রাজনীতি

দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন গড়ে তুলতে চাই

Written by CrimeSearchBD

প্রয়োজন অনুযায়ী বরাদ্দ দেওয়ায় দেশের অর্থনীতি গতিশীল আছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, অর্থ মন্ত্রণালয় অন্যান্য সময় কার্পণ্য করলেও করোনা মহামারির মধ্যে যখন, যেখানে যা দরকার সেই অর্থ বরাদ্দ দেওয়ায় অর্থনীতি গতিশীল রাখা সম্ভব হয়েছে।
বৃহস্পতিবার সকালে গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে মন্ত্রণালয় ও বিভাগসমূহের ২০২০-২১ অর্থবছরের বার্ষিক কর্মসম্পাদন চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, অর্থ মন্ত্রণালয় সাধারণত সবকিছু দিতে গেলে একটু হাত টেনে রাখে, একটু কিপটামো
করে, এবার কিন্তু কিপটামো করে নাই। একেবারে হাত খুলে যেখানে যা দরকার আমরা দিয়ে দিয়েছি। সেভাবে দেওয়া হয়েছে বলেই আজকে আমাদের যেই প্রণোদনা প্যাকেজ আমরা দিলাম, এই প্রণোদনা প্যাকেজ দেওয়ার ফলে আমাদের অর্থনীতির চাকাটা কিন্তু সচল থেকেছে। আমাদের জিডিপির প্রায় চার দশমিক শূন্য তিন শতাংশ আমরা প্রণোদনা প্যাকেজ হিসেবে দিয়ে দিয়েছি।
সরকারি সহায়তার বাইরেও নিজ উদ্যোগে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে সহায়তা দেওয়ার কথাও বলেন প্রধানমন্ত্রী। অনুষ্ঠানে সরকারি কর্মকর্তাদের জনগণের জন্য কাজ করার পরামর্শ দিয়ে বিভিন্ন নির্দেশনা দেন শেখ হাসিনা।
কর্মকর্তাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, দুর্যোগ আসবে, দুর্যোগের জায়গাই বাংলাদেশ। কিন্তু সেই দুর্যোগ মোকাবিলা করে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। আমি সব সময় যেটা বলি, আমরা মুক্তিযুদ্ধ করেছি, আমরা বিজয়ী জাতি। কাজেই সেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে আমাদের চলতে হবে।
করোনাভাইরাস পুরো বিশ^কেই স্থবির করে দিয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আজকে এখানে বন্দিখানায় বসে বসে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে এই অনুষ্ঠানটা আমাদের করতে হলো। অথচ প্রতিবছর আমি নিজে উপস্থিত থাকি। ২০০৮ সালে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তুলব, এই ঘোষণাটা দিয়েছিলাম। এটা বাস্তবায়ন হয়েছে বলেই আজকে এই সুযোগটা পাচ্ছি যে, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে আমরা কিন্তু আমাদের কাজগুলো সম্পন্ন করতে পারছি। অথচ, ডিজিটাল বাংলাদেশ শব্দটা নিয়ে একসময় অনেকেই সমালোচনা করতেন বলেও জানান তিনি।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়তে সরকারের নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন বঙ্গবন্ধুকন্যা। শোষিত বঞ্চিত মানুষের অধিকার আদায়ে জাতির পিতার আজীবন সংগ্রামের কথা তুলে ধরে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর দেশের উন্নয়নে তার নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগ এবং তাকে নির্মমভাবে হত্যার কথাও তুলে ধরেন শেখ হাসিনা।
তিনি বলেন, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট দিনটি ছিল বাংলাদেশের জন্য সব থেকে একটি কালো দিন। ঘাতকের দল বা তাদের সঙ্গে দোসর যারা ছিল বা নেপথ্যে যারা ছিল তারা সামনে বেরিয়ে এলো। জাতির পিতাকে হত্যার পর যুদ্ধাপরাধী যাদের বিচার শুরু হয়েছিল তাদের মুক্তি দেওয়া হয়, বঙ্গবন্ধুর খুনিদের রক্ষায় ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল, খুনিদের বিদেশি দূতাবাসে চাকরি দিয়ে পুরস্কৃত করা হয়েছিল।
ওই সময় বাংলাদেশে বিচারহীনতা, নিয়মনীতিহীনতা, স্বাধীনতাবিরোধীদের রাজত্ব ছিলÑ উল্লেখ করে তিনি বলেন, যারা স্বাধীনতা চায়নি তারা হয়ে গেল রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত এবং তারপরে অপবাদ ছড়ানো হলো নানা কথা বলে। জাতির পিতার সম্পর্কে, আমাদের সম্পর্কে। এভাবেই একটা দেশকে ভিন্ন খাতে নিয়ে যাওয়ার একটা প্রচেষ্টা।
সেনা কর্মকর্তা হয়েও জিয়াউর রহমান অবৈধভাবে নিজেকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করেছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, সেই থেকেই তো আমাদের সব সিস্টেমটা নষ্ট হলো।
করোনাভাইরাসের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সশস্ত্র বাহিনীসহ প্রত্যেকটা প্রতিষ্ঠান জনগণের পাশে থেকে কাজ করেছে জানিয়ে তিনি বলেন, এই যে একটা সম্মিলিত প্রচেষ্টা আমরা করেছি বলেই কিন্তু আমরা অনেকক্ষেত্রে সাফল্য অর্জন করতে পেরেছি।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে : বার্ষিক কর্মসম্পাদন চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, করোনা মহামারি মোকাবিলায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ‘যথেষ্ট দক্ষতার পরিচয়’ দিয়েছে। ‘সমালোচনায় কান না দিয়ে’ সরকারি কর্মকর্তাদের আত্মবিশ^াসের সঙ্গে দেশের জন্য কাজ করে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
শেখ হাসিনা বলেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অনেক সমালোচনা অনেকেই করে। কিন্তু আমি মনে করি যে, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় যথেষ্ট দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে। এবং সেই সময় তাৎক্ষণিকভাবে যে কাজগুলো করার দরকার ছিল, সেটা কিন্তু যথাযথভাবে করা হয়েছে বলেই এই করোনাকে আমরা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পেরেছি।
চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীরা এই মহামারির মধ্যেও যে নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মানুষকে সেবা দিয়ে যাচ্ছে, আর তা করতে গিয়ে অনেকের যে মৃত্যুও হয়েছে, সে বিষয়টি সবাইকে ‘মাথায় রাখতে’ অনুরোধ করেন প্রধানমন্ত্রী।
সমালোচকদের সমালোচনা করে তিনি বলেন, আমাদের দেশে এক শ্রেণির লোক থাকে, যাদের সমালোচনা করাটাই অভ্যাস। পান থেকে চুন খসলে অনেক কথা বলবে, কিন্তু নিজেরা কিছু করবে না। আর আমি তো বেসরকারি টেলিভিশন অনেকগুলো দিয়ে দিয়েছি, তারপরে আছে বিদ্যুৎ। আর এখন ডিজিটাল বাংলাদেশ করে দিয়েছি। এরা একসময় সমালোচনা করেছিল, সেই ডিজিটাল বাংলাদেশেই আমাদের বিরুদ্ধে নানা অপপ্রচার তারা চালাতে থাকবে… সেটা বলুক।
কর্মকর্তাদের উদ্দেশে শেখ হাসিনা বলেন, আমি মনে করি, আমরা সঠিক পথে আছি কি না এটা নিজের আত্মবিশ^াসের ওপর নির্ভর করে। সবাই যখন কাজ করবেন, আত্মবিশ^াস নিয়ে করবেন। কে কী বলল, কে কী লিখলÑ ওর দিকে কান দিলে কোনো কাজ করতে পারবেন না। আপনার নিজের বিশ^াস থাকতে হবে, নিজের ওপর আস্থা থাকতে হবে যে, আপনি সঠিক কাজটি করছেন কি না। যদি সেই আস্থাটা থাকে, তবে সেই কাজের ফল দেশবাসী পাবে। সেটাই আমি বলতে চাই।
দফতরগুলোর সঙ্গে সরকারের বার্ষিক কর্মসম্পাদন চুক্তির সুফল যে শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের কাছেই যাবে, সে কথা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মনে করিয়ে দেন সরকারপ্রধান। তিনি বলেন, মানুষ এর শুভ ফলটা পাবে। আর আপনাদের দায়িত্ব হচ্ছে মানুষের পাশে থাকা। এটা আমাদের সবার দায়িত্ব। আমরা জনগণের ভোট নিয়ে এসেছি। আমরা ওয়াদাবদ্ধ মানুষের কাছে। আর আপনারা যারা চাকরি করেন, আপনাদের সময় আমাদের থেকে বেশি। আপনারাও কিন্তু জনগণের কাছে ওয়াদাবদ্ধ যে জনসেবা করতে হবে। জনসেবা করাটাই হচ্ছে দায়িত্ব।
সরকারের যে সম্পদ, জনগণই যে তার মালিক, সে কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সেই সম্পদের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিতের পাশাপাশি জনগণের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দিতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সচেষ্ট থাকতে হবে।
‘দুর্নীতিমুক্ত’ প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সরকারের চেষ্টার কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, আমরা স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য পদক্ষেপ নিয়েছিলাম। আমরা শুদ্ধাচার কর্মপরিকল্পনা নিয়েছিলাম। এখানে আমরা দুর্নীতিমুক্ত একটা প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাই। প্রত্যেকটা মন্ত্রণালয়ে আপনাদেরকে শুদ্ধাচার বিষয়ে নিজস্ব একটা পরিকল্পনা নিতে হবে যে, কীভাবে আপনারা কাজগুলো সম্পন্ন করবেন। আপনাদের সঙ্গে সঙ্গে তার নিচের স্তর পর্যন্ত এই পরিকল্পনা থাকতে হবে এবং তা যথাযথভাবে কার্যকর করতে হবে। যারা এটা কার্যকর করতে পারবেন, তারাই পুরস্কৃত হবেন।
শোষিত বঞ্চিত মানুষের অধিকার আদায়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আজীবন সংগ্রামের কথা তুলে ধরে তাকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা করার কথাও অনুষ্ঠানে স্মরণ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ১৯৭৫ সালের পর বাংলাদেশ একটা ইজ্জতহীন দেশে পরিণত হয়েছিল। সব জায়গায় ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে চলত। যেটা আমার খুব কষ্ট হতো।
আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে গত এক দশকে বাংলাদেশের যে অগ্রযাত্রা আবার শুরু হয়েছে, তা অব্যাহত থাকবে বলেও অনুষ্ঠানে আশা প্রকাশ করেন শেখ হাসিনা। বার্ষিক কর্মসম্পাদন চুক্তির ‘সফল বাস্তবায়নের মাধ্যমে’ জাতির পিতার আজীবন স্বপ্নের ‘সোনার বাংলাদেশ’ গড়ে তোলার প্রত্যয় তিনি ব্যক্ত করেন।
অনুষ্ঠানে গণভবন প্রান্তে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব আহমদ কায়কাউস, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব মো. তোফাজ্জল হোসেন মিয়া, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহসানুল করিম উপস্থিত ছিলেন। আর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কেন্দ্রে কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক, জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন, মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলামসহ বিভিন্ন দফতরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

About the author

CrimeSearchBD

%d bloggers like this: