সারাদেশ

গ্রাহক টানার নতুন কৌশল নামেই ইসলামী ব্যাংকিং

Written by CrimeSearchBD

প্রতিযোগিতামূলক ব্যাংক ব্যবসায় টিকে থাকতে ব্যাংকের নতুন কৌশল এখন ইসলামী ব্যাংকিং। ইসলামী ব্যাংক পরিচালনায় নিজস্ব আইন না থাকা, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নামমাত্র গাইডলাইন ও নিজস্ব শরিয়াহ বোর্ড না থাকাসহ বিভিন্ন দুর্বলতাকে পুঁজি করে গতানুগতিক ব্যাংক থেকে বেরিয়ে এসে ইসলামী ব্যাংকিংয়ে ঝুঁকছে ব্যাংকগুলো। দেশের মুসলমানদের ধর্মীয় আবেগের বিষয়কে কাজে লাগিয়ে আমানত ও বিনিয়োগ কার্যক্রমে ভিন্নতার কথা বলে নামমাত্র ইসলামী ব্যাংকিং পরিচালনা করা হচ্ছে। তবে বাংলাদেশে ৩৭ বছর ধরে ইসলামী ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে এলেও এখন পর্যন্ত এ সংক্রান্ত আইন চালু হয়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, ইসলামী ব্যাংকের পরিধি যেমন বাড়ছে সেই সঙ্গে বাড়ছে নানা সুবিধা-অসুবিধাও। আইন না থাকায় ইসলামী ব্যাংকিং কার্যক্রম নিয়ে জনমনে অনেক প্রশ্ন রয়েছে। ইসলামী ব্যাংকিং পরিচালনায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিজস্ব শরিয়াহ বোর্ড না থাকায় ব্যাংকগুলোর নিজস্ব শরিয়াহ বোর্ডের সিদ্ধান্তেই চলছে এ ব্যবস্থার কার্যক্রম।
সুদভিত্তিক ব্যাংক ব্যবস্থার আইন দিয়েই চলছে দেশের ইসলামী ব্যাংকগুলো। ইসলামী ব্যাংকিং আইন না থাকায় নিজস্ব শরিয়াহ বোর্ডের দোহাই দিয়ে প্রচলিত ধারার ব্যাংকগুলোর মতোই প্রায় একইভাবে আমানত-বিনিয়োগের সব কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে ব্যাংকগুলো। পূর্ণাঙ্গ ইসলামী খাতের ব্যাংকগুলো ছাড়াও আরও কিছু ব্যাংক শাখা বা উইন্ডো খুলে মুনাফা সংগ্রহ করা নাকি ইসলামী ব্যাংকিং পরিচালনা করাই তাদের উদ্দেশ্যÑ এ নিয়ে ব্যাংকারদের মধ্যে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। একই সঙ্গে অন্য যেসব ব্যাংকের মাধ্যমে ইসলামী ব্যাংকিং পরিচালিত হচ্ছে তাদের শরিয়াহ বোর্ডের প্রয়োজন আছে কি না তা নিয়েও ব্যাংকারদের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে।
একদিকে পৃথক কোনো আইন নেই, অন্যদিকে শরিয়াহ বোর্ড বা কাউন্সিল না থাকায় বাংলাদেশ ব্যাংক এই ব্যাংকগুলোর ব্যাংকিং কার্যক্রমের খুঁটিনাটি বিষয়গুলো ধরে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা বা বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারছে না। এ কারণে প্রচলিত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো নানা সুবিধার দিক চিন্তা করে এ ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ সময়ের আলোকে বলেন, ব্যাংকগুলো ইসলামী ব্যাংকে রূপান্তরিত হওয়ার মূল কারণ হলো ইসলামী ব্যাংকের আমানতকারীরা মুনাফা বা আমানতের হার নিয়ে চিন্তা করে না। ফলে ব্যাংকগুলোর কস্ট অব ফান্ড কম হয়। আরেকটি বিষয় হলো এ দেশের সাধারণ মানুষের ধারণা, ইসলামী ব্যাংকগুলো ইসলামী আদর্শে পরিচালিত হয়, অন্য ব্যাংকগুলোর মতো এখানে দুর্নীতি হয় না। তিনি বলেন, ইসলামী ব্যাংকগুলো সঠিকভাবে পরিচালিত হচ্ছে কি না, শরিয়াহ আইন মানছে কি না এটাই এখন দেখার বিষয়। ইসলামী ব্যাংকিংয়ের পরিধি যেহেতু বাড়ছে, তাই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচিত ইসলামী ব্যাংকিং পরিচালনার জন্য আলাদা শরিয়াহ বোর্ড গঠন করা। এরপর হয়তো ইসলামী খাতের ব্যাংকগুলো নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ন্যায় আলাদা একটা ব্যাংকও গঠন করার কথা আসতে পারে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে দেশে পুরোদমে ইসলামী ব্যাংকিং কার্যক্রম চালাচ্ছে আটটি ব্যাংক। ব্যাংকগুলো হচ্ছেÑ ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড, আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড, ফার্স্ট সিকিউরিটিজ ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড, আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড, এক্সিম ব্যাংক লিমিটেড, সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড ও ইউনিয়ন ব্যাংক লিমিটেড। ব্যাংকগুলোর শাখার সংখ্যা ১ হাজার ২৭৪টি। এর বাইরে ৯টি ব্যাংকের ১৯টি ইসলামী ব্যাংকিং শাখা রয়েছে এবং ১২টি ব্যাংকের ১৫৫টি ইসলামী ব্যাংকিং উইন্ডো রয়েছে।
সূত্র জানায়, নতুন করে ইসলামী ব্যাংকিং সেবায় যুক্ত হয়েছে মার্কেন্টাইল ব্যাংক, এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংক ও মিডল্যান্ড ব্যাংক। এ ছাড়া স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক, যমুনা ব্যাংক ও এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংক ইসলামী ধারার ব্যাংকে রূপান্তর হয়েছে। চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যেই পুরোপুরি ইসলামী ধারায় ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনার কথা রয়েছে এসব ব্যাংকের।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের ব্যাংকগুলোর মোট আমানতের এক-চতুর্থাংশই ইসলামী ব্যাংকগুলোর। চলতি বছরের সর্বশেষ প্রতিবেদন (এপ্রিল-জুন) অনুযায়ী, ইসলামী ধারার ব্যাংক ও শাখার আমানত ২ লাখ ৯১ হাজার ৩০৩ কোটি টাকা এবং বিনিয়োগ ২ লাখ ৭৫ হাজার ৪৬৫ কোটি টাকা।
ইসলামী ব্যাংকগুলো কী সুবিধা পাচ্ছেÑ ব্যাংকগুলোকে আমানতের বিপরীতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে বিনাসুদে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ নগদ রিজার্ভ অনুপাত (সিআরআর) ও সংবিধিবদ্ধ তারল্য অনুপাত (এসএলআর) রাখতে হয়। প্রচলিত ধারার ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে বর্তমানে ১৩ শতাংশ এসএলআর রাখার বাধ্যকতা থাকলেও ইসলামী ব্যাংকের ক্ষেত্রে মাত্র সাড়ে ৫ শতাংশ। অন্যদিকে প্রচলিত ধারার ব্যাংকগুলোকে ১০০ টাকা আমানতের বিপরীতে ৮৭ টাকা ঋণ দিতে পারে। ইসলামী ব্যাংকগুলো সেখানে ৯২ টাকা দিতে পারে। সুতরাং ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে ট্রেডিং ব্যাংকগুলোর চেয়ে ইসলামী ব্যাংকগুলোর ধারণক্ষমতা বেশি। এ ছাড়াও জানা যায়, পরিচালনাগত প্র্যাকটিসের অভাবে অনেকে এ ব্যবস্থায় ঝুঁকছে। সেই সঙ্গে অনেক ব্যাংক আমানতের বেশি ঋণ দিয়ে বিপাকে রয়েছে। এডিআর রেশিও সুবিধা পেতেও এ ব্যবস্থায় আসছে ব্যাংকগুলো।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকতারা জানান, ইসলামী ধারার ব্যাংকগুলোর সব ধরনের ডিপোজিটের ক্ষেত্রে গ্রাহকদের সঙ্গে ভয়াবহ প্রতারণার অভিযোগ রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি ও কাস্টমার সার্ভিস বিভাগে ব্যাংকগুলোর বিরুদ্ধে এ সংক্রান্ত অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে বলেও জানান কর্মকর্তারা। ইসলামী ব্যাংকগুলো ঋণের ক্ষেত্রে বিনিয়োগ, সুদের ক্ষেত্রে মুনাফা বলে। ইসলামী ব্যাংকিংয়ের ক্ষেত্রে ব্যাংক কোম্পানি আইনের বাইরে বহু আইনের ফাঁকফোকর রয়েছে।
তারা আরও জানান, অ-ইসলামী কার্যক্রম পরিচালনার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শরিয়াহ অ্যাডভাইজারি কমিটি রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাসহ ইসলামী ব্যাংকগুলোর কিছু গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তার সমন্বয়ে এ কমিটি গঠিত। তবে কেন্দ্র্রীয় ব্যাংকের পূর্ণাঙ্গ শরিয়াহ বোর্ড বা কাউন্সিল গঠনের সময় এসেছে। সেই সঙ্গে ব্যাংক কোম্পানি আইনে প্রচলিত ধারার ব্যাংকগুলোর পাশাপাশি ইসলামী ব্যাংকগুলোও পরিচালিত করার ক্ষেত্রে এ আইনটি পর্যাপ্ত কি না তাও দেখার সময় এসেছে।
ইসলামী শরীয়াহ বোর্ডের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যÑ দেশের ইসলামী খাতের ব্যাংকগুলোর কার্যক্রম পরিচালনার জন্য নিজস্ব ইসলামী শরিয়াহ বোর্ড রয়েছে। ব্যাংকগুলো শরিয়াহ অনুসারে চলছে কি না তা নিশ্চিত করে ব্যাংকগুলোর শরিয়াহ বোর্ড।
জানা যায়, ইসলামী ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে যেসব সমস্যার সম্মুখীন হয় সে বিষয়গুলো শরিয়াহ বোর্ড সভায় পেশ করা হয় এবং বোর্ড ইসলামের বিধিবিধানের আলোকে এসব ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিয়ে রায় দেয়। সেই সঙ্গে প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে ব্যাংককে পরামর্শ দেওয়ার দায়িত্বও বোর্ডের ওপর ন্যস্ত। পাশাপাশি শরিয়াহ মোতাবেক পরিচালিত হচ্ছে কি না সে ব্যাপারে ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও বোর্ড অব ডিরেক্টসের কাছে শরিয়াহ বোর্ড প্রতিবেদন দিয়ে থাকে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র সময়ের আলোকে বলেন, ব্যাংকগুলো কী সুবিধার কথা চিন্তা করে সম্পূর্ণ ইসলামী ব্যাংকিংয়ে যাচ্ছে তা আমার জানা নেই। তবে তাদের বোর্ডের সিদ্ধান্তের আলোকেই হয়তো তারা ইসলামী ব্যাংকিং কার্যক্রম চালাতে চায়। তিনি বলেন, দেশের মুষ্টিমেয় মানুষের চিন্তাচেতনা হলো, ইসলামী ব্যাংকে গেলে তাদের টাকাগুলো হালালভাবে থাকে। একটা গ্রুপ আছে তারা তাদের টাকা চলতি হিসাবেও রাখতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। সুতরাং নতুন করে যেসব ব্যাংক ইসলামী ব্যাংকিং কার্যক্রমে ঝুঁকছে হয়তো তারা এ রকম গ্রাহকদের টার্গেট করেই তা করছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উদ্যোগে শরিয়াহ বোর্ড গঠন করার বিষয়ে তিনি বলেন, প্রস্তাবটি মন্দ নয়। শরিয়াহ বোর্ড গঠন করা হলে ইসলামী ব্যাংকিং কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেওয়ার সুযোগ থাকবে। সুতরাং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উদ্যোগে ইসলামী শরিয়াহ বোর্ড গঠন হলে এ ব্যবস্থার ব্যাংকগুলো বোর্ডের আদেশ-উপদেশ ও নির্দেশনা মেনে চলবে।
প্রসঙ্গত, ইসলামী ব্যাংক চালু হওয়ার এক বছর আগে ‘ইসলামী ব্যাংকিং আইন’ চালু করেছিল থাইল্যান্ড। অথচ বাংলাদেশে ৩৭ বছর ধরে ইসলামী ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করে এলেও এখন পর্যন্ত এ সংক্রান্ত আইন চালু করা যায়নি। তবে ২০০৯ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক একটি গাইডলাইন প্রস্তাব করে ইসলামী ব্যাংকগুলোর জন্য, যা ২০১১ সালে সংশোধন করা হয়। ২০১১ সালে অর্থ বিষয়ক স্থায়ী কমিটির কাছে বাংলাদেশ ব্যাংক একটি খসড়া আইন চূড়ান্ত করে জমা দিয়েছিল। কিন্তু এখনও তা আলোর মুখ দেখেনি।

About the author

CrimeSearchBD

%d bloggers like this: