ক্রাইম

ঢাবি ছাত্রী ধর্ষণ মামলায় মজনুর যাবজ্জীবন

Written by CrimeSearchBD

রাজধানীর কুর্মিটোলায় ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের অভিযোগে করা মামলার একমাত্র আসামি মজনুকে যাবজ্জীবন কারাদÐ দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে তাকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরও ৬ মাসের কারাদÐ দেওয়া হয়েছে। বৃহস্পতিবার বেলা ৩টার দিকে ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৭-এর বিচারক বেগম মোসাম্মৎ কামরুন্নাহার জনাকীর্ণ আদালতে এ রায় ঘোষণা করেন। মাত্র ১৩ কার্যদিবসে মামলাটির বিচার কার্যক্রম শেষ করেন বিচারক। ধর্ষণের পর ওই শিক্ষার্থীর মোবাইল বিক্রি করে দিয়েছিল মজনু, যা পরে র‌্যাব উদ্ধার করে। সে কারণে মামলায় ধর্ষণের পাশাপাশি ছিনতাইয়ের অভিযোগে মজনুর বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়েছিল। তবে আদালত ছিনতাইয়ের অভিযোগ থেকে আসামিকে খালাস দিয়েছেন।
এদিন রায় ঘোষণা থাকায় আসামি মজনুকে বেলা ২টার দিকে কাশিমপুর কারাগার থেকে আদালতে নিয়ে আসার পর উপস্থিত সবাইকে তাকে ছেড়ে দেওয়ার আর্জি
জানাতে থাকে। এ সময় তাকে বলতে শোনা যায়, ভাই আমাকে ছেড়ে দেন। আমি এতিম, অসহায়। আমারে মারলে আল্লাহ অনেক শাস্তি দেবে। আমাকে মিথ্যা মামলা দেওয়া হয়েছে। আমি নির্দোষ। বেলা আড়াইটার দিকে মজনুকে এজলাসে নেওয়া হলে কড়া পুলিশ বেষ্টনীর মধ্যে কাঠগড়ায় থেকেই সে হইচই শুরু করে। চিৎকার করে সে বলতে থাকে, আমি বাড়ি যামু গা, আমি আর থাকব না। আমি রিকশা চালাই, ভ্যান চালাই। আমি দুর্বল মানুষ। আমারে বিনা দোষে ধরে এনেছে। আল্লাহ বিচার করব রে। আমার নাম মজনু। আমি পাগল মজনু। আমারে এক বছর বিনা দোষে আটকে রেখেছে।
একপর্যায়ে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে হাজত পুলিশের এক সদস্যের ঘাড় চেপে ধরে আসামি মজনু। এরপর কাঁদতে কাঁদতে কোর্ট হাজতের ওসির কাছে অভিযোগ জানাতে থাকে এবং পুলিশ সদস্যদের গালাগাল শুরু করে। সে বলে, আমার চোখের পানি শুকায়ে গেছে। আমি ধর্ষণকারী না। আমারে তাড়াতাড়ি ছাইড়া দেন। না হলে অবস্থা খারাপ হবে। হাতের হ্যান্ডকাফ একবার খুলে দে। কত পুলিশ আছে দেখে নেব। রায় ঘোষণার পর মজনুকে আর কথা বলার সুযোগ না দিয়ে সাজা পরোয়ানা মুলে কারাগারে পাঠানো হয়।
এদিকে রায় ঘোষণা শেষে রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি আফরোজা ফারহানা আহম্মেদ অরেঞ্জ বলেন, মজনুর ১৬৪ ধারার জবানবন্দি, ডিএনএ পরীক্ষার প্রতিবেদন, মোবাইল ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে গ্রেফতার, ধর্ষণের শিকার শিক্ষার্থীর শনাক্তকরণ ও সাক্ষীদের সাক্ষ্যের মাধ্যমে আমরা আদালতকে সন্তুষ্ট করতে পেরেছি। তাই আদালত সন্তুষ্ট হয়ে আসামিকে এই আইনে সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদÐ দিয়েছেন। আমরা রাষ্ট্রপক্ষ এই রায়ে সন্তুষ্ট। তিনি বলেন, ওই শিক্ষার্থীকে ২০টি ছবি দেখানো হয়, তার মধ্যে মজুনর ছবিও ছিল। তিনি মজনুকেই ধর্ষক হিসেবে শনাক্ত করেছিলেন। তিনি আরও বলেন, ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদÐ হওয়ার আগে এই মামলার অভিযোগ গঠন হওয়ায় আগের আইনের সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদÐ দেওয়া হয়েছে আসামি মজনুকে। অপরদিকে আসামি মজনুর আইনজীবী রবিউল ইসলাম বলেন, আমরা ন্যায়বিচার পাইনি। রায় দেখে পর্যালোচনা করে উচ্চ আদালতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেব। গত ১২ নভেম্বর মজনুর আত্মপক্ষ শুনানি এবং রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে রায়ের এ তারিখ ধার্য্য করেন আদালত। এ মামলায় ২৪ জন সাক্ষীর মধ্যে ২০ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন করেন আদালত।
গত ১৬ মার্চ মজনুকে একমাত্র আসামি করে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক আবু সিদ্দিক অভিযোগপত্র সিএমএম আদালতে দাখিল করেন। অভিযোগপত্রে বলা হয়, গত ৪ জানুয়ারি ওই ছাত্রী বান্ধবীর দাওয়াতে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ক্ষণিকা বাসে করে তার বান্ধবীর বাসা শেওড়ার উদ্দেশে রওনা হন। সেদিন সন্ধ্যা ৭টায় ছাত্রী শেওড়া বাসস্ট্যান্ডে না নেমে কুর্মিটোলা বাসস্ট্যান্ডে নেমে যান। সে সময় ছাত্রী বুঝতে পারেন, তিনি ভুল করে নেমে পড়েছেন। ভুল বুঝতে পেরে তিনি ফুটপাথ দিয়ে হাঁটতে থাকেন। ঘটনার দিন মজনু বিকাল ৫টায় কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে যান। ওষুধ নিয়ে সন্ধ্যা হয়ে যাওয়ায় কুর্মিটোলা বাসস্ট্যান্ড থেকে একটু পূর্ব দিকে যাওয়ার রাস্তার ফুটপাথের পাশে ইটের তৈরি বেঞ্চে বসে থাকে। সন্ধ্যা ৭টায় ছাত্রী ওই ফুটপাথ দিয়ে যাচ্ছিলেন। মজনু পেছন দিক থেকে হঠাৎ তাকে পাশের ঝোপের ভেতরে ফেলে দেয়। তখন ছাত্রী চিৎকার করতে থাকলে মজনু গলা চেপে ধরে এবং মুখে, বুকে ও পেটে কিল ঘুষি মারে। এ সময় মজনু ছাত্রীর গলা চেপে ধরায় তিনি নিস্তেজ হয়ে যান। একপর্যায়ে তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। তখন মজনু তাকে ধর্ষণ করে। ধর্ষণের পরে মজনু ছাত্রীর ব্যাগ থেকে একটি প্যান্ট বের করে তাকে পরিয়ে দেয়। ছাত্রী জ্ঞান ফেরার পরে দেখেন তার পরনে যে প্যান্ট ছিল সেটা আর নেই। ছাত্রী তখন চলে যাওয়ার চেষ্টা করলে মজনু টাকা, মোবাইল ফোন ও ব্যাগ ছিনতাইয়ের জন্য গলা চেপে ধরে এবং কিল-ঘুষি মারে। একপর্যায়ে মজনু ছাত্রীর কাছ থেকে দুই হাজার টাকা, মোবাইল ফোন ও ব্যাগ ছিনিয়ে নেয়। এরপর ছাত্রী দৌড়ে রাস্তা পার হয়ে একটি রিকশায় ওঠেন এবং তার বান্ধবীর বাসায় যান। বান্ধবীকে বিষয়টি জানালে ছাত্রীকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে ভর্তি করা হয়। এ ঘটনায় ৬ জানুয়ারি দুপুরে ভুক্তভোগী ওই ছাত্রীর বাবা বাদী হয়ে ক্যান্টনমেন্ট থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে মামলা করেন।
গত ৮ জানুয়ারি ক্যান্টনমেন্ট থানার শেওড়া বাসস্ট্যান্ড এলাকা থেকে মজনুকে গ্রেফতার করে র‌্যাব। পরবর্তী সময়ে ৯ জানুয়ারি মজনুকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাত দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। রিমান্ড শেষে ১৬ জানুয়ারি ধর্ষণের কথা স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দেয় সে। পরবর্তী সময়ে তার স্বীকারোক্তি মতে ভিকটিমের ব্যাগ, মোবাইল ও পাওয়ার ব্যাংক এবং ভিকটিমের ব্যবহৃত একটি জিন্সের প্যান্ট ও একটি জ্যাকেট উদ্ধার করা হয়।

About the author

CrimeSearchBD

%d bloggers like this: