করোনা ভাইরাস

করোনার কাছে হেরে গেলেন আলী যাকের

শিল্প-সংস্কৃতির প্রতিটি ক্ষেত্রে ছিল তার সফল পদচারণা। তিনি সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আলী যাকের। বহুগুণের অধিকারী সংগঠক ও নাট্যজন সবকিছু ছাপিয়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন একজন সফল মানুষ। শুক্রবার সকাল ৬টা ৪০ মিনিটে রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন শেষ নিশ^^াস ত্যাগ করেন বরেণ্য এই অভিনেতা। (ইন্নালিল্লাহি … রাজিউন)। তার বয়স ছিল ৭৬ বছর। চার বছর ধরে ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করছিলেন আলী যাকের। সেই চিকিৎসার অংশ হিসেবে নিয়মিত থেরাপি চলছিল তার। গত সপ্তাহে শারীরিক সমস্যা হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় জরুরি ভিত্তিতে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানেই চিকিৎসাধীন
পরপারে পাড়ি দেন আলী যাকের।
শুক্রবার বেলা ১১টায় তার মরদেহ নেওয়া হয় আগারগাঁওয়ের মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর প্রাঙ্গণে। সেখানে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা গার্ড অব অনার দেওয়া হয়। স্বজন ও সংগঠনগুলো সেখানে ফুলেল শ্রদ্ধা ও শেষ বিদায় জানায়। দুপুর ১টার দিকে মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় আলী যাকেরের কর্মস্থল বিজ্ঞাপনী সংস্থা এশিয়াটিকের অফিসে। সেখানে কিছুক্ষণ রেখে নিয়ে যাওয়া হয় বনানী কবরস্থান মসজিদে। বাদ আসর জানাজা শেষে বিকাল ৪টা ৩৫ মিনিটে বনানী কবরস্থানে চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন কিংবদন্তি অভিনেতা-নির্দেশক আলী যাকের।
বরণ্যে এই অভিনেতার ছেলে অভিনেতা ইরেশ যাকের জানিয়েছেন, মৃত্যুর দুদিন আগে তার বাবার করোনা শনাক্ত হয়। সঙ্গত কারণে শহীদ মিনারে শেষ শ্রদ্ধার আয়োজন করা হয়নি। তার মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শোক প্রকাশ করেছেন। রাষ্ট্রপতি তার শোকবার্তায় বলেন, বরেণ্য অভিনেতা আলী যাকের ছিলেন দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তার মৃত্যুতে দেশ একজন বরেণ্য অভিনেতা ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বকে হারাল। প্রধানমন্ত্রী শোকবার্তায় বলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধ, দেশের শিল্পকলা ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে আলী যাকেরের অবদান স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
আলী যাকের ছিলেন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের অন্যতম ট্রাস্টি। স্বাস্থ্যবিধি মেনে তার কফিনে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান বিভিন্ন অঙ্গনের মানুষ। প্রিয়জন, সহশিল্পীকে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর প্রাঙ্গণে শ্রদ্ধা জানাতে উপস্থিত হন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার, ফেরদৌসী মজুমদার, নাট্যজন মামুনুর রশীদ, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি সারওয়ার আলী, মফিদুল হক, নাসির উদ্দীন ইউসুফ প্রমুখ। পরিবারের পক্ষে তার মরদেহের পাশে উপস্থিত ছিলেন স্ত্রী সারা যাকের, ছেলে নাট্যাভিনেতা ইরেশ যাকের, মেয়ে শ্রিয়া সর্বজয়া। সারাক্ষণ কফিনের পাশে ছিলেন সাবেক সংস্কৃতিমন্ত্রী সংসদ সদস্য আসাদুজ্জামান নূর। আওয়ামী লীগের সাংস্কৃতিক সম্পাদক অসীম কুমার উকিল ও প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়া আওয়ামী লীগের পক্ষে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
আলী যাকেরের মৃত্যুতে শোবিজ অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে আসে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তারকারা আলী যাকেরের ছবি পোস্ট করে স্মৃতিচারণ করেন। সকাল থেকেই ফেসবুক হয়ে উঠেছিল একটা শোকবই।
স্বাধীনতা-পরবর্তী মঞ্চনাটকের অন্যতম সংগঠক ও সফল নাট্যনির্দেশকের পাশাপাশি কলামিস্টও ছিলেন আলী যাকের। অভিনেতা ও লেখক পরিচয়ের বাইরে তার আরও একটি পরিচয় রয়েছে। তিনি ছিলেন দেশীয় বিজ্ঞাপনশিল্পের একজন পুরোধা ব্যক্তিত্ব।
মুক্তিযুদ্ধের পর দেশকে পুনর্গঠনে যারা কাজ করেছিলেন, আলী যাকের ছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম। পরবর্তী প্রজন্মের জন্য মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে সাজিয়ে রাখার জন্য যেসব মানুষ কাজ করেছিলেন তিনি অন্যতম।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নবীনগর উপজেলার রতনপুর গ্রামে ১৯৪৪ সালে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। চার ভাই-বোনের মধ্যে তৃতীয় ছিলেন আলী যাকের। তার বাবা মোহাম্মদ তাহের ছিলেন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা। বাবার চাকরির বদলি সূত্রে অল্প বয়সে কুষ্টিয়া ও মাদারীপুরে কাটান আলী যাকের।
আলী যাকেরের প্রথম স্মৃতি ফেনীতে। সেন্ট গ্রেগরি থেকে ১৯৬০ সালে ম্যাট্রিক পাস করে তিনি ভর্তি হন নটর ডেমে, সেখান থেকে এইচএসসি পাস করেন ১৯৬২ সালে। পরে সমাজবিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি নেন। তখনই যুক্ত হন ছাত্র রাজনীতিতে, করতেন ছাত্র ইউনিয়ন। স্নাতক শেষ হওয়ার পর ১৯৬৭ সালে চলে যান করাচি। সেখানেই করেছিলেন প্রথম অভিনয়। সেখানকার জাহাঙ্গীর কোর্টে থাকতেন ছোট-বড় সরকারি আমলারা। বাঙালিদের সংখ্যাও কম ছিল না। সেখানেই নাটকে অভিনয় করেছিলেন তিনি। ১৯৬৯ সালে তিনি ফিরে আসেন ঢাকায়।
একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় আলী যাকের গেলেন ভারতে, নিলেন প্রশিক্ষণ। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র তখন একটি ইংরেজি সার্ভিস চালু করে। সেখানেই কাজ শুরু করেন তিনি, প্রচারণা চালিয়েছেন, হয়েছেন শব্দসংগ্রামী।
আলী যাকের ১৯৭২ সালের ২১ ফেব্রæয়ারি মুনীর চৌধুরীর ‘কবর’ নাটকে প্রথম অভিনয় করেন। ওই বছরেরই জুনে তিনি নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ে যোগ দেন। তখন থেকে নাগরিকই তার ঠিকানা। ‘বাকি ইতিহাস’, ‘সৎ মানুষের খোঁজে’, ‘দেওয়ান গাজীর কিস্‌সা’, ‘কোপেনিকের ক্যাপটেন’, ‘গ্যালিলিও’, ‘ম্যাকবেথ’সহ অনেক আলোচিত মঞ্চনাটকের অভিনেতা ও নির্দেশক তিনি। পাশাপাশি টেলিভিশন নাটকে অভিনয় করেও তিনি পেয়েছেন জনপ্রিয়তা। ‘আজ রবিবার’, ‘বহুব্রীহি’, ‘তথাপি’, ‘পাথর’, ‘দেয়াল’সহ বহু নাটকে অভিনয় করে জনপ্রিয়তা পেয়েছেন আলী যাকের। বেতারে ৫০টির বেশি নাটক করেছেন তিনি। অভিনয় করেছেন বেশকিছু চলচ্চিত্রে। টেলিভিশনের জন্য মৌলিক নাটক লিখেছেন। নানা বিষয়ে দৈনিক পত্রিকায় নিয়মিত লেখালেখিও করেছেন দীর্ঘদিন। প্রকাশিত হয়েছে বই ‘সেই অরুণোদয় থেকে’, ‘নির্মল জ্যোতির জয়’। শখ করে ফটোগ্রাফিও করতেন তিনি।
আলী যাকের নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের সভাপতি ছিলেন। ছিলেন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের অন্যতম ট্রাস্টি। যুক্তরাজ্যের রয়্যাল ফটোগ্রাফিক সোসাইটির পূর্ণ সদস্য। একুশে পদক, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি পুরস্কার, বঙ্গবন্ধু পুরস্কার, মুনীর চৌধুরী পদক, নরেন বিশ^^াস পদকসহ অনেক পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন অভিনেতা আলী যাকের। বিজ্ঞাপনী সংস্থা এশিয়াটিক থ্রিসিক্সটি গ্রæপের চেয়ারম্যান ছিলেন তিনি। স্ত্রী স্বনামধন্য অভিনয়শিল্পী সারা যাকের, ছেলে অভিনেতা ইরেশ যাকের, ছেলের বউ মিম রশিদ, নাতনি নেহা ও মেয়ে শ্রিয়া সর্বজয়াকে নিয়ে ছিল তার সংসার।
আলী যাকের অভিনীত উল্লেখযোগ্য সিনেমাÑ আগামী, নদীর নাম মধুমতী, লালসালু, রাবেয়া, টেলিভিশন। ধারাবাহিক নাটকের মধ্যে রয়েছেÑ বহুব্রীহি, আজ রবিবার ইত্যাদি।

About the author

CrimeSearchBD

%d bloggers like this: