সারাদেশ

নাফ নদে ইয়াবার ২০ রুট

Written by CrimeSearchBD

কক্সবাজারের টেকনাফ সীমান্তের নাফ নদের অন্তত ২০টি পয়েন্ট দিয়ে ঢুকছে মরণনেশা ইয়াবার চোরাচালান। সীমান্ত ভাগ করা এই নদের অপর প্রান্তের মিয়ানমার সীমানা থেকে মাদকচক্র নৌকাযোগে বা সাঁতরে বাংলাদেশ সীমানার টেকনাফ প্রান্তে আনা হচ্ছে মরণনেশা ইয়াবা। দীর্ঘদিন ধরে এভাবেই নাফ নদ ব্যবহার করে ইয়াবার চালান প্রবেশের ঘটনা ঘটছে। যদিও পরিচিত পয়েন্ট বা রুটগুলো মাঝেমধ্যে পরিবর্তনও করছে মাদক কারবারিরা। ইয়াবা প্রবেশের ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষভাবেই সহযোগিতা করছে টেকনাফ ও উখিয়ায় আশ্রয় নেওয়া মিয়ানমারের বাস্তুচ্যুত এক শ্রেণির রোহিঙ্গা। এ কারণে যেন অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে ইয়াবা। সরেজমিন টেকনাফের স্থানীয় বাসিন্দা ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপকালে এসব তথ্য জানা গেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি, পুলিশ ও র‌্যাব থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর অভিযানে প্রায় সময় জব্দ হচ্ছে ইয়াবার বড় বড় চালান। তবে যা আটক হচ্ছে তার চেয়ে বহুগুণ বেশি ইয়াবা নানা কৌশলে ঢুকছে বাংলাদেশে। নাফ নদের কাছাকাছি এলাকাতেও মিয়ানমারের মাদকচক্র ইয়াবার কারখানা স্থাপন করেছে বলেও তথ্য রয়েছে। এসব নিয়ে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে মিয়ানমারকে পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য বলা হলেও কোনোই সুরাহা মেলেনি। গত শনিবার রাতে টেকনাফের হ্নীলা এলাকা থেকে ৩০ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। একই দিনে কক্সবাজারের টেকনাফ, ঢাকার মতিঝিল ও বাড্ডা থেকেও প্রায় ২৪ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধারসহ ৩ জনকে আটক করে ডিবি পুলিশ। তার আগের শুক্রবার রাতেও টেকনাফে নাফ নদ এলাকায় বিজিবির অভিযানে ২ লাখ ১০ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। এ সময় অভিযানকালে মাদক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বিজিবির গোলাগুলিতে ১ জন ইয়াবা কারবারি নিহত হয়। এভাবেই কঠোর অভিযান পরিচালনা হলেও থামানো যাচ্ছে না ইয়াবার কারবার।
স্থানীয়রা জানায়, কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভে চেকপোস্টে পুলিশের গুলিতে অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা নিহত হওয়ার পর এবং ওই ঘটনার সূত্র ধরে টেকনাফের সাবেক ওসি প্রদীপ কুমারসহ বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্য গ্রেফতার হলে মাদক কারাবারিদের মধ্যে নতুন কর্মকৌশল তৈরি হয়েছে। স্থানীয় পুলিশও সমালোচনা এড়াতে মাদকবিরোধী অভিযানের ক্ষেত্রে আগের চেয়ে কিছুটা ঝিমিয়ে গেছে। ফলে সেই দিক থেকেও কিছুটা সুযোগ নিচ্ছে পেশাদার মাদক ব্যবসায়ীরা।
এ প্রসঙ্গে কক্সবাজার জেলার এসপি মো. হাসানুজ্জামান সময়ের আলোকে জানান, টেকনাফসহ কক্সবাজার ঘিরে মাদকের বিরুদ্ধে নিয়মিতভাবে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। বিপুল পরিমাণ ইয়াবা উদ্ধার করাও হচ্ছে। তবে নিত্যনতুন কৌশলে মাদক ব্যবসায়ীরাও তৎপর রয়েছে। এ বিষয়ে পুলিশ ছাড়াও র‌্যাবম বিজিবিসহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থা গুরুত্বের সঙ্গে কাজ করছে। মাদকবিরোধী জিরো টলারেন্স নীতিতেই এ বিষয়ে সার্বক্ষণিক সজাগ দৃষ্টি রাখা হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছেÑ নাফ নদের টেকনাফ সীমানার অন্তত ২০টি পয়েন্ট দিয়ে ইয়াবার চালান আসছে বেশি। বিশেষ করে টেকনাফের নাফ নদের মুসনি ওমরখাল, সাপ্রাং সুইচগেট, হ্নীলার জালিয়ারপাড়া ও চৌধুরীপাড়া, রোঙ্গিখালীর আনোয়ারের প্রজেক্ট ও সৌরপ্যানেল এলাকা, জাদীমোরার আদমঘাট, দমদমিয়া, জালিয়ারদ্বীপ, নয়াপাড়া, উলসিপ্রাং, ঝিমনখালী, পালংখালী, মিনা বাজারসহ অন্তত ২০টি পয়েন্ট দিয়ে ইয়াবার চালান আনা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে প্রশিক্ষিত সাঁতারু রোহিঙ্গারা মাদকচক্রে মিশে বাংলাদেশ সীমানায় প্রবেশ করাচ্ছে ইয়াবার চালান।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বিস্তীর্ণ নাফ নদের ওইসব পয়েন্টের অনেক স্থানই সরু খালের মতো। ভাটার সময় সেসব পয়েন্টে হাঁটুপানি থাকে। এ কারণে অনেক সময় সাঁতরানোর প্রয়োজনও পড়ে না। কোনোমতে নদী পার হলেই পাহাড় বা ঘন জঙ্গলের মধ্যে সহজেই আত্মগোপন করতে পারে মাদকচক্র। সূত্রগুলো আরও জানায়, নাফ নদের বেশকিছু পয়েন্ট দিয়ে ইয়াবাগুলো টেকনাফে আনার পর বিভিন্ন রোহিঙ্গা ক্যাম্পে তা সংরক্ষণ করা হচ্ছে। রোহিঙ্গা নারীরা টেকনাফের স্থানীয় মাদক কারবারি নারীদের সঙ্গে সমন্বয় করে ইয়াবার চালান এক স্থান থেকে আরেক স্থানে পৌঁছে দিচ্ছে। এই নারীরা ছাড়াও ইয়াবা পাচার বা সরবরাহ প্রক্রিয়ায় অর্থের বিনিময়ে ব্যবহার হচ্ছে শিশু, নারী, স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী ও রিকশা-অটোরিকশার চালকরা।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের অতিরিক্ত পরিচালক (চট্টগ্রাম অঞ্চল) মো. মজিবুর রহমান পাটোয়ারী সময়ের আলোকে জানান, মাদকের বিরুদ্ধে আমরা সবসময়ই সোচ্চার আছি। কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম থেকে গত মাসেও ২ লাখ ১৭ হাজার ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছে। এসব ঘটনায় গ্রেফতারের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের (ডিএনসি) অভিযানগুলো হাতেনাতে বা সরসারি পরিচালিত হয় বেশি। তিনি বলেন, মাদক ব্যবসায়ীরা তাদের তৎপরতা অব্যাহত রাখতে প্রতিনিয়তই কৌশল পাল্টাচ্ছে। তবে যে পদ্ধতিই কাজে লাগাক, ধরা পড়তেই হচ্ছে। আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় ডিএনসিসহ অন্যান্য সংস্থার মাদকবিরোধী অভিযান ও উদ্ধারের ঘটনা অনেক বেড়েছে।
জানা যায়, ১১ নভেম্বর রাতে বিজিবির অভিযানে টেকনাফের লেদা ছ্যুরিখাল এলাকা থেকে ৩০ হাজার পিস ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার করে বিজিবি। তার এক দিন আগে ৯ নভেম্বর রাতে বিজিবির বালুখালী বিওপি কর্তৃক অভিযানে টেকনাফ থেকে ২৪ হাজার ইয়াবাসহ ২ জনকে আটক করা হয়। একই রাতে বিজিবির টেকনাফ ব্যাটালিয়নের অভিযানে ৬০ হাজার পিস ইয়াবা আটক করা হয়েছে। তার আগে ৬ নভেম্বর রাতে কক্সবাজার ব্যাটালিয়ন (৩৪ বিজিবি) ঘুমধুম বিওপি কর্তৃক ১ জন আসামিসহ ৪০ হাজার ইয়াবা উদ্ধার করে। ৫ নভেম্বর বিজিবির কক্সবাজার ব্যাটালিয়ন বালুখালী এলাকা থেকে ৫০ হাজার ইয়াবা উদ্ধার করে। একই দিনে বিজিবির কক্সবাজার ব্যাটালিয়ন (৩৪ বিজিবি) রেজুআমতলী বিওপি কর্তৃক ২ লাখ পিস ইয়াবাসহ ৬ মাদক ব্যবসায়ীকে আটক করেছে। এভাবেই প্রায় অভিযানেই ইয়াবা উদ্ধার ও গ্রেফতারের ঘটনা ঘটলেও থামছে না মরণ নেশার আগ্রাসন।

About the author

CrimeSearchBD

%d bloggers like this: