সারাদেশ

অরক্ষিত ২ হাজার রেল ক্রসিং

Written by CrimeSearchBD

রেলওয়েতে মোট ২ হাজার ৮৫৬টি ক্রসিংয়ের মধ্যে অনুমোদন নেই ১ হাজার ৩৬১টির। ১ হাজার ৪৯৫টি বৈধ ক্রসিংয়ের মধ্যে প্রায় ৬৩২টিতে গেটকিপার নেই। বৈধ-অবৈধ মিলিয়ে প্রায় দুই হাজার রেল ক্রসিং অরক্ষিত থাকায় প্রায়ই ঘটছে প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা। রেলপথ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, অবৈধ ক্রসিংয়ের বেশিরভাগই তৈরি হয়েছে এলজিইডি, পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদ, সিটি করপোরেশন এবং সড়ক ও জনপথ বিভাগের রাস্তার কারণে। ২০০৮-২০১৯ এই ১১ বছরে লেভেল ক্রসিংগুলোয় ৩১০টি দুর্ঘটনায় ২৮১ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ১৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত ১০টি দুর্ঘটনায় ২৫ জন মারা গেছেন। এ নিয়ে ১২ বছরে মারা গেছে ৩০৬ জন।
সর্বশেষ শনিবার সকালে জয়পুরহাট সদরের পুরানাপৈল রেলগেট এলাকায় বাস ও ট্রেনের সংঘর্ষে ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর আগে ১৬ অক্টোবর যশোরের অভয়নগর এলাকায় একটি অবৈধ লেভেল ক্রসিংয়ে ট্রেনের সঙ্গে প্রাইভেট কারের ধাক্কায় পাঁচজনের মৃত্যু হয়। কিন্তু ক্রসিংগুলোয় দুর্ঘটনা বন্ধে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের কার্যকর কোনো উদ্যোগ না থাকায় একদিকে ট্রেন ও অন্যান্য যানবাহনের যেমন ক্ষতি হচ্ছে, অন্যদিকে কাক্সিক্ষত গতিতে চলতে পারছে না ট্রেন। রেল সংশ্লিষ্টরা জানান, বিগত এক যুগে রেলওয়েতে প্রায় ১ লাখ ৬৩ হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হলেও লেভেল ক্রসিংগুলো নিরাপদ করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি।
রেলের একাধিক কর্মকর্তা জানান, বছরের পর বছর রেলে অবৈধ লেভেল ক্রসিংগুলো মরণফাঁদ হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। এসব অবৈধ ক্রসিংয়ে প্রায়ই বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটছে। দুর্ঘটনায় শুধু প্রাণহানি নয়, রেলপথ ও ট্রেনেরও ভয়াবহ ক্ষতি হচ্ছে। পূর্বাঞ্চল রেলে মোট ১ হাজার ৩৭৭টি লেভেল ক্রসিং রয়েছে, যার মধ্যে ৮১১টি অবৈধ। অবৈধ ক্রসিংয়ের জন্য ট্রেনের যথাযথ গতি ওঠানোও সম্ভব হয় না। কোনো কোনো এলাকায় এক কিলোমিটার রেলপথের মধ্যেই একাধিক অবৈধ লেভেল ক্রসিং রয়েছে। বৈধগুলোর জন্য পর্যাপ্ত গেটম্যান দেওয়া হয়নি। তা ছাড়া সর্বোচ্চ পর্যায়ের নির্দেশনা ছাড়া অবৈধ ক্রসিংগুলো বন্ধও করা যাচ্ছে না। ফলে চরম ঝুঁঁকি নিয়েই ট্রেন চালাতে হয়।
পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের মোট ১ হাজার ৪৭৯টি লেভেল ক্রসিং রয়েছে। এর মধ্যে ৫৫০টি অবৈধ। নারায়ণগঞ্জ থেকে টঙ্গী পর্যন্ত ৩৯টি লেভেল ক্রসিং রয়েছে। এর মধ্যে ২৬টি সম্পূর্ণ অবৈধ। বৈধ ক্রসিংগুলো আন্ডারপাস কিংবা ওভারপাস করার জন্য দেড় যুগ আগে উদ্যোগ নেওয়া হলেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি। শুধু অবৈধ ক্রসিংগুলোয়ই নয়, দায়িত্বে অবহেলার কারণে বিভিন্ন সময় বৈধ ক্রসিংগুলোতেও বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রেলওয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানান, ২০১৫ সালে লেভেল ক্রসিং উন্নয়ন ও অস্থায়ী গেটম্যান নিয়োগ প্রকল্পের আওতায় ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। প্রকল্পটির মেয়াদ আগামী বছর শেষ হওয়ার কথা। এ বরাদ্দ থেকে দুই অঞ্চলে অস্থায়ী প্রায় ১৬শ গেটম্যানের বেতন বাবদ ৬৪ কোটি টাকা চলে গেছে। বাকি ৩৬ কোটি টাকা দিয়ে কোনোমতে বৈধ ক্রসিংগুলোর মাত্র ২৬ শতাংশ রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়েছে। ১৯৮৪ সালের পর থেকে রেলে কোনো স্থায়ী গেটম্যান নিয়োগ দেওয়া হয়নি। ২০১৮ সালে ১০০০ স্থায়ী গেটম্যান নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হলেও বর্তমানে রেলের নিয়োগবিধি জটিলতার কারণে দুই বছর ধরে সবধরনের নিয়োগ বন্ধ রয়েছে। বর্তমানে ১ হাজার ৫৯০ জন গেটম্যান অস্থায়ী ভিত্তিতে কাজ করছেন।
রেল সূত্রে জানা যায়, ক্রসিংগুলোয় কর্মরত ৭৫ শতাংশ লোকই দৈনিক মজুরিতে চাকরি করছেন বছরের পর বছর ধরে। চাকরি স্থায়ী না হওয়ায় গেটম্যানদের মধ্যেও চরম হতাশা কাজ করায় তারাও ঠিকমতো দায়িত্ব পালন করেন না। দৈনিক মজুরির মাধ্যমে অস্থায়ী ভিত্তিতে সাধারণ লোক দিয়ে কাজ করালে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা লাভবান হন। এ কারণে স্থায়ী গেটম্যান নিয়োগে আগ্রহ কম। অভিযোগ রয়েছে, অস্থায়ী ভিত্তিতে নিয়োগপ্রাপ্ত গেটম্যানরা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত না হওয়ায় তারা বিভিন্ন সময় ঘুমিয়ে পড়ে। এতে ক্রসিংগুলোয় দুর্ঘটনা ঘটে।
নৌ, সড়ক ও রেলপথ রক্ষা জাতীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক আশীষ কুমার দে বলেন, সড়ক যোগাযোগের স্বার্থে বিভিন্ন স্থানে অননুমোদিত ও অপরিকল্পিত রেল ক্রসিং নির্মাণ এবং অধিকাংশ রেল ক্রসিংয়ে নিজস্ব পাহারাদার না থাকায় দুর্ঘটনা বাড়ছে। রাজধানীসহ বিভিন্ন শহরের ভেতরে থাকা ক্রসিংগুলোর ওপর কিংবা নিচ দিয়ে যান চলাচলের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হলে দুর্ঘটনা এড়ানোর পাশাপাশি যানজট কমে আসত। তিনি বলেন, রেলে হাজার হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে; কিন্তু কেন লেভেল ক্রসিংগুলোর উন্নয়নে যথাযথ প্রকল্প গ্রহণ করা হচ্ছে না এটা রহস্যজনক। তিনি আরও বলেন, যেসব প্রতিষ্ঠান অবৈধ ক্রসিং নির্মাণ করেছে, তাদের বিরুদ্ধে সরকারের সর্বোচ্চ সংস্থা থেকে নির্দেশনা আসতে হবে। তা না হলে রেলের অবৈধ লেভেল ক্রসিং বন্ধ হবে না, বরং দিন দিন আরও বাড়বে।
অবৈধ ক্রসিংয়ের দায়দায়িত্ব রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের নয় জানিয়ে রেলওয়ে মহাপরিচালক মো. শামছুজ্জামান বলেন, যারা এসব নির্মাণ করেছে, তাদের বারবার চিঠি দিয়ে বন্ধ করতে বলা হয়েছে। কিংবা যথাযথ ব্যবস্থায় আন্ডারপাস বা ওভারপাস করতে বলা হলেও নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এতে কান দিচ্ছে না। রেল ক্রসিংয়ে স্থায়ী গেটম্যান নিয়োগে পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
রেলপথমন্ত্রী মো. নূরুল ইসলাম সুজন বলেন, ক্রসিংয়ে দুর্ঘটনার জন্য দায়ী যান চালকসহ সাধারণ মানুষই। যেসব প্রতিষ্ঠান রেলপথ মন্ত্রণালয়ের কোনো অনুমোদন না নিয়ে অবৈধ লেভেল ক্রসিং নির্মাণ করছে, দুর্ঘটনার জন্য তারাই দায়ী। কীভাবে এ থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যায়, কীভাবে রেলপথকে নিরাপদ করা যায় সে বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহণ করছি। এখন যেসব নতুন রেলপথ করা হচ্ছে, সেগুলোয় লেভেল ক্রসিং এড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তা ছাড়া বৈধ ক্রসিংগুলোর মানোন্নয়ন নিশ্চিত করাসহ অবৈধ ক্রসিংগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা চলছে।

About the author

CrimeSearchBD

%d bloggers like this: