আন্তর্জাতিক বিনোদন

বিদায় সৌমিত্র : বাঙালির মনে বেঁচে থাকবেন চিরকাল

Written by CrimeSearchBD

জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করেছেন। অবশেষে মৃত্যুর কাছে হেরে গেলেন উপমহাদেশের কিংবদন্তি অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। রোববার দুপুর ১২টা ১৫ মিনিটে কলকাতার বেলভিউ হাসপাতালে মারা যান তিনি। টানা ৪০ দিন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন ৮৫ বছর বয়সি এই অভিনেতা। তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বাংলা চলচ্চিত্রে একটা যুগের অবসান ঘটল।
এদিন হাসপাতাল থেকে তার মরদেহ গল্ফগ্রিনের বাসায় নেওয়া হয়। এরপর টেকনিশিয়ান স্টুডিও হয়ে সর্ব সাধারণের শ্রদ্ধার জন্য রবীন্দ্রসদনে নেওয়া হয়।
সন্ধ্যায় কেওড়াতলা শ্মশান ঘাটে গান স্যালুটের মধ্য দিয়ে তার শেষকৃত্য অনুষ্ঠিত হয়। তার মৃত্যুতে বাংলাদেশ ও ভারতের শোবিজ অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। সৌমিত্রের মৃৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জিসহ আরও অনেকে। গত ৫ অক্টোবর অভিনেতার কোভিড-১৯ রিপোর্ট পজিটিভ আসে। পরের দিন হাসপাতালে ভর্তি হন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। দুই সপ্তাহে করোনা মুক্ত হলেও, কোভিড পরবর্তী শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন সৌমিত্র। দীর্ঘ ছয় দশকের তার চলচ্চিত্র জীবন। কাজপাগল সৌমিত্র। করোনার মধ্যে লাইট-ক্যামেরা-অ্যাকশন থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখেননি। লডকাউন পরবর্তী সময়ে শেষ করেছেন নিজের বায়োপিক ‘অভিযান’-এর শুটিং। ১৯৩৫ সালে কৃষ্ণনগরে জন্ম সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। বাবা মোহিত কুমার চট্টোপাধ্যায় কলকাতা হাইকোর্টের উকিল ছিলেন। তবে নাটকের চর্চা নিয়মিত ছিল পরিবারে, বাবা নাটকের দলে অভিনয় করতেন। কলকাতার সিটি কলেজ থেকে প্রথমে আইএসসি এবং পরে বিএ অনার্স (বাংলা) পাস করার পর পোস্ট গ্র্যাজুয়েট কলেজ অব আর্টসে দুই বছর পড়াশোনা করেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। তার কর্মজীবন অবশ্য আকাশবাণীতে শুরু হয় ঘোষক হিসেবে। পরে বাচিক শিল্পী হিসেবেও তিনি পরিচিতি পান। তার কণ্ঠে রবীন্দ্রকবিতা বা জীবনানন্দ আচ্ছন্ন করে বাঙালিকে। কবিতা আবৃত্তি শুধু নয়, নিজে কবিতা রচনা করেছেন। করেছেন পত্রিকা সম্পাদনারও কাজ।
১৯৫৯ সালে সত্যজিৎ রায়ের ‘অপুর সংসার’ ছবি দিয়ে রুপালি পর্দায় যাত্রা শুরু হয় সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের। সত্যজিৎ পরিচালিত ৩৪টি ছবির ১৪টি ছবিতে অভিনয় করেছেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। তার অভিনীত চরিত্রগুলোর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় ‘ফেলুদা’। তিনি সত্যজিৎ রায়ের পরিচালনায় ‘সোনার কেল্লা’ এবং ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’ সিনেমায় ফেলুদার ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন। উত্তম সমসাময়িক যুগেও বাঙালির মনের মণিকোঠায় জায়গা করে নিয়েছিলেন সৌমিত্র।
তবে শুধু সত্যজিৎ রায় নন, তপন সিনহা, মৃণাল সেন, তরুণ মজুমদার থেকে শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়-নন্দিতা রায়, সৃজিত মুখোপাধ্যায়, অতনু ঘোষ, সুমন ঘোষের মতো আজকের প্রজন্মের পরিচালকদের ছবিতে অভিনয় করেছেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। ৬১ বছর দীর্ঘ ফিল্মি ক্যারিয়ারে প্রায় ২৫০টি ছবিতে অভিনয় করেছেন সৌমিত্র।
শুধু সিনেমা নয়, অসংখ্য নাটক, যাত্রা এবং টিভি ধারাবাহিকে অভিনয় করেছেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। আবৃত্তিশিল্পী হিসেবেও তার নাম উচ্চারিত হয়। তিনি কবি ও অনুবাদকও। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ২০০৪ সালে ‘পদ্মভূষণ’ ও ২০১২ সালে ‘দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার’ লাভ করেন। এ ছাড়া ২০১৭ সালে তিনি ফ্রান্স সরকার কর্তৃক ‘লিজিওন অব অনার’ লাভ করেন। একই বছর পশ্চিমবঙ্গ সরকার কর্তৃক ‘বঙ্গবিভূষণ’ পুরস্কার অর্জন করেন।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও নরেন্দ্র মোদির শোক
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক শোকবার্তায় বলেছেন, এই প্রতিভাবান অভিনেতার মৃত্যুতে অভিনয় জগতে এক বিশাল শূন্যতার সৃষ্টি হলো। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় তার সৃষ্টিশীল কাজের মাধ্যমে মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকবেন।
প্রধানমন্ত্রী সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করেন এবং তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।
কিংবদন্তি এই অভিনেতার মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ এমপি। তিনি বলেছেন, অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় তার অনন্য প্রতিভাময় কাজের মাধ্যমে মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকবেন। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় অভিনয় জগতে দক্ষতা, প্রাজ্ঞতা ও বিনয়ের যে অধ্যায় তৈরি করে গেছেন, তা অভিনয় জগতের প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
সৌমিত্রের মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কেএম খালিদ এমপি। প্রতিমন্ত্রী গতকাল এক শোকবার্তায় প্রয়াতের বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করেন এবং তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করেন।
সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী বলেন, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। তিনি ছিলেন একাধারে অভিনয় শিল্পী, কবি, আবৃত্তিকার ও অনুবাদক। তার মৃত্যুতে বাংলা অভিনয় জগতে এক বিশাল শূন্যতার সৃষ্টি হলো। তিনি তার সৃষ্টিশীল কর্মের মধ্য দিয়ে অভিনয়প্রেমী দর্শকদের হৃদয়ে চিরকাল বেঁচে থাকবেন।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি টুইট করে এক শোকবার্তায় লিখেছেন, ‘শ্রী সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের প্রয়াণ চলচ্চিত্র জগত, পশ্চিমবঙ্গসহ ভারতের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে এক অপূরণীয় ক্ষতি। তার কাজের মধ্যে বাঙালির চেতনা, ভাবাবেগ ও নৈতিকতার প্রতিফলন পাওয়া যায়। তার প্রয়াণে আমি শোকাহত। শ্রী চট্টোপাধ্যায়ের পরিবার ও অনুরাগীদের সমবেদনা জানাই।
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় টুইটারে লেখেন, ‘ফেলুদা আর নেই। অপু আমাদের বিদায় জানিয়েছেন। বিদায় সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। উনি একজন কিংবদন্তি। বাংলা, ভারতীয় এবং আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র একজন মহান অভিনেতাকে হারাল। তাকে খুব মিস করব আমরা। বাংলা চলচ্চিত্র জগৎ অভিভাবকহীন হয়ে গেল।’
চিত্রনায়ক শাকিব খান সৌমিত্রের চলে যাওয়ার খবরে ফেসবুকে লিখেছেন, ‘যেখানে থাকেন, যেভাবেই থাকেন, আপনি আমাদের হৃদয়েই থাকবেন। বিদায় হে বরেণ্য!’ চিত্রনায়ক আরিফিন শুভ সৌমিত্রকে বিদায় জানিয়েছেন এভাবে, ‘ভালো থাকবেন পুরনো বন্ধুদের সাথে, বেলা শেষে দেখা হবে…।’
দুই বাংলার জনপ্রিয় অভিনেত্রী জয়া আহসান ফেসবুকে লিখেছেন, ‘পর্দায় তিনি যখন অভিনয়ের গরিমা ঝেড়ে ফেলে চরিত্রের আচরণ ফুটিয়ে তুলেছিলেন, ভারতবর্ষের শিল্পভুবনে সেটা শুধু বিস্ময়কর একটা ঘটনাই ছিল না, ছিল এক নতুন যুগের শুরু। বিশ^-চলচ্চিত্রের অভিনয়ের প্রথম সারিতেই তার স্থান। কিন্তু অমন যে ইতিহাসের স্রষ্টা, অমন যে শিখরে ওঠা শিল্পী, মানুষ হিসেবে তিনি ছিলেন এক মহাসাগর। যে মহাসাগর অতলান্ত, কিন্তু শান্ত। তার মৃত্যু নেই!’
অভিনেত্রী রাফিয়াথ রশিদ মিথিলা লিখেছেন, ‘শান্তিতে বিশ্রাম নিন এই সময়ের সবচেয়ে গৌরবময় মানুষ।’ অভিনেতা জিয়াউল ফারুক অপূর্ব লিখেছেন, ‘একটি যুগের সমাপ্তি। তার আত্মা চিরন্তন শান্তিতে বিশ্রাম নিক, সৌমিত্র চ্যাটার্জি।’

About the author

CrimeSearchBD

%d bloggers like this: