সারাদেশ

প্রতারক নাসিমের টার্গেট ছিলেন প্রবাসীরা

Written by CrimeSearchBD

ইমাম হোসেন নাসিম ছিলেন বড্ড ধুরন্ধর। দেশীয় লোকজনের পাশাপাশি প্রবাসীদের টার্গেট করত। নানা সুযোগ-সুবিধা ও বিভিন্ন অফারের কথা বলে প্রলুব্ধ করত প্রবাসীদের। এভাবে সে প্লট বিক্রির টাকা আদায় করত। স্বল্পমূল্যে রাজধানীতে জমি পাবেন এই চিন্তায় প্রবাসীরা সারা জীবনের সঞ্চয় দিয়ে দ্রুত বায়নাও করতেন। এরপর শুরু হতো প্রতি মাসে কিস্তি। এসব কিস্তির টাকা নাসিম তার অফিসে সরাসরি হাতেই নিত। কিন্তু সবশেষে প্রবাসীরা জানতে পারেন নাসিম একজন মস্ত বড় প্রতারক। প্লট দেওয়ার নামে যা বলা হয়েছিল তার সবটাই ভুয়া। সাভারের কাউন্দিয়ায় নদীর ওপারে সাইনবোর্ড দেখিয়ে যে প্লট বিক্রির কথা বলা হয়েছিল সেই জমিরও কোনো অস্তিত্ব নেই। পুরোটাই ছিল ধোঁকাবাজি। র‌্যাবের হাতে গ্রেফতারের পর নাসিমের ধোঁকাবাজির গল্প বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে। অন্যদিকে র‌্যাবের কাছে নাসিম দাবি করেছে, তার কিছু জমি ছিল। সেগুলো সে কিছু মানুষকে হস্তান্তর করেছে। তবে তার স্বপক্ষে সে কোনো ধরনের প্রমাণ দেখাতে পারেনি। গতকালও প্রতারিত ব্যক্তিরা ফোনে ও সরাসরি র‌্যাবের কার্যালয়ে যোগাযোগ শুরু করেছেন। এ পর্যন্ত প্রায় ৭শ প্রবাসী র‌্যাবের অফিসে ফোন করে তাদের প্রতারিত হওয়ার কথা জানিয়েছেন বলে জানা গেছে।
ইমাম হোসেন নাসিম ও তার স্ত্রী হালিমা আক্তার সালমা রূপনগর থানা পুলিশের হেফাজতে তিন দিনের রিমান্ডে রয়েছে। রিমান্ডে নাসিম ও তার স্ত্রী গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছে। তাদের সঙ্গে আর কারা কারা এই প্রতারণায় যুক্ত তা জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
প্রবাসীদের সঞ্চয় নাসিমের পকেটে : প্রবাসীরাই বেশি কথিত প্লট কিনেছেন নাসিমের কাছ থেকে। ২০০৭ সাল থেকেই নাসিম বিভিন্ন মাধ্যমে প্রবাসীদের টার্গেট করত। কয়েক বছর আগে এই নাসিম দুবাইয়ে রিহাবের একটি মেলায় স্টলও নিয়েছিল। সেখানে সে কয়েকশ কথিত প্লট বিক্রির চুক্তি করে। সেই দুবাই প্রবাসীরা কয়েক বছর ধরেই টাকা পরিশোধ করছিলেন। কিন্তু সম্প্রতি তাকে গ্রেফতারের পর তারা এখন চোখে শর্ষে ফুল দেখতে শুরু করেছেন। প্রবাসীদের অনেকে একই পরিবারের ৫ থেকে ৭ জন পর্যন্ত তার কাছে প্লট কেনার জন্য টাকা পরিশোধ করেছেন। কিন্তু প্লট পাননি। বছর বছর ঘুরেও টাকা আদায় করতে পারেননি।
অন্যদিকে র‌্যাবের একটি সূত্র জানিয়েছে, গতকাল র‌্যাব-৪-এর পক্ষ থেকে দেওয়া যোগাযোগের নাম্বারে প্রায় ছয়শত প্রবাসী ফোন করেছেন। এর মধ্যে দুবাই, কাতার, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, সৌদি আরব, মধ্যপ্রাচ্য, জর্ডান, স্পেন, থাইল্যান্ড, ইউরোপের বিভিন্ন দেশের প্রবাসীরা রয়েছে। তাদের বেশিরভাগই ফোনে কান্নাকাটি করে র‌্যাবের কাছে টাকা উদ্ধারের আকুতি জানিয়েছেন।
তারা জানিয়েছেন, নাসিম তাদের দ্রুত প্লট বুঝিয়ে দেবেন, বাড়ি তৈরি করলে নানা সুযোগ-সুবিধা দেবেন প্রলোভন দেখিয়ে তাদের সারা জীবনের সঞ্চয়ের টাকাগুলো হাতিয়ে নেয়। তারা তার প্রতারণার বিষয়টি ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারেননি। সম্প্রতি তার গ্রেফতারের সংবাদ দেখে তারা বিস্মিত হয়েছেন। তবে শিগগির প্রতারিত প্রবাসীদের অনেকেই দেশে ফিরে তার কাছে টাকা উদ্ধারের জন্য আইনি লড়াই চালিয়ে যাবেন বলেও জানিয়েছেন তারা।
অবৈধ অস্ত্র রাখত নাসিম : নাসিম প্রতারণা করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার পর আত্মগোপন করত। এরপরও কেউ তার সন্ধান পেলে তাকে বিভিন্নভাবে অস্ত্র দেখিয়ে ভয়ভীতি দেখাত। যার কারণে ভুক্তভোগীরা তার কাছে পরবর্তী সময়ে দাঁড়ানোর সাহসটুকুও পেতেন না।
বকুল কুমার দাস নামের এক ভুক্তভোগী বলেন, আমরা ছোটখাটো মানুষ। তিনি তো অস্ত্র নিয়ে সবসময় ঘুরতেন। এ কারণে আমরা তার কাছে পাওনা টাকাটুকুও চাইতে ভয় পেতাম। অন্য ভুক্তভোগী জানিয়েছেন, নাসিম তার কাছে একটি অস্ত্র সবসময় অফিসের টেবিলে রাখত। টাকা চাইতে গেলে যা দিয়ে তিনি গল্পের ছলে হুমকি দিত।
অন্যদিকে শাহআলী থানা পুলিশের একটি সূত্র জানিয়েছে, নাসিম মূলত যে অস্ত্রটি ব্যবহার করত তার কোনো কাগজপত্র ছিল না। তবে এর সত্যতাও মিলেছে রিমান্ডে নেওয়ার পর। পুলিশের কাছে রিমান্ডে থাকা নাসিম তার অস্ত্রটির পক্ষে সে কোনো ধরনের কাগজপত্র দেখাতে পারেননি। এমনকি অস্ত্রের লাইসেন্স করার জন্য আবেদন করে যে কাগজপত্র দিয়েছেÑতারও প্রমাণ দিতে পারেনি।
এসআই ওমর কাইয়ুম সময়ের আলোকে বলেন, নাসিমকে অস্ত্র মামলায় জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তার কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিলছে। তবে তথ্যগুলো যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। কারণ সে একেক সময় একেক ধরনের কথা বলছে।
নাসিমকে গ্রেফতারে পুলিশ ছিল নীরব : নাসিমের কাছে প্লট কিনতে গিয়ে প্রতারিতরা বিভিন্ন সময়ে শাহআলী থানায় তার নামে মামলা করেছেন। প্রতারিত অনেকে আদালতেও মামলা করেছেন। নাসিমের বিরুদ্ধে ৫২টি মামলার ওয়ারেন্ট ও সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থানার পরও তাকে পুলিশ গ্রেফতার করেনি বলে অভিযোগ রয়েছে। এমনকি মাস দুয়েক আগে ৩৬ জন ভুক্তভোগীর পক্ষে ৫ ব্যক্তি শাহআলী থানায় গিয়েছিলেন। এরপর তারা ওসি এবিএম আসাদুজ্জামান বরাবর তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন। কিন্তু মামলা না করলে পুলিশ তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারবে না বলে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়। ফলে তারা মিরপুর বিভাগের পুলিশের ডিসি, দুর্নীতি দমন কমিশন ও স্থানীয় কাউন্সিলরের কাছে একই অভিযোগ দিলেও কেউ কোনো ব্যবস্থা নেননি।
ভুক্তভোগী বিষ্ণু নামে একজন অভিযোগ করে বলেন, নাসিমের বিরুদ্ধে শাহআলী থানায় বিভিন্ন সময়ে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ দেওয়া হলেও তারা তা আমলে নেয়নি। এ থেকে কী প্রমাণিত হয় না, পুলিশ তার কাছে মাসোহারা পেতেন। এ বিষয়টি অস্বীকার করেছেন শাহআলী থানার ওসি।
ওসি এবিএম আসাদুজ্জামান সময়ের আলোকে বলেন, যারা এসেছিল তারা জিডি করতে এসেছিল, মামলা করতে তারা রাজি ছিল না। তারা তাদের খোয়া যাওয়া টাকা উদ্ধার করে দিতে বলেন। কিন্তু টাকা উদ্ধার করে দেওয়া তো আমাদের কাজ নয়। এ কারণে আমরা তাদের মামলা করতে বলেছি কিন্তু তারা তো মামলা করতে রাজি ছিলেন না।
র‌্যাব-৪-এর সিও অতিরিক্ত ডিআইজি মোজ্জাম্মেল হক সময়ের আলোকে বলেন, নাসিম বর্তমানে পুলিশের হেফাজতে রিমান্ডে রয়েছে। তার এই প্রতারণার সঙ্গে অফিসের কর্মীরাসহ আর কারা কারা জড়িত তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রয়োজনে তার পরিবারের সদস্যদেরও ডাকা হতে পারে।
তিনি জানান, এ পর্যন্ত প্রায় ৬শ প্রবাসী ফোনে অভিযোগ করেছেন। এ ছাড়াও সরাসরি শতাধিক ভুক্তভোগীর অভিযোগ জমা পড়েছে। আজ শত শত ভুক্তভোগী র‌্যাব-৪-এর কার্যালয়ে আসবেন বলেও অনেকে জানিয়েছে।

About the author

CrimeSearchBD

%d bloggers like this: