সারাদেশ

প্রত্যেক বাহিনীকেই বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার উপযুক্ত করা হচ্ছে

Written by CrimeSearchBD

বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) এয়ার উইংয়ের জন্য কেনা দুটি অত্যাধুনিক হেলিকপ্টার উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ সময় তিনি জলে, স্থলে ও আকাশসীমার নিরাপত্তায় হেলিকপ্টার সংযোজনের মাধ্যমে বিজিবিকে ত্রিমাত্রিক বাহিনী হিসেবেও ঘোষণা করেন। আনুষ্ঠানিক বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার পাশাপাশি অর্পিত দায়িত্ব পালনে এখন থেকে বিজিবি সদস্যরা জলে, স্থলে ও আকাশপথে বিচরণ করবেন। এ রকম আমাদের প্রত্যেকটি বাহিনীকেই বিশে^র সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার উপযুক্ত করে গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে। রোববার সকালে গণভবন থেকে ভিডিও টেলিকনফারেন্সের মাধ্যমে বিজিবির এয়ার উইংয়ের জন্য রাশিয়া থেকে কেনা দুটি অত্যাধুনিক এমআই-১৭১-ই হেলিকপ্টারের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। হেলিকপ্টার দুটির নামকরণ করা হয়েছেÑ ‘বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ’ এবং ‘বীরশ্রেষ্ঠ আব্দুর রউফ’। রাজধানীর পিলখানায় বিজিবি সদর দফতরের বীরউত্তম আনোয়ার হোসেন প্যারেড গ্রাউন্ডে এই হেলিকপ্টার উদ্বোধন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিজিবির উন্নয়নে সরকারের পক্ষে যা যা করণীয় তা করা হবে। ১৯৭৪ সালে স্থলসীমানা চুক্তি করে যান জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আইনও তিনি পাস করে যান; কিন্তু ভারত তখনও করেনি। পঁচাত্তরের পর জিয়াউর রহমান, এরশাদ বা খালেদা জিয়া যারাই ক্ষমতায় এসেছেন তারা কখনই আমাদের এই সীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়ন অথবা সীমান্ত নির্দিষ্ট করতে কখনও উদ্যোগ গ্রহণ করেননি। আমি প্রথমবার যখন ক্ষমতায় আসি তখন থেকে সীমান্ত সংরক্ষণের উদ্যোগ গ্রহণ করি এবং ভারতের পার্লামেন্টে সব দল মিলে তা পাস করে দিয়েছে। এখন আমাদের সীমান্ত সুনির্দিষ্টভাবে নির্দেশ করা হয়েছে। আমাদের সীমান্তগুলো সুরক্ষার জন্য এখন আমরা যথাযথ ব্যবস্থা নিচ্ছি। পিলখানায় আয়োজিত অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সিনিয়র সচিব মোস্তফা কামাল উদ্দীন। এতে স্বাগত বক্তব্য রাখেন বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মো. সাফিনুল ইসলাম। পিলখানায় আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্যারেড কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করেন বিজিবির বর্ডার সিকিউরিটি ব্যুরোর প্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এএমএম খায়রুল কবির। এই অনুষ্ঠানে বিজিবির কর্মকাণ্ড সম্পর্কে একটি প্রামাণ্য ভিডিওচিত্র প্রদর্শিত হয়েছে। অনুষ্ঠানে বিজিবির একটি সুসজ্জিত চৌকস দল প্রধানমন্ত্রীকে রাষ্ট্রীয় সালাম জানায়।
প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে বলেন, ‘দুটি হেলিকপ্টার উদ্বোধনের মাধ্যমে আমি বিজিবিকে একটি ‘ত্রিমাত্রিক বাহিনী’ হিসেবে ঘোষণা করছি। হেলিকপ্টার সংযোজন কেবল শুরু মাত্র, এই যাত্রা বিজিবির সার্বিক কর্মকাণ্ডকে আরও গতিশীল করবে বলে আমি বিশ^াস করি। বিজিবি এখন অন্যান্য বাহিনীর মতো ত্রিমাত্রিক বাহিনীতে উন্নীত হয়েছে। আমরা আধুনিক হেলিকপ্টার ক্রয় করেছি। প্রকৃতপক্ষে হেলিকপ্টার ক্রয়ের উদ্যোগ আমি নিজেই নিয়ে বলেছিলাম। কারণ এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে দুর্গম পার্বত্য এলাকার নিরাপত্তা দেওয়া একান্তভাবে দরকার। সে কারণেই এই হেলিকপ্টার ক্রয় করে দিয়েছি। প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, সবচেয়ে বড় কথা আমরা মুজিব বর্ষ উদযাপন করছি, এই মুজিব বর্ষেই বিজিবি হেলিকপ্টার পেল, এটা অত্যন্ত গৌরবের এবং আনন্দের বলে আমি মনে করি। এ সময় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণের উদ্ধৃতি দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতির পিতা ১৯৭৪ সালের ৫ ডিসেম্বর পিলখানায় তৎকালীন বাংলাদেশ রাইফেলসের তৃতীয় ব্যাচের প্রশিক্ষণ সমাপনী কুচকাওয়াজে বলেছিলেন, ‘ঈমানের সাথে থাকো, ঈমানের সাথে কাজ করো, দেশের জন্য কাজ করো।’ প্রধানমন্ত্রী বলেন, এটা শুধু বিজিবি নয়, বাংলাদেশের সবার জন্যই প্রযোজ্য।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ আজ অত্যন্ত দক্ষ, সুসংগঠিত ও গতিশীল একটি বাহিনী। তারপরও সীমান্তের সার্বিক সুরক্ষা ও সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ন রাখতে বিজিবির জন্য আধুনিক, যুগোপযোগী ও কার্যকর ট্যাঙ্কবিধ্বংসী মিসাইল কেনা হচ্ছে। ভারত এবং মিয়ানমারের সঙ্গে ৫৩৯ কিলোমিটার অরক্ষিত সীমান্ত এলাকায় নতুন ৬২টি বিওপি নির্মাণের মাধ্যমে ৪০১ দশমিক ৫ কিলোমিটার সীমান্ত ইতোমধ্যে নজরদারিতে আনা হয়েছে। অবশিষ্ট ১৩৭ দশমিক ৫ কিলোমিটার অরক্ষিত সীমান্ত এলাকায় আরও বিওপি স্থাপন করা হবে। তিনি বলেন, গত ২২ সেপ্টেম্বর একনেকের সভায় আরও ৭৩টি নতুন কম্পোজিট বিওপি নির্মাণের বিষয়ে অনুমোদন প্রদান করা হয়েছে। এতে বিজিবির অপারেশনাল সক্ষমতা বহুগুণে বৃদ্ধিসহ সৈনিকদের মনোবলের ওপর ইতিবাচক প্রভাব বিস্তার করবে। তিনি বলেন, চোরাচালান প্রতিরোধে টহল কার্যক্রমে গতিশীলতা আনয়নের লক্ষ্যে ইতোমধ্যে বিজিবির জন্য ১২০টি অল ট্যারেইন ভেহিক্যাল (এটিভি) ক্রয় করা হয়েছে। এ ছাড়া সীমান্তের সার্বিক সুরক্ষা ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা রক্ষায় বিজিবির সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য ১২টি আর্মড পার্সোনেল ক্যারিয়ার (এপিসি) এবং ১০টি রায়ট কন্ট্রোল ভেহিক্যাল কেনা হয়েছে। বিজিবির বহরে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ১২টি হাইস্পিড বোট এবং দুটি পন্টুন সংযুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি বিজিবির জন্য অত্যাধুনিক দুটি ফাস্ট ক্রাফট, সমুদ্রগামী ৭টি অত্যাধুনিক হাইস্পিড বোট, দুটি মেরিনা এবং দুটি ট্রেইলার ক্রয় প্রক্রিয়াধীন। বিজিবিকে একটি আধুনিক ও যুগোপযোগী সীমান্তরক্ষী বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে আওয়ামী লীগ সরকার ব্যাপক সংস্কার ও উন্নয়নমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এ লক্ষ্যে আমরা বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ আইন-২০১০ পাস করেছি। একটি বিশ^মানের আধুনিক সীমান্তরক্ষী বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলার জন্য ‘বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ ভিশন-২০৪১’ পরিকল্পনাও গ্রহণ করা হয়েছে। গত প্রায় ১২ বছরে বিজিবির নতুন সাংগঠনিক কাঠামো অনুযায়ী পাঁচটি রিজিয়ন সদর দফতর স্থাপন করে কমান্ড স্তর বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে এ বাহিনীকে আরও গতিশীল ও ফলপ্রসূ করা হয়েছে। বিজিবির গোয়েন্দা শাখাকে শক্তিশালী করে বর্ডার সিকিউরিটি ব্যুরো স্থাপন করা হয়েছে। নতুন চারটি সেক্টর ও পাঁচটি রিজিয়নাল ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো ও ১৫টি ব্যাটালিয়ন স্থাপন করা হয়েছে। এ ছাড়াও নতুন ১৪০টি বিওপি, ৩৪টি বিএসপি এবং একটি এয়ার উইং সৃজন করার মাধ্যমে প্রথম পর্যায়ের পুনর্গঠনের কাজ সম্পন্ন হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার ২০০৯ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে বিজিবির জনবলও বৃদ্ধি করে এ পর্যন্ত ৩০ হাজার ১৪৬ জন নিয়োগ করেছে। এ বাহিনীতে আরও ১৫ হাজার জনবল বৃদ্ধির পরিকল্পনা করা হয়েছে, যা তিনটি ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। এর মধ্যে প্রথম ধাপে ৪ হাজার ২৮২ জন জনবলের সমন্বয়ে একটি রিজিয়ন সদর দফতর, একটি সেক্টর সদর দফতর এবং চারটি ব্যাটালিয়ন, একটি কে-নাইন ইউনিট, একটি রিজিয়ন ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো, একটি স্টেশন সদর দফতর, একটি গার্ড পুলিশ ব্যাটালিয়ন সৃজনের কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন, যা ২০২২ সালের মধ্যে সম্পন্ন হবে। যার মাধ্যমে এই বাহিনী আরও শক্তিশালী হবে। এ ছাড়া দ্বিতীয় ধাপে মোট ৫ হাজার ৭৮২ জন জনবলের সমন্বয়ে একটি সেক্টর, পাঁচটি ব্যাটালিয়ন, একটি রিজার্ভ ব্যাটালিয়ন, একটি কে-নাইন ইউনিট অ্যান্ড ট্রেনিং সেন্টার এবং পাঁচটি বর্ডার গার্ড হাসপাতালের জনবল বৃদ্ধির জন্য প্রস্তাব বিবেচনাধীন। ২০১৫ সালে বিজিবিতে প্রথম নারী সৈনিক নিয়োগের মাধ্যমে এ বাহিনীতে নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা হয়েছে। বর্তমানে এ বাহিনীতে নারী সদস্যের সংখ্যা ৮৪১ জন।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, বিজিবির কর্মকাণ্ডে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার ও আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। সীমান্তে চোরাচালান প্রতিরোধের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ ও স্পর্শকাতর সীমান্ত এলাকা নির্বাচন করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ৩২৮ কিলোমিটার সীমান্তে স্মার্ট ডিজিটাল সার্ভেইল্যান্স অ্যান্ড ট্যাকটিক্যাল রেসপন্স সিস্টেম স্থাপনের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে এবং পর্যায়ক্রমে তা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এ ছাড়াও ডিজিটাল মোবাইল রেডিও (ডিএমআর) নেটওয়ার্ক স্থাপনের মাধ্যমে বিজিবি সদর দফতর থেকে প্রত্যন্ত অঞ্চলে অবস্থিত বিওপি এবং বিওপি পরিচালিত টহলের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপনের ব্যবস্থা গড়ে তোলা হচ্ছে। এতে বিজিবির অপারেশনাল সক্ষমতা অনেকাংশে বৃদ্ধি পাবে এবং কেন্দ্র থেকেই যেকোনো সময় যেকোনো সিদ্ধান্ত দেওয়া এবং বাস্তবায়ন করা যাবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিজিবির দৈনন্দিন দাফতরিক ও প্রশাসনিক কাজকে সহজ করার লক্ষ্যে ‘সীমান্ত ডাটা সেন্টার’ স্থাপন করা হয়েছে। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ বিশেষ করে ভূমিকম্পের বিষয়টি বিবেচনায় এনে বিজিবি কর্তৃক যশোর অঞ্চলে ‘ডিজাস্টার রিকভারি’ (ডিআর) সাইট নির্মাণ করা হচ্ছে, যা বিজিবিসহ দেশের বিভিন্ন ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও অন্যরাও ব্যবহার করতে পারবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে সুন্দরবন সংলগ্ন জলসীমায় কার্যকর টহল পরিচালনার পাশাপাশি মিয়ানমার সীমান্তে এসব উন্নত নৌযান মোতায়েন করে নাফ নদী ও সাগর উপকূলে ইয়াবা পাচার ও রোহিঙ্গা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিজিবি অধিক কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে। বিজিবি সদস্যদের অপারেশনাল কর্মকাণ্ডে ২০০৯ সালের অক্টোবর থেকে ২০২০ পর্যন্ত ৮ হাজার ৭৪৪ কোটি টাকা মূল্যের মাদক ও চোরাচালান দ্রব্য আটক করা সম্ভব হয়েছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী। বিডিআর বিদ্রোহ বা পিলখানা হত্যাযজ্ঞে নারকীয় সেই ঘটনার দিকে ইঙ্গিত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ ধরনের ঘটনা অনাকাক্সিক্ষত। এ ধরনের ঘটনা যেন আর ঘটতে না পারে সেজন্য সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। এ ধরনের ঘটনা আর ঘটুক তা আমি চাই না। কারণ এ ঘটনায় যারা জড়িত তারা নিজেদের, বাহিনীর ও দেশের ক্ষতিসাধন করেছে। বক্তব্যকালে ওই ঘটনায় নিহতদের রূহের মাগফিরাতও কামনা করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি তার ভাষণে শীতকালে পুনরায় কোভিড-১৯-এর প্রাদুর্ভাব বেড়ে যাওয়া নিয়ে আশঙ্কা ব্যক্ত করে সবাইকে সতর্ক থাকার এবং বাইরে বের হলে মাস্ক ব্যবহারের আহ্বানও পুনর্ব্যক্ত করেন।

About the author

CrimeSearchBD

%d bloggers like this: