সারাদেশ

বিদ্যুৎ গ্রিডে একের পর এক আগুন

Written by CrimeSearchBD

করেছেন খোদ বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ। অগ্নিকাণ্ড রোধে আপ্রাণ চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
এদিকে সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ এবং নিম্নমানের যন্ত্রপাতির মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহের কারণে এমন অগ্নিকাণ্ড হচ্ছে বলে দাবি করছেন বিশেষজ্ঞরা। বজ্রপাত ও যেকোনো শর্টসার্কিটের দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পেতে পাওয়ার গ্রিডের ভেতরে লাইটিং অ্যারেস্টার (এলএ), সার্কিট ব্রেকার, কারেন্ট ট্রান্সফরমার (সিটি) এবং রিলে সিস্টেম থাকে। অথচ এসব সুরক্ষা থাকার পরও ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেই চলেছে। গ্রিডের পাওয়ার ট্রান্সফরমার, লাইটিং অ্যারেস্টার, সার্কিট ব্রেকার, কারেন্ট ট্রান্সফরমার এবং প্যানেল কন্ট্রোলসহ বেশির ভাগ ইকুইপমেন্টই নিম্নমানের বলেও দাবি করছেন গ্রিড-সংশ্লিষ্টরা। এসব ইকুইপমেন্টের গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন প্রকৌশলী, টেকনিশিয়ানসহ সংশ্লিষ্টরা। পাওয়ার গ্রিডের আধুনিকায়ন এবং মানসম্পন্ন ইকুইপমেন্ট স্থাপনের দাবি জানিয়েছেন তারা।
গত তিন বছরের পরিসংখ্যান বলছে, স্বাভাবিক সময়ে অন্তত পাঁচটি অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে। এর বাইরে ঝড়ঝঞ্ঝায় অনেক সময় আগুন লেগে গ্রিড বিকল হয়েছে। টাওয়ার পড়ে যাওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে। সম্প্রতি গ্রিডে আগুন লাগার কারণে ময়মনসিংহ টানা কয়েক দিন বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন ছিল। এবার বিদ্যুৎবিহীন দিন পার করছে সিলেটবাসী। পরপর দুটি অগ্নিকাণ্ড জনমনে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। তবে সঠিক কারণ অনুসন্ধান এবং দায়ীদের শাস্তির কোনো নজির না থাকায় এসব থামছে না। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদ্যুৎ বিভাগের আওতাধীন সব কোম্পানিই দুর্ঘটনা এবং অনিয়মের ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করে থাকে।
তবে গ্রিডে আগুন বন্ধে বিদ্যুৎ বিভাগ যারপরনাই চেষ্টা করছে বলে মন্তব্য করেছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ। সময়ের আলোকে তিনি জানান, সিলেট শহরের কুমারগাঁওয়ে বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রে গ্রিডে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। দুর্ঘটনার পর থেকে সিলেট, সুনামগঞ্জ, ছাতক ও বিয়ানীবাজারে বিদ্যুৎ সরবরাহ সাময়িক বন্ধ রয়েছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মীরা ক্ষতিগ্রস্ত লাইন মেরামতের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। আশা করছি, আজকের পিক আওয়ারের মধ্যেই বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক হতে শুরু করবে। দুর্ঘটনার কারণে সাময়িক অসুবিধার জন্য সিলেট অঞ্চলের বিদ্যুৎ গ্রাহকদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করে মন্ত্রী আরও বলেন, এরকম দুর্ঘটনা কখনই কাম্য নয়। যদি কোনো গ্রিডে নিম্নমানের যন্ত্রপাতি সরবরাহ করা হয়ে থাকে তা হলে অবশ্যই তদন্তের ভিত্তিতে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আগুনের উৎস খুঁজে বের করাসহ ভবিষ্যতে যেন এরকম দুর্ঘটনা না ঘটে বিদ্যুৎ বিভাগ তার জন্য আপ্রাণ কাজ করে যাচ্ছে।
তিনি জানান, সিলেটের কুমারগাঁও উপকেন্দ্রের পাওয়ার ট্রান্সফরমারে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় গত মঙ্গলবার চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে দেয় পাওয়ার গ্রিড অব কোম্পানি অব বাংলাদেশ লিমিটেড (পিজিসিবি)। পাওয়ার গ্রিড পিজিসিবির ট্রান্সমিশন-২-এর প্রধান প্রকৌশলী সাইফুল হককে আহ্বায়ক করে এ কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেনÑ তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী বিএম মিজানুর রহমান, মোহাম্মদ ফয়জুল কবির ও পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ লিমিটেড (শ্রীমঙ্গল) নির্বাহী প্রকৌশলী আব্বাস উদ্দিন। তাদের দেওয়া তদন্ত প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতেই পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্রিড সাবস্টেশন নির্মাণের পর সেগুলোর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বরাদ্দ থাকে। কিন্তু এই বরাদ্দ সঠিকভাবে ব্যয় করা হলে এ ধরনের দুর্ঘটনা ঘটার কথা না। পৃথিবীর কোথাও বিশেষ পরিস্থিতি ছাড়াই এভাবে আপনা থেকেই ট্রান্সফরমারে আগুন ধরে যাওয়ার ঘটনা বিরল।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বুয়েটের অধ্যাপক ইজাজ হোসেন সময়ের আলোকে জানান, বিদ্যুৎ বিতরণ ও সঞ্চালনের সব কিছুতেই নিয়মিত মেইনটেন্যান্স জরুরি। সঞ্চালন লাইনের ক্ষেত্রে এই যে প্রায়ই দুর্ঘটনার কথা শোনা যাচ্ছে সেটি দুর্ভাগ্যজনক। সামনে আমাদের উৎপাদনক্ষমতা আরও বাড়বে। সারা দেশেই বিদ্যুতায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ফলে সঞ্চালন লাইনের ওপর চাপ বাড়বে। এ কারণে নতুন লাইন বাড়ানোর পাশাপাশি পুরনো লাইনগুলো নিয়মিত বিরতিতে মেইনটেন্যান্স করতেও হবে। সেটি নিয়মিত হচ্ছে কি না, তাও মনিটরিং করতে হবে।
বছর বছর এ ধরনের দুর্ঘটনা কেন ঘটে জানতে চাইলে কুমিল্লা গ্রিডের নির্বাহী প্রকৌশলী তার অভিজ্ঞতার বর্ণনা করে সময়ের আলোকে জানান, ট্রান্সফরমারের ভেতরে তেল থাকে। কোনো কারণে ওই তেলে আগুন লেগে গেলে তা ভয়াবহ হয়ে যায়। সিলেটের ট্রান্সফরমারগুলোর একটির থেকে আরেকটির দূরত্ব মাত্র ৭-৮ মিটার। ময়মনসিংহের ৩৩/১৩২ কেভি লাইনে কারেন্ট ট্রান্সফরমার (সিটি) ছিল। সাধারণত শর্টসার্কিট থেকেই এসব আগুন লাগে। তবে নিম্নমানের ইকুইপমেন্টও দায়ী হতে পারে। যেহেতু এই ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছে। তাই তাদের রিপোর্টের পরিপ্রেক্ষিতেই আগুনের সঠিক কারণ বলা যাবে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে পিজিসিবির টেকনিশিয়ানরা জানান, যেসব পাওয়ার গ্রিড উপকেন্দ্রে জাপান, কোরিয়া, পোল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশ থেকে এনে পাওয়ার ট্রান্সফরমারসহ অন্য ইকুইপমেন্ট স্থাপন করা হয়েছে, সেসব উপকেন্দ্রে খুব কমই দুর্ঘটনা ঘটছে। আর যেসব উপকেন্দ্রে দেশীয় ইকুইপমেন্ট সরবরাহ করা হয়েছে, সেখানেই একের পর এক শর্টসার্কিট এবং বজ্রপাতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে।
তবে ময়মনসিংহ গ্রিডের আগুনের পরপরই সারা দেশের সিটিগুলো নিয়মিত পরীক্ষা করা, সেই পরীক্ষা ঠিকমতো হচ্ছে কি না, তা মনিটরিং করা এবং পুরনো সিটি চেঞ্জ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন পিজিসিবির ব্যবস্থাপনা পরিচালক গোলাম কিবরিয়া। তিনি বলেন, সাধারণত প্রতিবছর শীতকালে আমরা লাইনগুলো মেইনটেন্যান্স করি। নিয়ম হচ্ছে বছরে অন্তত একবার টেস্ট করা। এখন আমরা একাধিকবার টেস্ট করার উদ্যোগ নিচ্ছি, যাতে এ ধরনের দুর্ঘটনা আর না ঘটতে পারে।
প্রসঙ্গত, গত ৮ সেপ্টেম্বর দুপুর ১টার দিকে ময়মনসিংহ মহানগরীর কেওয়াটখালীতে আগুনে পাওয়ার গ্রিডের ট্রান্সফরমার পুড়ে যায়। এতে ময়মনসিংহ বিভাগের চার জেলা বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার আগেই আবার ১০ সেপ্টেম্বর সকাল ৯টার দিকে আরেক দফা আগুন লেগে যায়। এতে প্রায় তিন দিন ময়মনসিংহবাসী চরম ভোগান্তিতে পড়ে। এর আগে গত ২০ মে ভেড়ামারা পিজিসিবির সাবস্টেশনে অগ্নিকাণ্ড ঘটে। যদিও ঘূর্ণিঝড় ‘আম্ফানের’ আঘাতে বিপর্যয় ঘটে বলে জানায় পিজিসিবি। সে সময় প্রায় দুই থেকে তিন দিন বহু এলাকায় বিদ্যুৎ ছিল না। এর আগে গত ১১ এপ্রিল বিকালে হঠাৎই রাজধানীর রামপুরার উলন গ্রিডে বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ড ঘটে। এতে রাজধানীর একাংশ কয়েক ঘণ্টা বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকে। এই সাবস্টেশনটি পিজিসিবির হলেও এটি ডিপিডিসির কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। তবে সাবস্টেশনটি এখনও পরিচালনা করে পিজিসিবি। ডিপিডিসির কর্মকর্তাদের এখন প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। ২০১৯ সালে ঘটে একটি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা। ওই বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি কেরানীগঞ্জে বিদ্যুতের নির্মাণাধীন গ্রিড সাবস্টেশনে আগুন লাগে। ২০১৮ সালে ঘটে একটি গ্রিডে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা। একই বছরের ৩০ মে রাজধানীর পরিবাগে ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির লোকাল গ্রিড সাবস্টেশনে আগুন লাগে। ঘণ্টাখানেকের চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও একটি ট্রান্সফরমার পুড়ে যায়।

About the author

CrimeSearchBD

%d bloggers like this: