ক্রাইম

ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদন্ডই হচ্ছে

Written by CrimeSearchBD

দেশে সম্প্রতি ধর্ষণ ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। এমন এক নাজুক পরিস্থিতিতে দেশে ধর্ষণের বিষয়ে বিদ্যমান আইন সংশোধন করে এর সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদÐ করার দাবি জানিয়ে আসছিলেন বিশিষ্টজনেরাও। এমন পরিস্থিতিতে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদÐের বিধান রেখে বর্তমান আইন সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে জানিয়ে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বৃহস্পতিবার বলেন, আগামী সোমবারই আইন সংশোধনের বিষয়টি মন্ত্রিসভায় উত্থাপন করা হবে।
জানা গেছে, সংশোধিত আইনে গণধর্ষণ ও শিশু ধর্ষণের একমাত্র সাজা নির্ধারণ করা হচ্ছে মৃত্যুদÐ। তবে ধর্ষণের ক্ষেত্রে যাবজ্জীবন কারাদÐ ও মৃত্যুদÐ উভয়েরই বিধান রাখা হতে পারে। দেশে বর্তমানে ধর্ষণের শাস্তি কী তা বাংলাদেশ দÐবিধি ১৮৬০-এর ৩৭৬ ধারায় বলা হয়েছে। এই ধারায় ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদÐ। ধারাটিতে বলা হয়েছেÑ কোনো ব্যক্তি যদি ধর্ষণের অপরাধ করে, তবে সে ব্যক্তি যাবজীবন কারাদÐে অথবা ১০ বছর পর্যন্ত যেকোনো মেয়াদের সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদÐে দÐিত হবে এবং তদুপরি অর্থদÐেও দÐিত হবে, যদি না ধর্ষণের শিকার স্ত্রী-লোকটি তার নিজ স্ত্রী হয় এবং সেই স্ত্রী ১২ বছরের কম বয়সি না হয়। নতুন আইনে এ ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ শাস্তি হবে মৃত্যুদÐ। যদি এমন হয় যে ধর্ষণের শিকার নারীটি তার স্ত্রী, যার বয়স ১২ বছরের কম, তবে সে ক্ষেত্রে ওই ব্যক্তি দুই বছর পর্যন্ত যেকোনো মেয়াদের সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদÐে অথবা অর্থদÐে অথবা উভয়বিধ দÐে দÐিত হবে।
এ ছাড়া নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০-এর ৯ নম্বর ধারায়ও ধর্ষণের ঘটনায় সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে যাবজ্জীবন কারাদÐের কথা বলা আছে। তবে এ আইনে ধর্ষণের ফলে মৃত্যু হলে সে ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদÐের কথা বলা আছে। ৯ (১) ধারায় বলা হয়েছে, যদি কোনো পুরুষ কোনো নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করে, তা হলে সে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদÐে দÐিত হবে এবং এর অতিরিক্ত অর্থদÐে দÐিত হবে।
(২) ধারায় আছে, যদি কোনো ব্যক্তি ধর্ষণ করে বা ধর্ষণের পর তার কার্যকলাপের ফলে ধর্ষণের শিকার নারী বা শিশুর মৃত্যু ঘটে, তা হলে ওই ব্যক্তি মৃত্যুদÐে বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদÐে দÐিত হবে এবং ইহার অতিরিক্ত অন্যূন এক লাখ টাকা অর্থদÐেও দÐিত হবে। এ ছাড়া ৯ (৩) ধারায় আছে, যদি একাধিক ব্যক্তি দলবদ্ধভাবে কোনো নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করে এবং ধর্ষণের ফলে ওই নারী বা শিশুর মৃত্যু ঘটে বা আহত হয়, তা হলে ওই দলের প্রত্যেক ব্যক্তি মৃত্যুদÐে বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদÐে দÐিত হবে এবং ইহার অতিরিক্ত অন্যূন এক লাখ টাকা অর্থদÐেও দÐিত হবে। এ ক্ষেত্রে নতুন আইনে শুধু মৃত্যুদÐ রাখা হতে পারে বলে জানা গেছে। ৯ (৪) ধারায় বলা আছেÑ যদি কোনো ব্যক্তি কোনো নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করে মেরে ফেলার চেষ্টা করেন, তা হলে ওই ব্যক্তি যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদÐে দÐিত হবে এবং এর অতিরিক্ত অর্থদÐেও দÐিত হবে। নতুন আইনে এ ক্ষেত্রে মৃত্যুদÐের বিধান রাখা হতে পারে।
এ ব্যাপারে সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ সময়ের আলোকে বলেন, বর্তমানে যেভাবে সারা দেশে বিভৎস ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে তাতে বর্তমান আইন সংশোধন করা জরুরি ছিল। গণধর্ষণ ও শিশু ধর্ষণের একমাত্র শাস্তি হতে হবে মৃত্যুদÐ। এমনকি ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তিও মৃত্যুদÐ হওয়া উচিত।
সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও নবনিযুক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল এম আমিন উদ্দিন বলেন, ধর্ষণ একটি মারাত্মক অপরাধ। কিছু ক্ষেত্রে তা হত্যার চেয়েও ভয়াবহ। তাই হত্যা মামলার সর্বোচ্চ শাস্তি যেহেতু মৃত্যুদÐ, তাই ধর্ষণ, গণধর্ষণ ও শিশু ধর্ষণেরও সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদÐই হয়।
মানবাধিকার নেত্রী ও সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী ফাওজিয়া করিম ফিরোজ বলেন, ধর্ষণের এই মহামারি প্রতিরোধ করতে যেকোনো ধরনের ধর্ষণের একমাত্র সাজা হওয়া দরকার মৃত্যুদÐ। এই অপরাপধের অন্য কোনো সাজা রাখা উচিত না। একই সঙ্গে এ ধরনের স্পর্শকাতর মামলার বিচার হওয়া উচিত বিশেষ ট্রাইব্যুনালে। যাতে অতি দ্রæত তা নিষ্পত্তি হয়। অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মুরাদ রেজা বলেন, ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদÐ থেকে বাড়িয়ে মৃত্যুদÐ করার উদ্যোগ সময় উপযোগী।
এ ব্যাপারে আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হক বলেন, ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন থেকে বাড়িয়ে মৃত্যুদÐ করার বিষয়ে জনগণের পক্ষ থেকে দাবি ছিল। তাই এ ব্যাপারে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, যেকোনো ধরনের ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদÐের বিধান রেখে বর্তমান আইনটি সংশোধন করা হচ্ছে। সংশোধিত আইনটি পাশের জন্য আগামী সোমবার মন্ত্রিসভায় উত্থাপন করা হবে।
প্রসঙ্গত, প্রতিটি দেশেই ধর্ষণকে ঘৃণ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়। ধর্ষণের শাস্তির বিধানও সেভাবে নির্ধারণ করা হয়। তবে এক এক দেশে এক এক রকম শাস্তির বিধান রয়েছে। বাংলাদেশে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদÐ হলেও প্রতিবেশী দেশ ভারতে ২০১৩ সালে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদÐ করা হয়েছে। আরেক প্রতিবেশী দেশ চীনে ধর্ষণ প্রমাণ হলেই আর কোনো সাজা নয়, বিশেষ অঙ্গ কর্তন এবং সরাসরি মৃত্যুদÐ। ইরানে ধর্ষককে ফাঁসি না হয় সোজাসুজি গুলি করা হয়। আফগানিস্তানে ধর্ষণ করে ধরা পড়লে চার দিনের মধ্যে ধর্ষকের মাথায় সোজা গুলি করে মারা হয়। উত্তর কোরিয়ায় ধর্ষণের অভিযোগ প্রমাণ হলে গুলি করে হত্যা করা হয়। সৌদি আরবে জুম্মার নামাজের পর ধর্ষককে প্রকাশ্যেই শিরোচ্ছেদের বিধান আছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতে সাত দিনের মধ্যে মৃত্যুদÐ কার্যকর করা হয়। মঙ্গোলিয়ায় ধর্ষণের শিকার পরিবারের হাত দিয়ে ধর্ষককে হত্যার আইন আছে। মিসরে ধর্ষককে জনসমক্ষে ফাঁসি দেওয়া হয়। তবে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল, রাশিয়া, ফ্রান্স ও নরওয়ের মতো দেশের ধর্ষণের শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদÐ।

About the author

CrimeSearchBD

%d bloggers like this: