সারাদেশ

অভিযোগের পাহাড়

Written by CrimeSearchBD

হঠাৎ করেই মোবাইল ব্যালেন্স থেকে গায়েব হয়ে যাচ্ছে টাকা। কখনও ৫০ টাকা, কখনও ২০ টাকা আবার কখনও ১০-১৫ টাকা। গ্রাহক জানতেই পারছে না কী কারণে তার ব্যালেন্স থেকে টাকা গায়েব হচ্ছে। এভাবে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে মোবাইল ফোন কোম্পানিগুলো। তা ছাড়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সেবা না দেওয়া, সময়ে-অসময়ে অপ্রয়োজনীয় মেসেজ ও ফোন কল দেওয়া, হঠাৎ করেই কল দিয়ে গান শোনানোসহ নানা রকম হয়রানি ও প্রতারণার শিকার হন মোবাইল ফোন গ্রাহকরা। অথচ মিলছে না কোনো প্রতিকার।
ভোক্তা হয়রানি হলে তা প্রতিকার বা সমাধানের দায়িত্ব জাতীয় ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদফতরের। হয়রানির শিকার মোবাইল গ্রাহকরা ছুটে যাচ্ছেনও ভোক্তা অধিদফতরে। ২০১৭ সালের মে মাস থেকে বুধবার পর্যন্ত ভোক্তা অধিদফতরে মোবাইল ফোন কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে ভুক্তভোগীরা অভিযোগ জানিয়েছেন ২ হাজার ৮৯২টি। কিন্তু একটি অভিযোগেরও সুরাহা করতে পারেনি অধিদফতর। কারণ আইনি বাধা। ২০১৭ সালের ২৭ মে পর্যন্ত ভুক্তভোগীর অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে অধিদফতর মোবাইল কোম্পানিগুলোকে ১০ লাখ টাকারও বেশি জরিমানা করে। এর মধ্যে এক গ্রাহকের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে রবিকে জরিমানা করা হয় ৪ লাখ ১০ হাজার টাকা। আইন অনুযায়ী অভিযোগ প্রমাণিত হলে অভিযোগকারী পান জরিমানাকৃত অর্থের ২৫ ভাগ। সে হিসাবে রবির বিরুদ্ধে ওই অভিযোগকারী পেয়েছিলেন ১ লাখ ২ হাজার ৫০০ টাকা। এরপরই রবি কর্তৃপক্ষ হাইকোর্ট বিভাগে একটি রিট পিটিশন করে ২০১৭ সালের মে মাসে (রিট পিটিশন নং- ৬৮৯৫/২০১৭)। ওই রিটের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট বিভাগ রবিসহ সব টেলিকম কোম্পানি সম্পর্কিত ভোক্তাদের অভিযোগ নিষ্পত্তিতে প্রয়োগকৃত জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন ২০০৯-এর ৭০ ধারা আট সপ্তাহের জন্য স্থগিত করেন, যা এখনও ঝুলে রয়েছে। ফলে বেসরকারি মোবাইল সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানÑ গ্রামীণ, রবি, বাংলালিংক, এয়ারটেল ছাড়াও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান টেলিটক ইচ্ছেমতো হয়রানি ও প্রতারণা করছে গ্রাহকদের সঙ্গে।
এমনই এক ভুক্তভোগী বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ একটি অধিদফতরের উপপরিচালক (উপসচিব)। নাম প্রকাশ না করার শর্তে সময়ের আলোকে তিনি বলেন, ‘আমার ‘রবি’ মোবাইল নম্বরÑ০১৮১…..৭৩০ থেকে দিন দশেক আগে হঠাৎ করেই দেখি ৫০ টাকা নাই। অথচ আমি কারও সঙ্গে কথাও বলিনি। আমি সঙ্গে সঙ্গে রবির কাস্টমার কেয়ারে ফোন দিলাম। আমার মোবাইল ব্যালেন্স থেকে কেন ৫০ টাকা কেটে নেওয়া হলো জানতে চাইলাম। ওপার থেকে এক নারী কণ্ঠে আমাকে লাইনে থাকতে বলা হলো। প্রায় দেড় মিনিট লাইনে থাকার পর আমাকে জানানো হলোÑ‘স্যার আপনি রবির ১২টি সেবা গ্রহণ করছেন। তার চার্জ হিসাবে ৫০ টাকা কেটে নেওয়া হয়েছে।’ আমি তখন তাকে বললাম আমি তো ফোন কল ও ইন্টারনেট সেবা ছাড়া আর কোনো সেবা নিই না। আর ইন্টারনেটের জন্য তো যখন যতটুকু মেগাবাইট কেনার দরকার সেটি কিনি। তাহলে আর কোন সেবার জন্য আমার ৫০ টাকা কাটা হলো? জানতে চাইলে তিনি সঠিক কোনো জবাব না দিয়ে ফোন রেখে দেন। এভাবে মাঝেমধ্যেই আমার মোবাইল ব্যালেন্স থেকে টাকা কেটে নিচ্ছে রবি কর্তৃপক্ষ। অথচ কোনো প্রতিকার মিলছে না।’
শুধু যে রবি প্রতারণা করছে তেমনটি নয়। একজন গণমাধ্যমকর্মী ব্যবহার করেন বাংলালিংকের মোবাইল ফোন। ০১৯২২……৩৩৭Ñএই নম্বরে গত তিন মাসে তিন দফায় ৮৪ টাকা কেটে নিয়েছে বাংলালিংক কর্তৃপক্ষ। অথচ কী কারণে কেটে নেওয়া হলো তিনি তা জানতে পারেননি। ব্যালেন্স শেষ হওয়ার পর ১০০ টাকা রিচার্জ করলেই দেখা যায় হঠাৎ করে ২০ টাকা নাই। আবার কখনও ৩৪ টাকা নাই। এভাবে দফায় দফায় কোনো কারণ ছাড়াই ব্যালেন্স থেকে টাকা কাটতেই আছে।
সময়ের আলোকে তিনি বলেন, ‘এভাবে হঠাৎ টাকা গায়েব হয়ে যাওয়ায় বাংলালিংকের প্রতি আমি বিরক্ত। ফোন করে টাকা কেটে নেওয়ার কারণ জানতে চাইলে দেখা যাবে আমার আরও ৫ মিনিট ১০ থেকে ১২ টাকা খেয়ে নেবে। তাই বিরক্ত হয়ে আমি আমার বাংলালিংক নম্বরটি বন্ধ করে রেখেছি। কারণ রিচার্জ করলেই টাকা খেয়ে ফেলছে। ওই গণমাধ্যমকর্মী বলেন, বাংলালিংকের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানাতে ভোক্তা অধিদফতরে গেলে তারাও এ বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নিতে নিরুপায় বলে জানায়। কারণ এ বিষয়ে আদালতের স্থগিতাদেশ রয়েছে। তিনি হতাশ হয়ে ফিরে আসেন ভোক্তা অধিদফতর থেকে।
গ্রামীণফোনের এক গ্রাহক অভিযোগ করেন, সময় নেই, অসময় নেই যখন-তখন গ্রামীণ ফোন থেকে মেসেজ দেওয়া হয়, ফোন কল দেওয়া হয়।
আরিফ হোসেন নামের এই গ্রাহক বলেন, এক দিন মাগরিবের নামাজে দাঁড়িয়েছি, ফোনটি বন্ধ করতে মনে নেই হঠাৎ রিংটন বেজে উঠেছে, আমি বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে যাই। তা ছাড়া দেখা যাচ্ছে অফিসে গুরুত্বপূর্ণ মিটিংয়ে আছি হঠাৎ রিং বেজে উঠল। রিসিভ করলেই দেখা যাচ্ছে মমতাজের গান শোনানো হচ্ছে। এভাবে তো মোবাইল ফোন কোম্পানিগুলো গ্রাহকে হয়রানি করছে। তাদের কাছ থেকে এ বিষয়ে আমরা আরও ভালো সেবা আশা করি।
এ বিষয়ে কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান সময়ের আলোকে বলেন, মোবাইল ফোন কোম্পানিগুলোর দ্বারা প্রতিদিন লাখ লাখ গ্রাহক প্রতারিত হচ্ছে এতে কোনো সন্দেহ নেই। তারা অনেকটা দিনে-দুপুরে ডাকাতির মতো কাজ করছে। অথচ ভোক্তা কোনো প্রতিকার পাচ্ছে না, চুরি করেও শাস্তি পাচ্ছে না মোবাইল ফোন কোম্পানিগুলো। কারণ এ বিষয়ে উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ রয়েছে। তা ছাড়া ভোক্তা অধিদফতরের বিদ্যমান আইন অনুযায়ী মোবাইল ফোন কোম্পানিগুলোকে বড় শাস্তি দেওয়া যায় না। এ জন্য আদালত অধিদফতরকে নতুন বিধিমালা জারি করতে বলেছে। নতুন বিধিমালা এলে এবং আদালতের স্থগিতাদেশ উঠে গেলে হয়তো প্রতারিত হওয়া ভোক্তারা প্রতিকার পাবেন। তা ছাড়া এ বিষয়ে বড় শাস্তি দিতে হলে বিটিআরসিকে কঠোর হতে হবে এবং তাদের আইন দ্বারাই বড় শাস্তি দেওয়া সম্ভব।
বিষয়টি নিয়ে ভোক্তার পক্ষে আইনি লড়াই লড়ছে ক্যাব। আর ক্যাবের পক্ষে আইনজীবী হিসেবে লড়ছেন ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া।
বুধবার সময়ের আলোকে বলেন, দীর্ঘ তিন বছর ধরে ঝুলে থাকা বিষয়টি হয়তো আর অল্প দিনের মধ্যেই একটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের দিকে যাচ্ছে। কারণ আদালত ভোক্তা অধিদফতরকে বিধি সংশোধনের আদেশ দিয়েছিলেন। আমার জানা মতে গত ৪ নভেম্বর ভোক্তা অধিদফতর বিধি সংশোধন করে সেটি তাদের ওয়েবসাইটে দিয়েছে। যেহেতু আদালত রবির রিটের পরিপ্রেক্ষিতে বিধি সংশোধনের কথা বলেছিল এবং বিধি সংশোধন হয়ে গেছে সেহেতু এ মামলা নিষ্পত্তি হওয়া এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। আশা করি, আর মাত্র একটি শুনানিতেই এ মামলা নিষ্পত্তি হয়ে যাবে। গত ১ নভেম্বর বিষয়ে শুনানির দিন ধার্য ছিল হাইকোর্টে, কিন্তু সেদিন বিবাদী অর্থাৎ রবির আইনজীবী উপস্থিত না হওয়ায় সেদিন শুনানি হয়নি। আদালত আগামী ৬ ডিসেম্বর পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করেছে। এদিন আমরা ভোক্তা অধিদফতরের সংশোধিত বিধি আদালতে উপস্থাপন করলেই বিজ্ঞ বিচারক বিষয়টি আমলে নিয়ে রবির রিট খারিজ করে দেবেন বলে আমরা আশা করছি। আর সেটি হলে তখন আর মোবাইল কোম্পানিগুলোর ভোক্তা হয়রানি ও প্রতারণার বিরুদ্ধে অধিদফতরের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে কোনো বাধা থাকবে না।
ভোক্তার নানা অভিযোগ ও প্রতিকার না পাওয়ার বিষয়ে জাতীয় ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদফতরের মহাপরিচালক বাবলু কুমার সাহার সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি বিষয়টি আদালতের এখতিয়ার হওয়ায় এ বিষয়ে কোনো কথা বলতে চাননি।
তার অফিসে বেশ কয়েকবার গিয়ে এবং তার মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করার পরেও তিনি কোনো কথা বলেননি। তা ছাড়া গ্রাহক হয়রানির বিষয়ে রবির সিইও এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহতাব উদ্দিন আহমেদের মোবাইলে বেশ কয়েকবার ফোন দেওয়া হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। তাই এ বিষয়ে তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
অন্যদিকে মোবাইল অপারেটরদের বিরুদ্ধে গ্রাহক অভিযোগ সুরাহায় বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) একটি কল সেন্টার (১০০) রয়েছে। এ ছাড়া লিখিতভাবে অভিযোগ জানানোরও সুযোগ আছে। তবে গ্রাহকের সমস্যা সমাধানে বিটিআরসি অনেকটাই উদাসীন বলে অভিযোগ গ্রাহকদের। বিটিআরসিও স্বীকার করছে, সিম বার, নেটওয়ার্ক বিস্তৃতকরণ ও অপারেটরের নিজস্ব প্ল্যানিং নির্ভর বিষয়ে অভিযোগ নিষ্পত্তি করা কিছুটা সময়সাপেক্ষ হয়।
বিটিআরসির দেওয়া তথ্যমতে, ২০১৯ সালে বিভিন্ন বিষয়ে অপারেটরদের বিরুদ্ধে গ্রাহকরা অভিযোগ করেছেন ৪ লাখ ৮৭ হাজার ৮৩টি। এর মধ্যে সমাধান হয়েছে ৪ লাখ ৮৫ হাজার ৯৬৮টি অভিযোগ। অভিযোগ নিষ্পত্তির শতকরা হার ৯৯ দশমিক ৭ শতাংশ। আর ১ হাজার ১১৫টি অভিযোগের নিষ্পত্তির বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন।
জানতে চাইলে মোবাইল ফোন গ্রাহক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মহিউদ্দীন আহমেদ বলেন, ‘বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ আইন ২০০১ অনুযায়ী কোনো গ্রাহক যদি অভিযোগ করেন, তা সাত দিনের মধ্যে কমিশন নিষ্পত্তি করবেন এমন আইন রয়েছে। আইনের একটি ধারায় বলা হয়েছে, যদি অভিযোগ প্রমাণিত হয় সে ক্ষেত্রে কমিশন ওই অপারেটরকে ৩০০ কোটি টাকা পর্যন্ত জরিমানা করতে পারবে। কিন্তু আমরা লক্ষ করেছি, কমিশনে গ্রাহকের অনেক অভিযোগ জমা পড়ে রয়েছে। এমনকি গণশুনানিতে সাধারণ গ্রাহকরা অনেক অভিযোগ করে থাকেন, কিন্তু এর কোনো প্রতিকার লক্ষ করা যায় না।
আইন কী বলছে : ২০০৯ সালের ৬ এপ্রিল গেজেট আকারে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন প্রকাশ হয়। আইনের সেবার সংজ্ঞাতে টেলিযোগাযোগ রয়েছে। অর্থাৎ টেলিযোগাযোগ সেবা সংক্রান্ত অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে পদক্ষেপ নিতে পারবে ভোক্তা অধিকার অধিদফতর। আইনের ২০-এর ‘ঘ’ ধারা অনুযায়ী কোনো পণ্য বা সেবা বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে অসত্য বা মিথ্যা বিজ্ঞাপন দিয়ে ক্রেতাকে প্রতারিত করলে ব্যবস্থা নিতে পারবে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর। ‘ঙ’ ধারা অনুযায়ী প্রদত্ত মূল্যের বিনিময়ে প্রতিশ্রুত পণ্য বা সেবা যথাযথভাবে বিক্রয় বা সরবরাহ না করলে ব্যবস্থা নিতে পারবে অধিদফতর। আইনের ২১-এর (ঠ)-তে বলা হয়, কোনো পণ্য বা সেবা বিক্রয়ের জন্য অসত্য বিজ্ঞাপন দিয়ে ভোক্তাকে প্রতারিত করা হচ্ছে কি না, তার তদারকি করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে অধিদফতর। চতুর্থ অধ্যায়ে ৪৫ ধারায় বলা হয়, কোনো ব্যক্তি প্রদত্ত মূল্যের বিনিময়ে প্রতিশ্রুত পণ্য বা সেবা যথাযথভাবে বিক্রয় বা সরবরাহ না করলে তিনি অনূর্ধ্ব এক বছর কারাদণ্ড বা অনধিক ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবে। ৫৩ ধারায় বলা হয়, কোনো সেবা প্রদানকারীর অবহেলা, দায়িত্বহীনতা বা অসতর্কতার কারণে সেবাগ্রহীতার অর্থ, স্বাস্থ্য বা জীবনহানি হলে তিনি অনূর্ধ্ব তিন বছর কারাদণ্ড বা অনধিক দুই লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবে।

About the author

CrimeSearchBD

%d bloggers like this: