জাতীয় সংবাদ

মুক্তিকামী জনতার বিজয়োল্লাস

Written by CrimeSearchBD

আজ ১৫ ডিসেম্বর। একাত্তরের এই দিনে চারদিক থেকে পরাজিত হতে হতে পাকিস্তানি বাহিনী বুঝে ফেলে যুদ্ধে তাদের পরাজয় নিশ্চিত। শুধু নিশ্চিত হতে চাইছিল তারা যখন আত্মসমর্পণ করবে তখন তাদের হত্যা করা হবে না। কেননা মার্কিন সপ্তম নৌবহরকে মোকাবিলা করার জন্য ১৫ ডিসেম্বর বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত ভারতীয় নৌবাহিনীর সমর্থনে সোভিয়েত রণতরীর ২০টি জাহাজ ভারত মহাসাগরে অবস্থান নেয়। এরপর মার্কিন রণতরী সপ্তম নৌবহর যুদ্ধে অংশ নেওয়া থেকে নিজেদের গুটিয়ে নেয়। পাকিস্তানের মনে যুদ্ধে সাহায্য পাওয়ার যেটুকু আশা ছিল সেটাও এর সঙ্গে শেষ হয়ে যায়। একাত্তরের ১৫ ডিসেম্বর দেশের অধিকাংশ রণাঙ্গনে চলছিল মুক্তিকামী জনতার বিজয়োল্লাস। অসংখ্য নদী-নালা, খাল-বিলসহ নানা প্রাকৃতিক প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে ইতোমধ্যে মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত যৌথ বাহিনী চারদিক থেকে ঘেরাও করে ফেলায় অবরুদ্ধ ঢাকা কার্যত অচল হয়ে পড়ে।
ঢাকাসহ পাশর্^বর্তী এলাকায় বিভিন্ন সামরিক স্থাপনায় ক্রমাগতভাবে ভারতীয় মিগের একের পর এক বোমাবর্ষণ ও স্থলপথে মিত্রবাহিনীর
আর্টিলারি আক্রমণে দখলদার বাহিনীতে চরম বিপর্যয় নেমে আসে। পাকিস্তানি জেনারেল নিয়াজির দেওয়া যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবে সাড়া দিয়ে ১৫ ডিসেম্বর বিকালে জেনারেল মানেকশ হানাদার বাহিনীকে জানিয়ে দেন যে, শর্তহীন আত্মসমর্পণ না করলে যুদ্ধবিরতি প্রস্তাবে সম্মতি দেওয়া হবে না। এ সময় প্রস্তাবের প্রতি মিত্রবাহিনীর আন্তরিকতার নিদর্শন হিসেবে ১৫ ডিসেম্বর বিকাল ৫টা থেকে ১৬ ডিসেম্বর সকাল ৯টা পর্যন্ত ঢাকার ওপর বিমান হামলা বন্ধ রাখা হবে বলে পাকিস্তানি জেনারেলকে জানিয়ে দেওয়া হয়। এমনকি আত্মসমর্পণ করলে মিত্রবাহিনী কোনো প্রতিশোধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়াবে না বলেও পাকিস্তানি জেনারেলকে আশ^স্ত করা হয়। তবে সেসঙ্গে পাকিস্তানি জেনারেলকে হুঁশিয়ার করে দিয়ে এ-ও বলা হয়, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শর্তহীন আত্মসমর্পণ না করলে ১৬ ডিসেম্বর সকাল ৯টা থেকে সর্বশক্তি নিয়ে আক্রমণ করা ছাড়া মিত্রবাহিনীর কোনো গত্যন্তর থাকবে না। জেনারেল নিয়াজি তাৎক্ষণিকভাবে এ বিষয়ে পাকিস্তানি হেডকোয়ার্টারকে অবহিত করে। পরিস্থিতির ভয়াবহতা উপলব্ধি করে ১৫ ডিসেম্বর গভীর রাতে পাকিস্তানের তদানীন্তন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ঢাকায় জেনারেল নিয়াজিকে নির্দেশ দেন যে, ভারতের সেনাবাহিনী প্রধান পাকিস্তানিদের আত্মসমর্পণের জন্য যেসব শর্ত দিয়েছেন, যুদ্ধবিরতি কার্যকর করার জন্য তা মেনে নেওয়া যেতে পারে। নিয়াজি তাৎক্ষণিকভাবে তা ভারতীয় সেনাপ্রধান জেনারেল মানেকশকে অবহিত করেন।
এদিনটি মূলত পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর চূড়ান্ত আত্মসমর্পণের দিন-ক্ষণ নির্ধারণের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হয়। বিকালে যৌথ বাহিনী বিনাপ্রতিরোধে সাভারে প্রবেশ করে। সাভারের পাকিস্তানি বাহিনী পিছু হটে এসে রাজধানীর প্রবেশপথ মিরপুর ব্রিজের ওপর প্রতিবন্ধকতা গড়ে তোলে। রাতে যৌথ বাহিনী সাভার থেকে ঢাকার উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে। পথে কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বে কাদেরিয়া বাহিনী ভারতীয় ও বাংলাদেশ বাহিনীর সঙ্গে যোগ দেয়। রাত ২টায় মিরপুর ব্রিজের কাছে যৌথ বাহিনী পাকিস্তানি সেনাদের মুখোমুখি হয়। যৌথ বাহিনী ব্রিজ দখলের জন্য প্রথমে কমান্ডো পদ্ধতিতে আক্রমণ শুরু করে। ব্রিজের ওপাশ থেকে পাকিস্তানি বাহিনী মুহুর্মুহু গোলাবর্ষণ করতে থাকে। এ সময় যৌথ বাহিনীর আরেকটি দল এসে পশ্চিম পাড় দিয়ে আক্রমণ চালায়। সারারাত তুমুল যুদ্ধ চলে।
অন্যদিকে চট্টগ্রাম রণাঙ্গনে মুক্তিবাহিনী কুমিরার দক্ষিণে আরও কয়েকটি স্থান হানাদারমুক্ত করে। সন্ধ্যায় মুক্তিযোদ্ধারা চট্টগ্রাম শহরের প্রথম রক্ষাবূহ ভাটিয়ারিতে আক্রমণ চালায়। সারারাত মুক্তিবাহিনী ও পাকিস্তানি বাহিনীর মধ্যে যুদ্ধ চলে। ভাটিয়ারি থেকে ফৌজদারহাট পর্যন্ত রাস্তায় রাস্তায় যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে। যৌথ বাহিনী বিভিন্ন দিক থেকে রংপুরের দিকে অগ্রসর হয়। রাতে তারা চারদিক থেকে রংপুর শহর ঘিরে ফেলে। যৌথ বাহিনীর পর দিন রংপুর সেনানিবাসে আক্রমণ করার কথা ছিল। কিন্তু যুদ্ধবিরতির ঘোষণা হওয়ায় তার আর প্রয়োজন হয়নি।
এদিন ফরিদপুর অঞ্চলে যৌথ বাহিনী কামারখালীর পাকিস্তানি ঘাঁটির ওপর আক্রমণ চালায়। পাকিস্তানি বাহিনী সাঁড়াশি আক্রমণের মুখে অবস্থান ছেড়ে ফরিদপুরের দিকে পালাতে থাকে। যৌথ বাহিনী তাদের পিছু ধাওয়া করে। পথে প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হয়ে স্বেচ্ছায় শত্রুসেনারা যৌথ বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে।
কয়েকদিন বিরতির পর এদিন সকালে ঢাকার আকাশে আবার দেখা দেয় ভারতীয় বিমানবাহিনীর বোমারু বিমানগুলো। বেলা ১১টায় গভর্নর ডা. মালিক তার মন্ত্রিপরিষদ ও সামরিক বেসামরিক উপদেষ্টাদের নিয়ে বৈঠক করার মুহূর্তে ভারতীয় বোমারু বিমানগুলো উড়ে এসে গভর্নর হাউসের ওপর রকেট হামলা করে। ডা. মালিক প্রাণ বাঁচানোর জন্য ট্রেঞ্চে গিয়ে আশ্রয় নেন।
ভারতীয় সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল মানেকশ পাকিস্তানি কমান্ডারদের আত্মসমর্পণের জন্য শেষবারের মতো নির্দেশ দেন। জেনারেল মানেকশ তার নির্দেশে বলেন, আমি আবার বলছি আর প্রতিরোধ করা নিরর্থক। ঢাকা গ্যারিসন এখন সম্পূর্ণভাবে আমাদের কামানের আওতায়।
রণাঙ্গনে পাকিস্তানি সেনারা দলে দলে অস্ত্র সমর্পণ করতে থাকে। দুপুরের দিকে বগুড়ার পাকিস্তানি ডিভিশন হেডকোয়ার্টার ও ব্রিগেড হেডকোয়ার্টারের পতন হয়। আত্মসমর্পণ করে পরাজিত বাহিনীর ১৭০০ সেনা ও অফিসার। এখানে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ যৌথ বাহিনীর হস্তগত হয়।

About the author

CrimeSearchBD

%d bloggers like this: