছুরিটি হাত থেকে পড়ে যায়। তখনই আশপাশের লোকজন বাদলকে জাপটে ধরে মারধর দিয়ে পুলিশে সোপর্দ করেন।
শিবপুর মডেল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. আবুল কালাম সময়ের আলোকে বলেন, প্রতিবেশীরা মারধর দিয়ে বাদলকে পুলিশে সোপর্দ করলে তাকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। পুলিশি প্রহরায় তার চিকিৎসা চলছে। বাদল কিছুটা সুস্থ হলেই এ বিষয়ে তাকে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। এ ছাড়া এ ঘটনায় আহত নাজমার ছেলে সোহাগও ঘটনার সময় তাদের মা-বাবার (বাদল) সঙ্গেই একই কক্ষেই ছিল। ফলে কী নিয়ে বাদল ও নাজমার মধ্যে ঝগড়া হচ্ছিল সেটিও সোহাগ সুস্থ হলে জানা যাবে। সোহাগ বর্তমানে ঢামেক হাসপাতালে ভর্তি আছে।
পরিদর্শক আবুল কালাম বলেন, প্রাথমিক তদন্তে মনে হচ্ছে নাজমার সন্তানদের নিয়ে থাকাসহ পারিবারিক কলহের জেরেই বাদল এ ঘটনা ঘটিয়েছে।
শিবপুরের পুটিয়া ইউনিয়ন পরিষদের স্থানীয় ৩ নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বার আবদুর রহমান রতন সময়ের আলোকে জানান, কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়ার ইছাখালি গ্রামের কাঠমিস্ত্রি বাদল মিয়া ৯ বছর আগে শিবপুরের দুলালপুর এলাকার তালাকপ্রাপ্তা নাজমা বেগমকে বিয়ে করে। অন্যদিকে বাদল এর আগে আরও দুটি বিয়ে করেছে। যার মধ্যে পাকুন্দিয়ায় একজন স্ত্রী ও সন্তান রয়েছে বলে রতন জানতে পেরেছে। নিহত নাজমার প্রথম স্বামীর নাম জামাল উদ্দিন। নাজমার প্রথম স্বামীর পক্ষের দুই ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে। মেয়েটির বিয়ে হয়েছে এবং তিনি স্বামীর সংসারেই থাকেন। দুই ছেলে নাদিম ও সোহাগ মায়ের সঙ্গেই থাকত। তবে বাদলের পক্ষে নাজমার কোনো সন্তান ছিল না। নাজমা ও বাদল কুমরাদী গ্রামে তাইজুলের বাড়িতে ভাড়া থেকে বসবাস করে আসছিলেন। এর মধ্যেই নাজমা-বাদলের মধ্যে দাম্পত্য ও পারিবারিক কলহ বিরাজ করছিল।
স্থানীয়রা জানান, বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়াতে গিয়ে বাড়িওয়ালা দম্পতি নৃশংস হামলার শিকার হয়ে মৃত্যুর ঘটনায় শোকের সাগরে ভাসছেন তাদের স্বজনরা। পাশাপাশি একজন হিংস্র মানুষের হাতে ‘ট্রিপল’ (তিন) হত্যাকাণ্ডের এমন ভয়ানক ঘটনায় আঁতকে উঠছেন স্থানীয়রা।
পুলিশ ও স্থানীয়দের ধারণা, স্ত্রী নাজমার প্রথম পক্ষের সন্তানদের নিয়ে পারিবারিক কলহের জেরে বাদল এ নৃশংস ঘটনা ঘটিয়ে থাকতে পারেন। পাশাপাশি বাদলের গ্রামের বাড়িতে আরেকটি স্ত্রী ও একাধিক সন্তান রয়েছে। সবমিলে বড় কোনো কলহ থেকে এমন নৃশংস ঘটনা ঘটতে পারে।

About the author

CrimeSearchBD

%d bloggers like this: