সারাদেশ

মানব পাচারে ধরন বদল

Written by CrimeSearchBD

মানবপাচারের ধরন বদলেছে। আগে অপহরণ করে পাচার করা হতো। কিন্তু এখন উচ্চ বেতনে কাজের কথা বলে চলছে মানবপাচার। বিশেষ করে এই টার্গেটে রয়েছে নারী ও শিশুরা। কখনও কাজ, আবার কখনও বিদেশে বারে ড্যান্সের কথা বলেও করা হচ্ছে মানবপাচার। সম্প্রতি এমনই কয়েকটি চক্রকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। গ্রেফতারকৃতদের দেওয়া তথ্যে বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে নানা চাঞ্চল্যকর তথ্য।
গত বছর ভিয়েতনাম, তিউনেশিয়া, ব্রুনাই, সৌদি আরব ও দুবাইসহ বিভিন্ন দেশ থেকে প্রাণে বেঁচে আসা ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন, তাদের উচ্চ বেতনের কথা বলে ভুয়া কোম্পানি, ট্যুরিস্ট ভিসা ও ভুয়া ওয়ার্ক পারমিটে দেশগুলোতে পাচার করা হয়েছিল। সেখানে তারা কোনো কাজ পাননি। পরে জানতে পারেন কোম্পানিটিও ভুয়া। পাচারের শিকার এমন অনেককে শারীরিক নির্যাতন করে পরিবারের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকাও আদায় করা হয়েছে। খাবার না দিয়েই দিনের পর দিন আটকে রাখা হয়েছিল বদ্ধ রুমে। তবে কাজের কথা বলে মানবপাচারের বিষয়টি সামনে আসে সম্প্রতি লিবিয়ায় ২৬ বাংলাদেশির মৃত্যুর ঘটনার মধ্য দিয়ে। সম্প্রতি বারে নাচের কথা বলেও পাচার করা হয়েছে অনেক নারীকে, যাদের প্রত্যেককে উচ্চ বেতনের প্রলোভন দেখানো হয়েছিল। কিন্তু সেখানে যাওয়ার পর তাদের দেহ ব্যবসায় বাধ্য করা হয়েছিল। এসব ভুক্তভোগী নারী কোনো অর্থ-কড়িও পাননি। পাচার নিয়ে কাজ করা বেসরকারি বিভিন্ন এনজিওর তথ্য বলছে, ২০১২-১৯ পর্যন্ত ৯২৩ জন শিশু ও ১ হাজার ৯৭১ জন নারী পাচারের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে নারী ২১ শতাংশ ও শিশু ১১ শতাংশ। বাকি সংখ্যা ছিল পুরুষের। তবে বাংলাদেশের মানুষ মূলত দারিদ্র্য, লিঙ্গবৈষম্য, আবহাওয়ার পরিবর্তন, ভৌগোলিক অবস্থান, সচেতনতার অভাব, দুর্বল প্রশাসনের মতো অন্যতম কারণে মানবপাচারের শিকার হয় বলে মনে করেন মানবপাচার নিয়ে কাজ করা সংশ্লিষ্টরা।
চাকরির প্রলোভনে পতিতালয়ে বিক্রি : নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার জবা আক্তার (ছদ্মনাম) স্থানীয় বিভিন্ন অনুষ্ঠানে নাচতেন। একদিন এক যুবকের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। তিনি তাকে দুবাইয়ের একটি ক্লাবে নাচের চাকরির অফার করেন। অসুস্থ মায়ের কথা ভেবে জবাও রাজি হয়ে যান। সেখানকার নারায়ণগঞ্জের আযম খান নামে এক ব্যক্তির অভিজাত হোটেলে দুবছর ধরে তাকে দেহ ব্যবসা করতে বাধ্য করা হয়। সম্প্রতি সেই জবাকে দেশে ফেরত আনা হয়েছে। তবে জবা জানিয়েছেন, তার মতো অনেক নারী এখনও সেখানে আটকা রয়েছেন।
বেশি বেতনের প্রলোভনে ভারতে পাচার : নাজমা আক্তার (ছদ্মনাম) ফতুল্লায় একটি গার্মেন্টস কারখানায় চাকরি করতেন। একদিন জাহাঙ্গীর নামে এক প্রতিবেশী বিদেশে গিয়ে একই শ্রমে সে ৮০ হাজার টাকা পাবে বলে তাকে প্রলোভন দেখায়। পরে সেই জাহাঙ্গীর তার বিষয়ে ভুয়া তথ্য দিয়ে পাসপোর্ট তৈরি করে এবং কামরুল নামে এক দালালের মাধ্যমে ভারতে পাচারও করে। মাসখানেক পরই নাজমাসহ আরও কিছু নারী ভারতে গ্রেফতার হন। এরপর তাদের ঠিকানা হয়েছিল দেশটির কারাগারে। পরবর্তী সময়ে নাজমা একদিন ফোন করে বিষয়টি জানালে একটি বেসরকারি সংস্থার মাধ্যমে নাজমাকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। কিন্তু সেই জাহাঙ্গীর ও কামরুল অধরাই রয়ে গেছে।
পাচারকারীদের বিরুদ্ধে মামলা করে বিপাকে : স্বামী পঙ্গু হওয়ায় অন্যের কাছে হাত পেতে সংসার চালাতেন সায়েমা (ছদ্মনাম)। একদিন প্রতিবেশী জাহিদ নামে এক যুবক তাকে লেবাননে উচ্চ বেতনে চাকরির প্রলোভন দেখায়। স্বামী ও একমাত্র মেয়ের কথা ভেবে রাজি হয়ে যান সায়েমা। পরে তাকে লেবাননে না পাঠিয়ে তুরস্কে পাঠানো হয়। এরপর সেখানকার একটি পতিতালয়ে থাকতে বাধ্য করা হয়। দিন-রাত চলত শারীরিক ও যৌন নির্যাতন। এক পর্যায়ে সায়েমা বিষয়টি ফোন করে তার পরিবারকে জানালে তারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানায়। এরপর ওই এজেন্সিকে চাপ দিয়ে সায়েমাকে দেশে আনা হলে তিনি মামলা করেন। কিন্তু সেই মামলার রায় এখনও পাননি তিনি।
কাজের কথা বলে প্রতারণা, নির্যাতন ও মৃত্যু : কাজের কথা বলে সম্প্রতি নারীদের বিভিন্ন দেশে পাচার করা হচ্ছে। এক দেশের কথা বলে অন্য দেশে পাঠানোরও ঘটনা ঘটছে। ফলে এই প্রলোভনে পড়ে অনেকেই পাচারের শিকার হচ্ছেন। সম্প্রতি দুবাইয়ে হোটেলে কাজ দেওয়ার কথা বলে সৌদিতে গৃহকর্মী হিসেবে এক তরুণীকে পাঠানো হয়েছিল। এই ঘটনায় গত মঙ্গলবার রাজধানীর বনানীতে ফাতেমা ওভারসিস নামে একটি প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালিয়েছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। অভিযানে নেতৃত্বদানকারী ম্যাজিস্ট্রেট পলাশ কুমার বসু জানান, ওই এজেন্সি তরুণীর সঙ্গে প্রতারণা করেছে। তারা তাকে এক দেশের কথা বলে অন্য দেশে পাচার করেছে। শুধু তাই নয়, সে দেশে নিয়ে তাকে অসামাজিক কাজে বাধ্য করার পাশাপাশি অমানবিক নির্যাতনও করেছে। পরিবারের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে এজেন্সির অফিসে অভিযান চালিয়ে মালিক কবির হোসেনসহ দুজনকে আটক করে সাজা প্রদান করা হয়েছে।
এ ছাড়াও বৃহস্পতিবার রাতে রাজধানীর ফকিরাপুলে সৌদি আরবে গৃহকর্মী হিসেবে গিয়ে নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়ে কিশোরী উম্মে কুলসুমের (১৪) মৃত্যুর ঘটনায় তাকে দেশটিতে পাঠানো রিক্রুটিং এজেন্সি মেসার্স এমএইচ ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের মালিক ও তার সহযোগীকে আটক করে র‌্যাব। তারা হলেনÑ মালিক মকবুল হোসাইন ও তার সহযোগী তারেক। অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়া নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট পলাশ কুমার বসু জানান, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলার নূরপুর গ্রামের শহিদুল ইসলামের মেয়ে কুলসুম ১৩ বছর বয়সি তরুণী হলেও তাকে ২৫ বছর দেখিয়ে পাসপোর্ট বানিয়ে সৌদিতে পাঠায় এজেন্সি মেসার্স এমএইচ ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল। তাকে সেখানে একটি বাসায় কাজ করা বাবদ ৩০ হাজার টাকা দেওয়ার কথা থাকলেও তা দেয়নি। উল্টো বাসার মালিক তাকে যৌন নিপীড়নে বাধ্য করত। নির্যাতনের কারণে কুলসুমকে ফিরিয়ে আনার জন্য রিক্রুটিং এজেন্সির সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করার পরও তাদের পক্ষ থেকে কোনো সাড়া পায়নি পরিবার। এর মধ্যে চার মাস আগে সৌদি আরবে গৃহকর্তা ও তার ছেলে মিলে কুলসুমের দুই হাঁটু, কোমর ও পা ভেঙে দেয়। এর কিছুদিন পর একটি চোখ নষ্ট করে রাস্তায় ফেলে দেয়। সেখান থেকে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। তিনি আরও জানান, সৌদি আরবে কুলসুম নির্যাতনের শিকার হয়ে গত ৯ আগস্ট হাসপাতালে ভর্তি হয়। তার পরিবার স্থানীয় দালালের সঙ্গে যোগাযোগ করলেও এমএইচ ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল তাদের প্রতি কোনো সহানুভূতি দেখায়নি। গত ১৭ আগস্ট মারা যায় কুলসুম।
ধারণা করা হয়, প্রতিবছর ৫০ হাজার নারীকে বিদেশে কাজ এবং বিয়ে দেওয়ার নামে পাচার করা হয়ে থাকে। যদিও এ পর্যন্ত কতজন নারী বিদেশে পাচারের শিকার হয়েছে তার তথ্য সরকারের কোনো দফতরের কাছে নেই। তবে মানবপাচার নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা বলছে, মানবপাচারকারী চক্ররা সাধারণত বাংলাদেশে তাদের এজেন্ট নিয়োগ দিয়ে থাকে। এসব ব্যক্তি উচ্চ বেতনের প্রলোভন দেখিয়ে নারী ও পুরুষদের পাচার করে। এ ছাড়াও সম্প্রতি যোগ হয়েছে ড্যান্স ক্লাবে চাকরি। আন্তর্জাতিক চক্র ছাড়াও দেশীয় চক্র সরকারিভাবে শ্রমিক পাঠানোর নামে লাইসেন্স নিয়েও মানবপাচার করছে। তবে এসব ঘটনায় মাত্র গুটিকয়েক এজেন্সিকে শনাক্ত করে নিষিদ্ধ করেছে প্রবাসী মন্ত্রণালয়।
ভুক্তভোগীরা যা জানিয়েছেন : ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মানবপাচারকারী চক্রের সঙ্গে জড়িত আছে বাংলাদেশ, পাকিস্তান, আফগানিস্তান এবং ইরানের বিভিন্ন অঞ্চলের বহুদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানকারী দালাল চক্র। প্রথমে তাদের দলের লোকজন মধ্যপ্রাচ্যে প্রবাসীদের সঙ্গে খুব ভাব জমায়। ভাব জমানোর পর তারা ইউরোপের বিভিন্ন দেশে (গ্রিস, তুরস্ক) এবং সেখান থেকে সহজেই ইতালি গিয়ে অধিক বেতনের চাকরির লোভ দেখায়। তবে এই প্রলোভনে বেশি পা দিচ্ছে পুরুষরা।
পুলিশের তথ্য মতে : বাংলাদেশ পুলিশের তথ্য বলছে, ২০১২-১৮ সাল পর্যন্ত শুধু নারী ১ হাজার ৭৪৭ এবং শিশু ৮৭৩ জন পাচারের শিকার হয়েছে। সে বছরে মোট পাচারের সংখ্যা ছিল ৮ হাজার ১৬১ জন। মাত্র ৭ বছরে মামলা হয় ৫ হাজার ৩৬টি। এর মধ্যে শুধু ২০১৫ সালেই ১ হাজার ২৮টি মামলা করা হয়। পুলিশের তথ্য আরও বলছে, মানবপাচারের ঘটনায় ২০০৪-২০ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৬ হাজার ১৩৪টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় অভিযুক্ত হয়েছে ১১ হাজার ৪৬০ জন। আর এসব মামলায় ২৪ হাজার ৫০৪ আসামির মধ্যে ১০ হাজার ৯২৮ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। শুধু ২৩৩টি মামলায় কেবল ৪০৯ জনকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে এবং ৫৭১টি মামলায় ১ হাজার ৬৯৯ জনকে খালাস দেওয়া হয়েছে। আদালত দণ্ডিত আটজনকে মৃত্যুদণ্ড, ২৯৯ জনকে যাবজ্জীবন এবং ১০২ জনকে বিভিন্ন কারাগারে সাজা দিয়েছেন। আসামিদের অনেকেই খালাস পেয়েছিল, কারণ বিচারে দীর্ঘসূত্রতা।
সংশ্লিষ্টরা যা বলছেন : সিআইডির অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার সৈয়দা জান্নাত আরা সময়ের আলোকে জানান, আমরা চলতি বছর ৯০টি মামলা তদন্ত করছি। তবে লিবিয়ার ঘটনা এবং দুবাইয়ে নারী পাচার মামলা অন্যতম। ড্যান্স ক্লাবে নারী পাচার সংক্রান্ত মামলায় আযম খান নামে এক ব্যক্তিসহ ২৬ জনের সংশ্লিষ্টতা উঠে এসেছে। যদিও জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতারকৃত ৬ আসামি ২৩ জনের নাম বলেছে। তবে সেগুলোও যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল সময়ের আলোকে জানান, আমাদের মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে কাজ করছে। ড্যান্স বারে নাচের নামে দুবাইয়ে যে নারী পাচার হয়েছে সেটি নিয়ে তদন্ত চলছে। আমরা সময় এলে বিস্তারিত বলব।
দেশে মানবপাচার বন্ধে ব্র্যাকের অভিবাসন বিভাগের প্রধান শরীফুল হাসান মনে করেন, এই মানবপাচার থেকে বাঁচতে হলে প্রথমে পরিবার ও ব্যক্তিকে সচেতন হতে হবে। দ্বিতীয়ত, দেশের মধ্যে যেসব দালাল বা এজেন্সি রয়েছে তাদের ধরতে নিয়মিত অভিযান চালানো ও মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তি করতে হবে। তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক চক্রটিকে ভাঙতে হলে ইন্টারপোলসহ বিভিন্ন সংস্থার সহায়তা নিতে হবে। পাশাপাশি দেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গারা যাতে কোনোভাবে পাচারের শিকার না হয়, সেদিকটিও নজরে রাখতে হবে।

About the author

CrimeSearchBD

%d bloggers like this: