সারাদেশ

এত পেঁয়াজ গেল কোথায়

Written by CrimeSearchBD

পূর্বঘোষণা ছাড়াই ভারতের রফতানি বন্ধের খবরে দেশের বাজারে সেঞ্চুরির পথে পেঁয়াজ। নিত্যপ্রয়োজনীয় এ পণ্যের পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকলেও কৃত্রিম সঙ্কট দেখিয়ে বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে দাম। এজন্য কিছু অসাধু ব্যবসায়ী, প্রশাসনের কর্মকর্তা এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ব্যর্থতা রয়েছে বলে মনে করেন বাজার বিশ্লেষকরা।
কনজুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান সময়ের আলোকে বলেন, পেঁয়াজের বাজার অস্থির হওয়ার পেছনে দুটো কারণ রয়েছে। একটি হলো, আমদানি বন্ধের খবরে ব্যবসায়ীরা দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। সরকারের উচিত হবে দ্রুত বাজার মনিটরিং করা। আরেকটি হলো, ক্রেতা বা ভোক্তারা প্রয়োজনের চেয়ে অধিক ক্রয় করছে, যে কারণে পেঁয়াজের বাজারে বাড়তি চাপ হচ্ছে। ফলে সঙ্কট সৃষ্টি হয়েছে। তিনি বলেন, অতীত অভিজ্ঞতায় সরকার যদি দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করে তা হলে পেঁয়াজের দাম সহনীয় পর্যায়ে থাকবে। ভোক্তাদেরও অতিরিক্ত পরিমাণে পণ্যটি ক্রয় করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, চলতি অর্থবছরের আগস্ট মাসে পেঁয়াজ আমদানির পরিমাণ ৮৩ হাজার ৬৬৬ টন। একই সময়ে পণ্যটির এলসি খোলা হয়েছে ৮০ হাজার ৮৯৪ টনের। প্রতিবেদনে দেখা গেছে, আগস্ট মাসের প্রথম সপ্তাহে পেঁয়াজ আমদানি হয়েছে ৮ হাজার ৪১১ টন; একই সময়ে এলসি খোলা হয়েছে ১১ হাজার ৩৭৪ টনের। দ্বিতীয় সপ্তাহে আমদানি ২৭ হাজার ৩৮৫ টন; একই সময়ে এলসি খোলা হয়েছে ২০ হাজার ১০২ টনের, তৃতীয় সপ্তাহে আমদানি হয়েছে ২১ হাজার ৩১৭ টন; একই সময়ে এলসি খোলা হয়েছে ১৯ হাজার ২০৬ টনের, চতুর্থ সপ্তাহে আমদানি ২৩ হাজার ৮৩৯ টন; একই সময়ে এলসি খোলা হয়েছে ২২ হাজার ২৭৭ টনের এবং পঞ্চম সপ্তাহে পেঁয়াজ আমদানির পরিমাণ ২ হাজার ৭১৩ টন; একই সময়ে এ পণ্যের এলসি খোলা হয়েছে ৭ হাজার ৯৩৫ টনের। এত আমদানির পরও ভারতের পেঁয়াজ রফতানি বন্ধের খবরে মাত্র এক দিনের মাথায় সব পেঁয়াজ যেন হাওয়া হয়ে গেছে। আমদানি করা এত পেঁয়াজ গেল কোথায়? সে প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে সবার মাথায়। সুযোগসন্ধানী অসাধু ব্যবসায়ীরা যৌক্তিক কারণ ছাড়াই রাতারাতি পণ্যটির দাম বাড়িয়ে দিয়েছে কয়েকগুণ।
পেঁয়াজের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধিতে উদ্বেগ প্রকাশ করে চট্টগ্রাম চেম্বার সভাপতি মাহবুবুল আলম সময়ের আলোকে জানান, কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়াই পণ্যটির দাম বাড়ছে। আগের আমদানি করা পেঁয়াজ বাড়তি দামে বিক্রির কোনো নৈতিক ভিত্তি নেই। ভোক্তা সাধারণের অনেকেই আতঙ্কিত হয়ে বেশি করে পেঁয়াজ কিনতে দোকানে ভিড় করছে। চাহিদা হঠাৎ বেড়ে যাওয়ার সুযোগে দাম বাড়ানোর প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। তিনি দ্রুত চীন, তুরস্ক, পাকিস্তান, মিসর থেকে পেঁয়াজ আমদানির পাশাপাশি মিয়ানমার থেকে সড়কপথে আমদানির উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানান। টিসিবির ট্রাকের আউটলেট বাড়িয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ারও সুপারিশ করেন তিনি।
এদিকে কিছুদিন আগেও রাজধানীর খুচরা বাজারে যে পেঁয়াজ ৩২ টাকা কেজি দরে বিক্রি হতো, এখন তা বিক্রি হচ্ছে কেজিতে ৮০-৯০ টাকার ওপরে। পেঁয়াজের দাম সহনীয় পর্যায়ে আনতে সরকার আশ^াস দিলেও অসাধু ব্যবসায়ীরা এতটাই শক্তিশালী যে, তাদের নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। এমনকি কোনো কোনো সময়ে দেশের প্রধানমন্ত্রীকেও দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে হস্তক্ষেপ করতে হয়। এজন্য ব্যবসায়ী এবং প্রশাসনকে দায়িত্ব নিতে হবে বলে মনে করছেন ভুক্তভোগীরা। তাদের অভিযোগ, ভারত পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ করামাত্রই দাম হু হু করে বাড়ার কোনো যৌক্তিকতা কারণ নেই। ব্যবসায়ীরা কৃত্রিম সঙ্কট দেখিয়ে পেঁয়াজের দাম বাড়িয়েছে। তাই পেঁয়াজের দাম সহনীয় পর্যায়ে আনতে এখন থেকেই কর্তৃপক্ষের মনিটরিং বাড়ানো জরুরি।
অন্যদিকে বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে রোববার থেকে খোলা ট্রাকে প্রতিকেজি ৩০ টাকা দরে পেঁয়াজ বিক্রি শুরু করেছে সরকারি বাজার নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা টিসিবি। সারা দেশে ২৭৫টি ভ্রাম্যমাণ ট্রাকে পেঁয়াজ বিক্রি করেছে সংস্থাটি। এর মধ্যে রাজধানীতে ৪০টি ট্রাকে পেঁয়াজ বিক্রি শুরু করেছে টিসিবি। দাম বাড়ার খবরে দেশের বিভিন্ন স্থানে ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড় দেখা যাচ্ছে। অনেক ক্রেতাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকে ৩০ টাকায় পেঁয়াজ কিনতে দেখা গেছে। বাজারমূল্যের চেয়ে কম দামে পেঁয়াজ কিনতে পেরে সন্তুষ্টি জানিয়েছে ক্রেতারা। একজন ক্রেতা সর্বাধিক ২ কেজি পর্যন্ত পেঁয়াজ কিনতে পারছে। পেঁয়াজের সঙ্গে চিনি, মসুর ডাল ও সয়াবিন তেলও ভর্তুকি মূল্যে বিক্রি হচ্ছে বলেও জানিয়েছে টিসিবি।
এদিকে ভারতের রফতানি বন্ধের খবরে দেশের বৃহত্তম পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জেও পেঁয়াজের দাম বেড়েছে। খাতুনগঞ্জের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন স্থানের পেঁয়াজের বাজারও অস্থির। আমাদের ব্যুরো, প্রতিনিধি ও সংবাদদাতাদের পাঠানো খবরÑ
চট্টগ্রাম : ভারত পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ ঘোষণা করার সঙ্গে সঙ্গেই চাক্তাই-খাতুনগঞ্জে পেঁয়াজের পাইকারি বাজারে দাম বেড়ে গেছে। সোমবার সকালে ভারতীয় পেঁয়াজ বিক্রি হয় কেজি ৩৭-৪০ টাকা কেজি দরে। সন্ধ্যায় তা বেড়ে হয় ৪৫ টাকায়। মঙ্গলবার সেই পেঁয়াজ পাইকারি বিক্রি হয়েছে মানভেদে ৫০-৬০ টাকায়। একইভাবে খুচরা বাজারে ৫০-৫৫ টাকা থেকে বেড়ে মঙ্গলবার বিক্রি হয় ৭০-৮০ টাকা কেজি দরে। খুচরা বিক্রেতারা বেশি করে পেঁয়াজ কেনার জন্য চাক্তাই-খাতুনগঞ্জে ভিড় করে। ভোক্তাদের মধ্যেও আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। দাম আরও বেড়ে যাবে সে আশঙ্কায় বেশি করে কিনে রাখার প্রবণতা দেখা গেছে বিভিন্ন বাজারে। মঙ্গলবার টিসিবির ট্রাকে ক্রেতাদের ভিড় বেড়ে যায়। চাহিদার তুলনায় পেঁয়াজ কম থাকায় একজনকে ১ কেজির বেশি দেওয়া হয়নি।
পাবনা : তিনদিনের ব্যবধানে পেঁয়াজের বাজার এক লাফে মণপ্রতি হাজার টাকা বেড়েছে। গত সপ্তাহে পাবনার বিভিন্ন পাইকারি বাজার ও হাটে সবচেয়ে ভালো বাছাই করা পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ২ হাজার থেকে ২২শ’ টাকা মণ দরে। আর বর্তমানে সেই পেঁয়াজ ৩ হাজার থেকে ৩২শ’ টাকা মণ ধরে বিক্রি হচ্ছে। গত সপ্তাহে ১ কেজি পেঁয়াজ ৫০-৫৫ টাকায় পাওয়া গেছে আর বর্তমানে ৭৫-৮০ টাকায় খুচরা মূল্যে বিক্রি হচ্ছে বাজারগুলোতে। পাবনার বিভিন্ন পেঁয়াজের পাইকারি হাট ও বাজারের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পাশর্^বর্তী দেশ ভারতের পেঁয়াজ আমদানি বন্ধ হওয়ার কারণে দেশি পেঁয়াজের দামও বৃদ্ধি পেয়েছে।
বেলকুচি : বেলকুচিতে পেঁয়াজের বাজার মনিটরিং করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। মঙ্গলবার বেলকুচির প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত মুকুন্দগাতি বাজার মনিটরিং করেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। ভ্রাম্যমাণ আদালতের নেতৃত্ব দেন বেলকুচি উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট এসএম রবিন শিস।
রাজবাড়ী : রাজবাড়ীতে ১২ ঘণ্টার ব্যবধানে পেঁয়াজের দাম বেড়েছে কেজিপ্রতি ১৫ টাকা। সোমবার রাতেও রাজবাড়ীতে ৫৫-৬০ টাকা কেজি দরে পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে। রাতের মধ্যেই সোশ্যাল মিডিয়ায় ভারত পেঁয়াজ আমদানি বন্ধ করে দিয়েছে খবর ছড়িয়ে পড়লে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় বলে জানা গেছে।
বকশীগঞ্জ : জামালপুরের বকশীগঞ্জে পেঁয়াজের মূল্যবৃদ্ধিসহ নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি রুখতে মঙ্গলবার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও উপজেলা বাজার মনিটরিং কমিটির সভাপতি আ.স.ম. জামশেদ খোন্দকার পৌরশহরের কাঁচাবাজার, পেঁয়াজের বাজারসহ নিত্যপণ্যের বাজার পরিদর্শন করেন।
ভালুকা : ময়মনসিংহের ভালুকায় মোবাইল কোর্ট দেখে উপজেলার বাজারগুলোতে পেঁয়াজের দাম ৮০ টাকা থেকে ৬০ টাকায় নেমে আসে। মঙ্গলবার উপজেলার ভালুকা, সিডস্টোর, জামিরদিয়া বাজারসহ বেশ কয়েকটি বাজারে ইউএনও সালমা খাতুনের নেতৃত্বে নেত্যপণ্যের বাজারদর মনিটরিং করতে গেলে এ ঘটনা ঘটে। এ সময় দোকানে দ্রব্যমূল্যের তালিকা না থাকার কারণে দুই ব্যবসায়ীকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করেন ভ্রাম্যমাণ আদালত।
যশোর : যশোরে এক রাতের ব্যবধানে পেঁয়াজের দাম বেড়েছে কেজিপ্রতি ২৫-৩০ টাকা। একদিন আগে যে পেঁয়াজের দাম খুচরা বাজারে ছিল ৫৫-৬০ টাকা। এক রাতের ব্যবধানে তা এখন পাইকারি বাজারে বিক্রি হচ্ছে ৮৫-৯০ টাকায়। এ অবস্থায় ক্রেতাসাধারণ পড়েছে বেশ নাজুক অবস্থায়। কেউ কেউ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জানাচ্ছেন ক্ষোভ।
ঠাকুরগাঁও : ঠাকুরগাঁও পৌরশহরের কাঁচা বাড়ার আড়তে বেশি দামে পেঁয়াজ বিক্রির দায়ে এক ব্যবসায়ীকে জরিমানা করা হয়েছে। মঙ্গলবার সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আব্দুল্লাহ আল মামুন সেখানে অভিযান চালিয়ে এই জরিমানা করেন।
সাতক্ষীরা : সাতক্ষীরায় লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে পেঁয়াজের দাম। এক দিনের ব্যবধানে ভারতীয় ও দেশি পেঁয়াজের দাম কেজিপ্রতি ২০ টাকা বেড়েছে। গত রোববার দুপুর পর্যন্ত পাইকারি বাজারে প্রতিকেজি ভারতীয় পেঁয়াজ ৪০ ও খুচরা বাজারে ৪৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে। অন্যদিকে দেশি পেঁয়াজ পাইকারি বাজারে ৫৫ আর খুচরা বাজারে বিক্রি হয়েছে ৬০ টাকা কেজি দরে।

About the author

CrimeSearchBD

%d bloggers like this: