আইন-আদালত করোনা ভাইরাস

করোনায় বেড়েছে মামলার জট

Written by CrimeSearchBD

মহামারি করোনাভাইরাসের কারণে দীর্ঘ পাঁচ মাস নিয়মিত কোর্ট না বসায় বিচারাধীন মামলার স্ত‚প বেড়েছে দেশের বিচারালয়ে। গত ১১ মে থেকে সীমিত পরিসরে ভার্চুয়াল কোর্টে বিচারকাজ চললেও লাখ লাখ মামলা এ সময়ে পড়েছিল শুনানির অপেক্ষায়। অথচ বিচারকাজ না চললেও কারোনাকালীন ছুটিতে নতুন মামলা হয়েছে প্রায় স্বাভাবিক সময়ের মতোই। এতে করে ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ বিচারপ্রার্থীরা। আর বিচারকাজ বন্ধ থাকায় চরম আর্থিক সঙ্কটে পড়েছেন আইনজীবীরা।
সুপ্রিমকোর্ট প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, গত জুলাই পর্যন্ত দেশের আদালতগুলোয় প্রায় ৩৮ লাখ মামলা বিচারাধীন ছিল। অথচ গত ডিসেম্বরেই এ সংখ্যা ছিল ৩৭ লাখের কাছাকাছি। সুপ্রিমকোর্টের স্পেশাল অফিসার ও মুখপাত্র মোহাম্মদ সাইফুর রহমান সময়ের আলোকে জানান, ২০১৯ সালের ১ জানুয়ারি থেকে একই বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগে বিচারাধীন রয়েছে ২৩ হাজার ৬১৭টি মামলা এবং হাইকোর্ট বিভাগে ৪ লাখ ৮৯ হাজার ৬৮টি মামলা। দেশের বিচারিক আদালতসহ মোট বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ছিল ৩৬ লাখ ৮৪ হাজার ৭২৮টি।
করোনাকালে গত পাঁচ মাসে দেশের সব বিচারিক আদালতে (থানা থেকে আসা মামলাসহ) লাখ লাখ মামলা ফাইল করা হলেও নিষ্পত্তি হয়েছে এর তুলনায় খুবই কম। হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগের ভার্চুয়াল আদালতেও একই অবস্থা। এতে করে মামলা জট চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। ভোগান্তি বেড়েছে বিচারপ্রার্থী এমনকি আইনজীবীদেরও। আগাম জামিন নিতে বা জামিনের মেয়াদ বাড়াতে না পেরে ফেরার হয়েছে হাজার হাজার বিবাদী।
অন্যদিকে আদালত না চলায় চরম আর্থিক সঙ্কটে পড়েছেন বহু আইনজীবী। তবে এমন ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে বেশকিছু যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছেন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন। গত ৬ আগস্ট সুপ্রিমকোর্টের ফুল কোর্ট সভায় এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর মধ্যে রয়েছে দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সুপ্রিমকোর্টের অবকাশকালীন ছুটি বাতিল, ভার্চুয়াল ও অ্যাকচুয়াল উভয় কোর্ট চালু ও বিচারিক আদালতে মামলা নিষ্পত্তির হার বাড়াতে বিচারকদের কর্মঘণ্টা পূর্ণভাবে ব্যবহারের মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা। এ ছাড়া প্রধান বিচারপতির নির্দেশে বিচারকাজ দ্রæত করতে সুপ্রিমকোর্টের নিজস্ব তহবিল থেকে দেশের বেশকিছু নিম্ন আদালতে কম্পিউটার সরবরাহ করা হয়েছে।
সূত্র জানায়, ফুল কোর্ট সভায় বিচারপতিদের মধ্যে যাদের শারীরিক জটিলতা রয়েছে তাদের ভার্চুয়াল বেঞ্চ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। আর যারা শারীরিকভাবে পুরোপুরি সুস্থ রয়েছেন তাদের নিয়মিত কোর্ট পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
বিচারালয়ের এ অনাকাক্সিক্ষত ছুটির বিষয়ে আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হক সময়ের আলোকে জানান, ‘করোনাকালের ছুটিতে নিঃসন্দেহে দেশের সব আদালতে বিচারকাজ বিঘিœত হয়েছে। এর সমাধানে কাজ চলছে। আসলে আমরা তো আগেই (চলতি বছরের মার্চ মাস পর্যন্ত) ৩৬ লাখেরও বেশি মামলা জটে ছিলাম। এখন আরও বেড়েছে। বিচারাধীন এসব মামলা দ্রæত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে সরকার বিচারকের সংখ্যা বৃদ্ধি, আদালতের অবকাঠামো উন্নয়ন ও বিচারকদের তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ে প্রশিক্ষণসহ বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। প্রধান বিচারপতি ভার্চুয়াল ও অ্যাকচুয়াল (শারীরিক উপস্থিতির) বেঞ্চ গঠন করে চলতি বছরের পুরো অবকাশকালীন ছুটি বাতিল করেছেন। আশা করছি এ বছরের শেষের দিকে মামলার জট কমতে শুরু করবে।
এ বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম সময়ের আলোকে জানান, ‘আমাদের বিচারাধীন মামলা গত বছর থেকে কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসছিল। করোনার কারণে দীর্ঘ সময় নিয়মিত আদালত না চলায় পেন্ডিং (বিচারাধীন) মামলার সংখ্যা আবার বেড়ে গেছে। এ জন্য রাষ্ট্রপক্ষকেও আসছে দিনগুলোতে মামলা পরিচালনায় হিমশিম খেতে হবে। তবে প্রধান বিচারপতি যেসব সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তাতে এখন থেকে আর মামলার জট বাড়বে না বরং অদূর ভবিষ্যতে কমবে।’
সাবেক আইনমন্ত্রী ও সুপ্রিমকোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ বলেন, ‘করোনার কারণে দেশের বিচারালয়ে যে ক্ষতি হয়েছে তা পুষিয়ে নেওয়া খুবই কঠিন কাজ। তবে অসম্ভব নয়। চলতি বছরের সুপ্রিমকোর্টের অবকাশকালীন ছুটি বাতিল ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে পুরোদমে বিচারকাজ শুরু করায় বিচারাধীন মামলার সংখ্যা হয়তো কিছুটা কমে আসবে।’
সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট ফাওজিয়া করিম বলেন, ‘করোনাকালে বিচারালয় বন্ধ থাকায় একদিকে যেমন বিচারাধীন মামলার সংখ্যা বেড়েছে, অন্যদিকে চরম সঙ্কটে পড়েছেন বিচারপ্রার্থী ও আইনজীবীরা। এ পরিস্থিতির উন্নতির জন্য প্রধান বিচারপতির উদ্যোগ প্রশংসনীয়। এখন প্রয়োজনে আদালতের কর্মঘণ্টা বাড়ানো যেতে পারে।

About the author

CrimeSearchBD

%d bloggers like this: