সারাদেশ

বস্তিতে আগুনের রহস্য ছাইচাপা

Written by CrimeSearchBD

বস্তিতে বারবার আগুন লাগে। আবার নিভেও যায়। এ আগুনে জানমাল হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে যায় গরিব-দুঃখীরা। বস্তিতেও দীর্ঘদিন রয়ে যায় পোড়া ক্ষতচিহ্ন। এমনই ঘটনা ঘটল গত সোমবার রাতে রাজধানীর মহাখালীর সাততলা বস্তিতেও। ২০১৬ সালের পর আবারও সাততলা বস্তিতেই ঘটেছে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড। এর কয়েক ঘণ্টার মাথায় মঙ্গলবার বিকালে মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্প (বিহারি পল্লী) এলাকার একটি বস্তিতেও ভয়ানক অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে। এভাবেই ঘুরেফিরে বস্তিতেই ঘটছে ‘রহস্যময়’ অগ্নিকাণ্ড। বারবার এভাবে বস্তিতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটলেও প্রকৃত কারণ বা রহস্য সবসময়ই থেকে যায় অজানা। ঘুরেফিরে কেন বস্তিতেই আগুন লাগে? এমন প্রশ্নেরও যৌক্তিক জবাব মিলছে না। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ থেকে সব অগ্নিকাণ্ডেরই তদন্ত করা হয়। কিন্তু সেগুলো জনসম্মুখে প্রকাশ করাও হয় না।
এ কারণে বস্তিতে আগুনের রহস্য পড়ে যাচ্ছে ছাইচাপার অন্তরালে। অধিকাংশ ঘটনা বিশ্লেষণ করে ও ক্ষতিগ্রস্তদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বস্তিগুলোকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই শক্তিশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার চাঁদাবাজি ও নানা ধরনের বাণিজ্য চলে আসছে।
স্থানীয় প্রভাবশালী ও গ্যাস-বিদ্যুৎ-ওয়াসাসহ সেবা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও এ সিন্ডিকেটে জড়িত। এসব বস্তি ঘিরে মাদকেরও বাজার গড়ে ওঠে। যেহেতু বস্তিগুলোর অধিকাংশই সরকারি খাসজমির ওপর তাই স্থানীয় প্রভাবশালীদের সেই জমি দখলেরও টার্গেট থাকে। সে কারণে ভূমি দখল, আধিপত্য বিস্তার, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ও নাশকতা সৃষ্টিসহ নানা রাজনৈতিক অপকৌশল বাস্তবায়নের জন্য বস্তি দখল করতে পরিকল্পিতভাবে আগুন লাগানো হয়ে থাকে বলে অভিযোগ রয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত বস্তিবাসীরাও প্রায়ই বলে থাকে, কৌশলে উচ্ছেদ কিংবা আধিপত্যের জেরে কোনো পক্ষ আগুন ধরিয়ে দিয়েছে।
তবে অগ্নিকাণ্ড নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অগ্নিকাণ্ডের পর প্রায় সব ধরনের আলামতই আগুনেই নষ্ট হয়ে যায়। এ ক্ষেত্রে ফায়ার ফরেনসিক ল্যাব থাকলেই কেবল অগ্নিকাণ্ডের সঠিক কারণ জানা সম্ভব। কিন্তু দেশে এখনও ফায়ার ফরেনসিক ল্যাব প্রতিষ্ঠা করা হয়নি। তাই বিভিন্ন বক্তব্য, পূর্ব অভিজ্ঞতা ও ধারণা থেকে অগ্নিকাণ্ডের কারণ নির্ধারণ করা হয়ে থাকে।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের তথ্য মতেÑ গত বছর রাজধানীসহ সারা দেশে প্রায় ৩২টি বস্তিতে অগ্নিকাণ্ড ঘটে। এর মধ্যে কোনো কোনো বস্তিতে একাধিকবার আগুনের ঘটনা ঘটে। এসব অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় নারী-শিশুসহ প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ২০ জন। চলতি বছরের এই কয়েক মাসেও বেশকিছু বস্তিতে বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ড ঘটে।
সূত্র জানায়, গত ১০ বছরে বনানীর এক কড়াইল বস্তি আগুনে পুড়েছে অন্তত ১৭ বার। যদিও আগুনের কারণ নিয়ে ফায়ার সার্ভিস, সিটি করপোরেশন ও বস্তিবাসীদের রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন মত।
এ প্রসঙ্গে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. সাজ্জাদ হোসাইন সময়ের আলোকে জানান, প্রধানত তিনটি কারণে বস্তিতে অগ্নিকাণ্ড বেশি ঘটে থাকে। সেগুলো হচ্ছেÑ অবৈধ অপরিকল্পিত বৈদ্যুতিক লাইন, গ্যাসলাইন এবং অসচেতনতা। এর বাইরেও বস্তির ভেতরে যত্রতত্র চুলা স্থাপন এবং কাঠখড়ি দিয়ে রান্নার কারণেই অগ্নিকাণ্ড ঘটে থাকে। মূলত গ্যাস ও বিদ্যুতের লাইনগুলো ‘লুজ কানেকশনের’ বা টেনে নেওয়া হয়ে থাকে। গ্যাসের সাধারণ পাইপগুলো মাটির ওপরে ছড়ানো-ছিটানো থাকে। সেগুলো নানা কারণে অনেক সময় লিকেজ হয়। এমন অবস্থায় রান্নার চুলা বা সিগারেট-দিয়াশলাই থেকে ওই লিকেজে অগ্নিসংযোগ ঘটলে বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ড ঘটে যায়।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাজ্জাদ হোসাইন বলেন, বস্তির অধিকাংশ অগ্নিকাণ্ডের পর ক্ষতিগ্রস্তরা একটি কথাই সবসময় বলে থাকেন, তা হলোÑ আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এই অভিযোগ সুস্পষ্ট প্রমাণ করার মতো প্রযুক্তিগত কোনো সুযোগ-সুবিধা আমাদের দেশে নেই। সাধারণত আগুনেই সবচেয়ে বেশি আলামত নষ্ট হয়ে যায়। এ ক্ষেত্রে ফায়ার ফরেনসিক ল্যাব থাকলে কিছুটা হলেও সুফল পাওয়া সম্ভব হবে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সাবেক যুগ্ম সম্পাদক নগর পরিকল্পনাবিদ মো. মাজহারুল ইসলাম সময়ের আলোকে বলেন, বস্তিতে অপরিকল্পিত ও অব্যবস্থাপনাগত জীবনযাপন প্রক্রিয়ার কারণেই মূলত বেশিরভাগ অগ্নিকাণ্ড ঘটে। কেননা এখানে গ্যাসের পাইপ ও বিদ্যুতের লাইন সাধারণত ঝুলন্ত বা মাটিতে ফেলে রেখে অপরিকল্পিতভাবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। তাতে করে লিকেজ ও শর্টসার্কিটও হয় বেশি। সেখান থেকেই মূলত বেশিরভাগ অগ্নিকাণ্ড ঘটে থাকে। নগর পরিকল্পনাবিদ মাজহারুল ইসলাম আরও বলেন, পৃথিবীর অনেক উন্নত দেশে বস্তিবাসীদের জন্যও নির্দিষ্ট এলাকায় পরিকল্পিত বাসস্থানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। আমাদের দেশেও অনেক সময় এসব বলা হয়, কিন্তু কার্যত বস্তিবাসীদের জন্য সেভাবে উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
বস্তি মূলত সরকারি খাস জমিতেই বেশি গড়ে ওঠে। সরকার চাইলেই বস্তিবাসীর জন্য সেই খাস জমিতেই পরিকল্পিত বাসস্থানের ব্যবস্থা করে দিতে পারে। এটা করা গেলেই ভয়াবহ এসব অগ্নিকাণ্ড এড়ানো সম্ভব।
সোমবার রাতে মহাখালীর সাততলা বস্তিতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে দেড় শতাধিক ঘর ও দোকান পুড়ে যায়। এর কয়েক ঘণ্টা পর মঙ্গলবার বিকালে মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পের (বিহারি পল্লী) জহুরি মহল্লার বস্তিতে ভয়ানক আগুনে শতাধিক ঘর পুড়ে গেছে। এ ছাড়া চলতি বছরের ১১ মার্চ রাজধানীর মিরপুরের রূপনগরের ‌‘ট’ ব্লকের একটি বস্তিতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে শত শত ঘর পুড়ে যায়। আগুন নেভাতে সেখানে যেতে হয় ফায়ার সার্ভিসের ২৫টি ইউনিটকে। এর আগে ২০১৯ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি গভীর রাতে ভাসানটেকের আবুলের বস্তি ও জাহাঙ্গীরের বস্তির প্রায় ১ হাজার ঘর পুড়ে ছাই হয়ে যায়। এই মর্মান্তিক অগ্নিকাণ্ডে বস্তির বাসিন্দা নূরে আলমের তিন মাস বয়সি শিশুকন্যা ইয়াসমিন ও চুন্নু মিয়ার আড়াই বছরের ছেলে তন্ময় মারা যায়। এরপর ২০১৯ সালের ১৭ আগস্ট রাজধানীর মিরপুর-৭ এলাকার আলোচিত চলন্তিকা বস্তিতে অগ্নিকাণ্ডে শত শত ঘর পুড়ে যায়। এতে ওই সময় খোলা আকাশের নিচে ঠাঁই নিতে হয়েছিল ক্ষতিগ্রস্ত অর্ধ লক্ষাধিক মানুষকে।
ফায়ার সার্ভিসসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, রাজধানীসহ সারা দেশে কী পরিমাণ বস্তি বা এসব বস্তিতে কী পরিমাণ মানুষ বাস করে তার সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই। সর্বশেষ ২০১৪-১৫ সালে সরকারিভাবে বস্তিশুমারি করেছিল পরিসংখ্যান ব্যুরো। ওই বস্তিশুমারি অনুযায়ী ঢাকা শহরের দুই সিটি করপোরেশনে মোট বস্তি রয়েছে ৩ হাজার ৩৯৪টি। এ ছাড়া সে সময়ে সারা দেশে বস্তিবাসীর সংখ্যা ছিল প্রায় সাড়ে ২২ লাখ।

About the author

CrimeSearchBD

%d bloggers like this: