আন্তর্জাতিক

ইরান ও চীনের সম্পর্ক নিয়ে আতঙ্কিত ভারত!

Written by CrimeSearchBD

ইরানের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক নিয়ে আতঙ্কে রয়েছে ভারত। আর এ আতঙ্কে ভারতের দুই প্রভাবশালী মন্ত্রী সম্প্রতি ইরান সফর করেছেন। চীনের পাশাপাশি পাকিস্তানের সঙ্গেও ইরানের সম্পর্ক নিয়ে মাথাব্যথা ভারতের। তাই দেশটির দুই মন্ত্রী তেহরান সফর করেছেন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

বিবিসি বাংলার খবরে বলা হয়, গত সপ্তাহে ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর অনেকটা নীরবেই তেহরানে গিয়ে থেকেছেন। এর মধ্যে রাজনাথ সিং তেহরানে নামেন মস্কোতে সাংহাই সহযোগিতা জোটের বৈঠকে যোগ দিতে যাওযার পথে। আর জয়শঙ্কর মস্কো থেকে ফেরার পথে গত মঙ্গলবার তেহরানে সারাদিন কাটিয়েছেন। ভারতের পক্ষ থেকে দুই মন্ত্রীর তেহরানে যাওয়াকে রিফুয়েলিং অর্থাৎ বিমানে তেল ভরার যুক্তি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে- ভারতের দুই মন্ত্রী সেই তেল দুবাই বা আবুধাবিতে না ভরে তেহরান থেকে কেন ভরলেন? বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ভারতের চিরশত্রু চীন এবং পাকিস্তানের সঙ্গে ইরান যেভাবে ঘনিষ্ঠ হচ্ছে তাতে ভারত চরম উদ্বিগ্ন।

দিল্লির জওহারলাল নেহেরু ইউনিভার্সিটির (জেএনইউ) আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক সঞ্জয় ভরদোয়াজ বলেন, ‘চীনের সঙ্গে ইরানের অর্থনৈতিক এবং কৌশলগত যে সম্পর্ক তৈরি হচ্ছে, তা নিয়ে ভারতের মাথাব্যথা বাড়ছে। ভারতের কাছে ইরানের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং কৌশলগত গুরুত্ব অপরিসীম। ভারত কোনোভাবেই তা খোয়াতে চায় না।’

ভারতের কাছে ইরান কেন গুরুত্বপূর্ণ?

অধ্যাপক সঞ্জয় ভরদোয়াজ বলেন, ‘আফগানিস্তান এবং মধ্য এশিয়ার বাজারে ঢোকার জন্য ভারতের কাছে ইরানের গুরুত্ব বিশাল। সে কারণেই ইরানের চাবাহার বন্দরের উন্নয়নে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত হয়েছিল ভারত। জ্বালানির জন্য এবং কাশ্মীর ইস্যুতে ইরানের মতো প্রভাবশালী একটি মুসলিম দেশের কাছ থেকে রাজনৈতিক সমর্থনের জন্য ভারত উদগ্রীব।’

তবে এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যে দ্রুত পরিবর্তনশীল ভূ-রাজনীতিতে ভারত ও ইরান যে ভিন্ন দুই মেরুতে অবস্থান নিয়েছে তা স্পষ্ট। বিশেষ ভারতের সবচেয়ে বড় শত্রু দেশ চীনের সঙ্গে ইরানের যে ব্যাপক অর্থনৈতিক এবং কৌশলগত ঘনিষ্ঠতা তৈরি হচ্ছে, তা ভারতের জন্য দুঃস্বপ্ন।

আর ইরান ও ভারতের মধ্যে দূরত্ব একদিনে তৈরি হয়নি। গত ১৫ বছরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা যত বেড়েছে, ইরানের সঙ্গে ততই দূরত্ব বেড়েছে। সেই শূন্যতায় ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়িয়েছে চীন।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ খোমেনি। পুরোনো ছবি
চীন ও ইরানের চুক্তি

চীন এবং ইরান তাদের মধ্যে ২৫ বছরের একটি ‘কৌশলগত সহযোগিতা’ চুক্তি নিয়ে বোঝাপড়া চূড়ান্ত করে ফেলেছে বলে জানা গেছে। নির্ভরযোগ্য বিভিন্ন সূত্রে প্রকাশিত নানা তথ্যের ভিত্তিতে জানা গেছে এই চুক্তিতে ইরানের তেল-গ্যাস, ব্যাংকিং, টেলিকম, বন্দর উন্নয়ন, রেলওয়ে উন্নয়ন এবং আরও কয়েক ডজন খানেক গুরুত্বপূর্ণ খাতে চীন আগামী ২৫ বছরে কমপক্ষে ৪০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে।

ইরানের গুরুত্বপূর্ণ যে বন্দরটির উন্নয়ন ভারতের হাতে শুরু হয়েছে সেই চাবাহার বন্দরের সম্প্রসারণ এবং ওই বন্দরের সঙ্গে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন শহরের রেল যোগাযোগের কাজ এখন চীনের হাতে তুলে দেওয়ার কথা সরকারিভাবে ঘোষণা করেছে ইরান। শুধু তাই নয়, জানা গেছে চীন এখন চাবাহার বন্দরটিকে চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোরের (সিপেক) অংশ করতে উদগ্রীব।

ভারতের সাবেক কূটনীতিক রাকেশ সুদ বলেন, ‘মূলত যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার আশঙ্কায় চাবাহার বন্দর উন্নয়নে প্রতিশ্রুতি পূরণে ভারতের গড়িমসিতে ইরান ক্ষুব্ধ। সেই সঙ্গে যোগ হয়েছে এশিয়ায় জোট রাজনীতির আমূল পরিবর্তনের প্রভাব।’

তিনি বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে রাশিয়া এবং চীনের দৃষ্টিভঙ্গি এখন একইরকম। তাদের সাথে যুক্ত হয়েছে পাকিস্তান, ইরান এবং তুরস্ক। অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে যে সব দেশের সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠতা তৈরি হচ্ছে- ইউএই এবং সৌদি আরব, তারা ইরানের বড় শত্রু।’

নতুন বন্ধুত্বে পাকিস্তান ও ইরান

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা বলছেন,চীনের আগ্রহে পাকিস্তানের সঙ্গে ইরানের সম্পর্কে যেভাবে ঘনিষ্ঠতা তৈরি হচ্ছে তা ভারতের জন্য বাড়তি মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ, ভবিষ্যতে আফগানিস্তানে ভারত তাদের প্রভাব কতটা ধরে রাখতে পারবে তা অনেকটাই নির্ভর করছে ইরান-পাকিস্তান সম্পর্কের ওপর।

গত মাসের শেষ সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণা প্রতিষ্ঠান উড্রো উইলসন সেন্টারের আয়োজনে পাকিস্তান নিয়ে এক অনলাইন আলোচনায় সেদেশের প্রখ্যাত নিরাপত্তা বিশ্লেষক আয়েশা সিদ্দিকা বলেন, ‘প্রধানত অর্থনৈতিক স্বার্থে ইরানের সঙ্গে নতুন সম্পর্ক স্থাপন নিয়ে পাকিস্তানের আগ্রহ বাড়ছে।’

তিনি বলেন, ‘সৌদি আরব দক্ষিণ এশিয়ায় তাদের স্বার্থকে নতুন করে পর্যালোচনা করছে এবং পাকিস্তানের চাইতে ভারত তাদের কাছে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। সেই সঙ্গে ইরান এখন পাকিস্তানের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।’ এখন অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, ভারত কি তাদের একসময়কার ঘনিষ্ঠ এবং গুরুত্বপূর্ণ বন্ধু দেশ ইরানকে একেবারেই হারিয়ে ফেলছে?

যে কারণে ভারতের দুই মন্ত্রী তেহরানে

অধ্যাপক সঞ্জয় ভরদোয়াজ বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র নাখোশ হবে তা জেনেও দুজন প্রভাবশালী মন্ত্রীকে তেহরানে পাঠিয়ে ভারত বোঝাতে চেয়েছে যে ইরানের সঙ্গে সম্পর্ককে তারা কতটা গুরুত্ব দিচ্ছে। ভারত বার্তা দিতে চাইছে যে- পররাষ্ট্র নীতি এবং কৌশলগত সম্পর্কের ক্ষেত্রে দিল্লীর নীতি এখনো স্বাধীন। এ ব্যাপারে তারা আপোষহীন।’

তিনি বলেন, ‘ভারতের মতো বড় একটি বাজার সবসময়েই ইরানের জন্য লোভনীয় এবং ইরান নিশ্চয়ই জানে যে তাদের জ্বালানি তেলের পুরোটাই চীন কিনবে না।’ যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের রেষারেষিকে কেন্দ্র করে এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে যে দলাদলি শুরু হয়েছে তাতে ভারত-ইরান সম্পর্ক যে বলি হচ্ছে, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।

About the author

CrimeSearchBD

%d bloggers like this: