আইন-আদালত

আবরার হত্যা মামলার বিচার শুরু

Written by CrimeSearchBD

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ^বিদ্যালয়ের (বুয়েট) মেধাবী ছাত্র আবরার ফাহাদ রাব্বীকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগে করা মামলায় ২৫ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দিয়েছেন আদালত।
মঙ্গলবার এ মামলায় অভিযোগ গঠনের আদেশের জন্য দিন ধার্য ছিল। এদিন দুপুর ১২টা ৫ মিনিটে ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১-এর বিচার আবু জাফর মো. কামরুজ্জামান এজলাসে হাজির হয়ে আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ পড়ে শোনান। এ সময় বিচারক তাদের বলেন, আপনাদের বিরুদ্ধে এ মামলায় অভিযোগ গঠন করা হলো। আপনারা দোষী নাকি নির্দোষ? তখন আসামিরা নিজেদের নির্দোষ দাবি করে আদালতের কাছে ন্যায় বিচার প্রার্থনা করেন। এরপর আদালত তাদের পক্ষে দাখিলকৃত অব্যাহতির আবেদন নাকচ করে বিচার শুরুর আদেশ প্রদান করেন। একই সঙ্গে আদালত সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য আগামী ২০ সেপ্টেম্বর থেকে ১ অক্টোবর পর্যন্ত (সরকারি ছুটির দিন ব্যতীত) দিন ধার্য করেন।
এর আগে ২ ও ৯ সেপ্টেম্বর দুই দফায় কারাগারে থাকা এ মামলার ২২ আসামির পক্ষে নিয়োজিত আইনজীবী মো. মুনজুর আলম, আজিজুর রহমান দুলু, রেজাউল করিম ও ফারুক আহম্মেদসহ আইনজীবীরা মামলার দায় থেকে অব্যাহতির আবেদন করে শুনানি করেন। অন্যদিকে রাষ্ট্র পক্ষে বিশেষ পিপি মোশারফ হোসেন কাজল এ আবেদনের বিরোধিতা করে অভিযোগ গঠনের পক্ষে শুনানি করেন। ওই দিন শুনানি শেষে আদালত অভিযোগ গঠনের বিষয়ে আদেশের জন্য এদিন দিন ধার্য করেন। এদিন অভিযোগ গঠনের আদেশের দিন থাকায় কারাগারে থাকা ২২ আসামিকে আদালতে হাজির করা হয়।
আসামিরা হলোÑ বুয়েট ছাত্রলীগের বহিষ্কৃত সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান রাসেল, বহিষ্কৃত সহসভাপতি মুহতাসিম ফুয়াদ, বহিষ্কৃত সাংগঠনিক সম্পাদক মেহেদী হাসান রবিন, বহিষ্কৃত তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক অনিক সরকার, বহিষ্কৃত ক্রীড়া সম্পাদক মেফতাহুল ইসলাম জিয়ন, বহিষ্কৃত উপ-সমাজসেবা সম্পাদক ইফতি মোশাররফ সকাল, বহিষ্কৃত সদস্য মুনতাসির আল জেমি, মোজাহিদুর রহমান, খন্দকার তাবাখখারুল ইসলাম তানভির, ইসতিয়াক হাসান মুন্না, মিজানুর রহমান, শামসুল আরেফিন রাফাত, মনিরুজ্জামান মনির ও আকাশ হোসেন, বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের বহিষ্কৃত উপআইন সম্পাদক অমিত সাহা, হোসেন মোহাম্মদ তোহা, মাজেদুর রহমান, শামীম বিল্লাহ ও মোয়াজ আবু হোরায়রা, এএসএম নাজমুস সাদাত, এসএম মাহমুদ সেতু। এ ছাড়া মামলার শুরু থেকে তিন আসামি পলাতক রয়েছে।
পলাতক আসামিরা হলোÑ ইলেকট্রিক অ্যান্ড ইলেকট্রনিক্স বিভাগের ১৬তম ব্যাচের ছাত্র মাহমুদুল জিসান, সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ১৭তম ব্যাচের এহতেশামুল রাব্বি ওরফে তানিম ও কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ১৬তম ব্যাচের মুজতবা রাফিদ। আসামিদের মধ্যে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে আটজন।
গত ১৫ মার্চ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ থেকে মামলাটি ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১ এ স্থানান্তর করে আদেশ জারি হয়। দ্রুত বিচার আইনে যেকোনো মামলা ৯০ কার্যদিবসের মধ্যে নিষ্পত্তি করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ওই সময়ের মধ্যে নিষ্পত্তি করা না গেলে আরও ৪৫ দিন সময় নিতে পারে আদালত।
গত বছরের ১৩ নভেম্বর মামলার তদন্ত কর্মকর্তা গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক ওয়াহেদুজ্জামান ঘটনার ৩৭ দিনের মাথায় ২৫ জনকে অভিযুক্ত করে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়, ক্রিকেট স্টাম্প, মোটা দড়ি দিয়ে নির্যাতন করার একপর্যায়ে আবরার ফাহাদ বমি ও প্রস্রাব করে ফেলেন। এরপর তাকে হলের বাথরুমে নিয়ে যাওয়া হয়। বদলানো হয় তার জামাকাপড়। অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়, আবরার ফাহাদকে ২০০৫ নম্বর কক্ষে নেওয়ার পর ইফতি মোশাররফ অন্যদের বলেন, ‘তোরা এবার আবরারের কাছ থেকে তথ্য বের কর। বুয়েটে কে কে শিবির করে।’ তখন মোয়াজ আবু হোরায়রা ও অমর্ত্য ইসলাম আবরারের মুমূর্ষু অবস্থা দেখে মেহেদি হাসান রবিনকে বলেন, ‘আবরারকে হাসপাতালে নিতে হবে।’ এই কথা শোনার পর মেহেদি হাসান রবিন বলেন, ‘ও নাটক করছে। শিবির চেনস না। শিবির চেনা কষ্ট।’ রাত আড়াইটার সময় ইফতি মোশাররফ, মুজাহিদ, তাবাখখারুল ও তোহা মিলে আবরারকে তোশকে করে হলের দোতলার সিঁড়িতে রাখেন। এরপর আসামিরা বুয়েটের চিকিৎসক ও অ্যাম্বুলেন্স ডেকে আনেন। চিকিৎসক আবরারের দেহ পরীক্ষা করে ঘোষণা দেন তিনি মারা গেছেন।
আবরারকে হত্যার পর ক্রিকেট স্টাম্প, তোশক, বালিশ, আবরারের ল্যাপটপ, চাপাতি হলের ২০১১ নম্বর কক্ষ থেকে বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের সহসভাপতি মুহতাসিম ফুয়াদের কক্ষে রাখা হয়। বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি মেহেদী হাসান রাসেল ও সহসভাপতি মুহতাসিম ফুয়াদ ওই হত্যাকাণ্ডের বিভিন্ন দিকনির্দেশনা দিয়ে অপরাধ ঘটাতে সার্বিক সহায়তা করেন। আবরারের মৃতদেহ হলের নিচে নামানোর পর তড়িঘড়ি করে সেখান থেকে সরিয়ে ফেলার জন্য মেহেদী হাসান ওরফে রাসেল বুয়েটের চিকিৎসকের ওপর চাপ সৃষ্টি করেন। অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়, পরস্পর যোগসাজশে পরস্পরের সহায়তায় ছাত্রশিবির সন্দেহে আবরারের বিরুদ্ধে মিথ্যা, বানোয়াট, ভিত্তিহীন অভিযোগ এনে নির্মমভাবে পিটিয়ে তাকে হত্যা করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, একটি ফেসবুক স্ট্যাটাসকে কেন্দ্র করে গত বছরের ৬ অক্টোবর গভীর রাতে বুয়েটের তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে ডেকে নিয়ে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা তাকে বেধড়ক পিটিয়ে হত্যা করে। এ অভিযোগে ৭ অক্টোবর আবরারের বাবা বরকত উল্লাহ বাদী হয়ে ১৯ জনকে আসামি করে চকবাজার থানায় হত্যা মামলা করেন।

About the author

CrimeSearchBD

%d bloggers like this: