ক্রাইম

অবৈধ গ্যাস সংযোগ নিয়ে বিপাকে তিতাস

Written by CrimeSearchBD

কর্মকর্তাদের দুর্নীতি। অবৈধভাবে গ্যাস সংযোগ পেতে গ্রাহকদের তীব্র চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে একশ্রেণির অসাধু কর্মকর্তার সংশ্লিষ্টতায় দুর্নীতির বলয়ে হ-য-ব-র-ল অবস্থা তৈরি হয় গ্যাস সংযোগকারী এই প্রতিষ্ঠানে। আগামী ২ মাসের মধ্যে সব অবৈধ গ্যাসলাইন অপসারণ করার নির্দেশনা দিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ।
তথ্যমতে দেশে সাতটি গ্যাস বিতরণ কোম্পানি রয়েছে। ছাতক সিমেন্ট ফ্যাক্টরিতে পাইপলাইনের সাহায্যে গ্যাস সরবরাহের মাধ্যমে ১৯৬০ সালে বাংলাদেশে প্রাকৃতিক গ্যাসের উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ শুরু হয়। বাসাবাড়িতে গ্যাস সরবরাহ শুরু হয় ১৯৬৭ সালের দিকে। প্রথমে দেওয়া হয় ঢাকায়। এরপর দেশজুড়ে গ্যাসের নেটওয়ার্ক বৃদ্ধি পেয়েছে। সারা দেশে গ্যাস নেটওয়ার্কের পরিমাণ ২৪ হাজার ২৮৭ কিলোমিটার। এর মধ্যে বিতরণ ও সার্ভিস লাইন প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার। এই লাইনের ৭০ শতাংশই ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষ করে ঢাকা, কুমিল্লা ও চট্টগ্রামের পাইপলাইনের অবস্থা বেশ খারাপ। ঢাকা বিভাগে গ্যাস সরবরাহের দায়িত্বে নিয়োজিত তিতাস গ্যাসের ১২ হাজার ২৫৩ কিলোমিটার পাইপলাইন রয়েছে। এর মধ্যে ঢাকায় রয়েছে সাত হাজার কিলোমিটার, যার অধিকাংশই ঝুঁকিপূর্ণ। তিন-চার দশকের পুরনো এই নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে লাখ লাখ অবৈধ সংযোগ। একই সঙ্গে অপরিকল্পিত খোঁড়াখুঁড়িতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এই গ্যাস নেটওয়ার্ক। এভাবে জরাজীর্ণ গ্যাস পাইপলাইনগুলো দিন দিন হয়ে উঠছে প্রাণঘাতী। প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনা, যাচ্ছে প্রাণ। দগ্ধ অনেকেই মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
সূত্র জানিয়েছে, তিতাসের বিতরণ ব্যবস্থায় প্রায় ২৫০ কিলোমিটার অবৈধ লাইন রয়েছে। এর মধ্যে শুধু নারায়ণগঞ্জেই রয়েছে ১৮০ কিলোমিটার অবৈধ পাইপলাইন। এরপর রয়েছে গাজীপুর, সাভার, নরসিংদী ও ঢাকায়। কুমিল্লা ও চট্টগ্রামেও অবৈধ সংযোগ ও পাইপলাইন রয়েছে বলে জানা গেছে। চট্টগ্রামে দেড় লাখ রাইজারের মধ্যে ১৫ হাজারই ঝুঁকিপূর্ণ।
অভিযোগ পাওয়া যায় কিছু কিছু গ্রাহককে সংযোগ দিতে প্লাস্টিকের পাইপেরও ব্যবহার করা হয়। এতে করে একের পর এক দুর্ঘটনা ঘটেই যাচ্ছে। বাড়ছে শঙ্কাও। এই পরিস্থিতি সামাল দিতে দিশেহারা খোদ বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়।
এই অবস্থায় অবৈধ সংযোগ বন্ধে সরকারের পক্ষ থেকে নজরদারি বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
তিতাসের অবৈধ লাইনের বিষয়টি স্বীকার করে বিব্রত খোদ বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ। সময়ের আলোকে তিনি বলেছেন, আগামী ২ মাসের মধ্যে সব অবৈধ গ্যাসলাইন অপসারণ করতে হবে। পরিকল্পিত এলাকার বাইরে বিদ্যুৎ-জ্বালানি সংযোগ দেওয়া যাবে না। অকোপ্যান্সি সার্টিফিকেট অনুসারে সংযোগ না নিলে দ্রুত সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার নির্দেশও দিয়েছেন তিনি।
তিনি বলেন, বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে তিতাসকে সতর্ক করা হয়েছে। কিন্তু কিছুতেই কাজ হচ্ছে না উল্লেখ করে সময়ের আলোকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, জ্বালানি খাতে দিনের পর দিন আমরা ভর্তুকি দিয়ে যাচ্ছি। দেশের জ্বালানি সঙ্কট মেটাতে ব্যয়বহুল এলএনজিও আমাদের আমদানি করতে হচ্ছে। এরকম অবস্থায় যদি গ্যাস চুরি হয় এটি সত্যিই অত্যন্ত দুঃখের। তিতাসকে আমরা বারবার সতর্ক করেছি। তারাও চেষ্টা করছে কিন্তু এটি একটি সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। শিগগিরই অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হবে বলে আশ^াস দেন তিনি।
তিনি বলেন, কর্মকর্তাদের দুর্নীতি ও অসদাচরণের জন্যই রাজনীতিবিদদের বা সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে। কোন বিভাগের কোন কোন কর্মকর্তা অবৈধ কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত তাদের তালিকা করা হচ্ছে। কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ এলে প্রথমে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করে পরে অভিযোগ তদন্তের ব্যবস্থা নিন। ট্রান্সমিশন লাইনের ওপর কোনো বিল্ডিং বা স্থাপনা থাকলে দ্রুত অপসারণ করতে হবে। গ্যাসের বকেয়া বিল সংগ্রহের টাইমলাইন নির্ধারণ করুন। বিল খেলাপিদের তালিকা হালনাগাদ করে মন্ত্রণালয়ে প্রেরণের নির্দেশও দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, ইভিসি মিটার এবং প্রি-পেইড মিটার সব গ্রাহকের জন্য স্থাপন করতে হবে। অটোমেশন করার প্রক্রিয়াও ধীরগতিতে চলছে, যা কাক্সিক্ষত নয়। টাস্কফোর্সের কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করতে হবে।
নারায়ণগঞ্জের দুঃখজনক ঘটনার জন্য তিনি মর্মাহত হন। হতাহতের ঘটনায় তিতাস গ্যাসের কোনো কর্মকর্তার দায়িত্বে গাফিলতি থাকলে তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেন তিনি। অভিযোগ পাওয়া যায়, সরকার দলীয় পরিচয়ে স্থানীয় নেতা, তিতাসের ঠিকাদার এবং কতিপয় অসাধু কর্মচারী-কর্মকর্তার সমন্বয়ে একটি সিন্ডিকেট অবৈধ গ্যাসলাইন নিয়ন্ত্রণ করছে। তারা গ্রাহকদের অবৈধ গ্যাস সংযোগ দিয়ে প্রতি মাসে হাতিয়ে নিচ্ছে বিপুল অঙ্কের টাকা। একদিকে গ্যাস খাতে সরকার হারাচ্ছে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব। অন্যদিকে প্রকৃত গ্রাহকরা গ্যাস সংযোগ পেতে দিনের পর দিন হয়রানি হচ্ছে। এতে সহযোগিতা করছেন তিতাসেরই একাধিক কর্মকর্তা।
অনুসন্ধানে জানা যায়, রাজধানীর মিরপুরের পল্লবী থানার আলুব্দী এলাকায় গড়ে উঠেছে অনুমোদনহীন বেশ কয়েকটি ওয়াশ কারখানা। কারখানার বড় বড় চুলায় দিন-রাত পুড়ছে অবৈধ গ্যাস। আগুনের তাপে শুকানো হচ্ছে কাপড়। কর্মরত শ্রমিকরা জানান, অননুমোদিত এসব কারখানায় দিন-রাত ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১৫ ঘণ্টাই কাজ চলে। দীর্ঘ এই সময়ে যত গ্যাস জ্বালানো হয় তার সবই তিতাস গ্যাসের অবৈধ সংযোগের মাধ্যমে চালানো হচ্ছে।
এ রকম শতাধিক অননুমোদিত কারখানা রয়েছে মিরপুরের বিভিন্ন এলাকায়। যার সবকটিতেই অবৈধ সংযোগের মাধ্যমে প্রতিদিন মূল্যবান রাষ্ট্রীয় জ্বালানি সম্পদ গ্যাস জ্বালানো হচ্ছে। এসব দেখার কেউ নেই বললেই চলে। পরিবেশ অধিদফতরের ছাড়পত্র ছাড়াই আবাসিক এলাকায় গড়ে ওঠা অননুমোদিত কারখানাগুলোতে আবাসিক সংযোগ নিয়েও অনেকে কারখানায় গ্যাস সংযোগ নিয়ে দেদার গ্যাস অপচয় করছেন। শুধু মিরপুর নয়, রাজধানীর মগবাজার এলাকায়ও রয়েছে একাধিক অবৈধ গ্যাসের সংযোগ।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মগবাজার চেয়ারম্যান গলির ভাড়াবাসায় থাকা এক ভাড়াটিয়া সময়ের আলোকে বলেন, যেদিন থেকে বাসায় ভাড়া এসেছেন তারপর থেকে একদিনও গ্যাসের বিল দিতে হয়নি। বাড়িওয়ালাকে জিজ্ঞেস করলে বলেন সার্ভিস চার্জের সঙ্গে গ্যাসের বিল নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু হিসাব বলে গ্যাস বিল ছাড়াই বাড়িটিতে গ্যাসের সংযোগ রয়েছে।
এ বিষয়ে তিতাসের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আমরা লাইন উচ্ছেদের পরপরই আবার সেখানে নতুন লাইন বসানো হচ্ছে। এই কাজে একশ্রেণির ঠিকাদারের সঙ্গে তিতাসের কিছু কর্মীও জড়িত। এসব জায়গায় কারা লাইন দিচ্ছে, কারা বিল আদায় করছে সে বিষয়ে তদন্ত হওয়া উচিত। অবৈধভাবে গ্যাস ব্যবহার করার জন্য কঠিন শাস্তির ব্যবস্থা না করা হলে এসব বন্ধ হবে না।
এ বিষয়ে তিতাসের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও পেট্রোবাংলার পরিচালক (প্রশাসন) মোস্তফা কামাল সময়ের আলোকে বলেন, অবৈধ সংযোগ তো আমরা কেটে যাচ্ছি। কিছু কিছু ক্ষেত্রে সমস্যা তো হবেই। যেমন কোনো কারখানায় যদি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়, তখন শ্রমিকরা বেকার হয়ে যায়। এসব বিষয় আমাদের বিবেচনা করতে হয়। চাইলে তো কেটে দেওয়া যায় না। শিল্প-কারখানার ক্ষেত্রে দেশের অর্থনৈতিক বিষয়ও চিন্তা করতে হয়।
তিনি বলেন, আবাসিকের ক্ষেত্রে যেখানে অবৈধ সংযোগের খবর পাচ্ছি, সেখানেই লাইন কেটে দিচ্ছি। লাইন কেটে দেওয়ার পর সেখানে নতুন সংযোগ দেওয়া সম্ভব নয়। কারণ সেখানে আমরা ক্যাপিং করে দিই। ফলে নতুন সংযোগের জন্য নতুন পাইপ বসাতে হয়। পুরনো জায়গা খোলা সম্ভব নয়।
২০১৮ সালের এপ্রিলে দেশে এলএনজি আসে। এখন দেশে স্থাপিত দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের সরবরাহ ক্ষমতা দৈনিক এক হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। চাহিদা অনুযায়ী বার্ষিক ১৫ লাখ টনের বেশি এলপিজি সরবরাহ করতে হয়। তবে আমদানি ও বিক্রি হচ্ছে বার্ষিক প্রায় ১০ লাখ টন। এর মধ্যে মাত্র ২০ হাজার টন এলপিজি সরকারিভাবে বিক্রি হয়। তাই গ্যাসের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে যে একটা বড় রকমের ঘাটতি রয়েছে, তা সহজেই বোধগম্য। দেশে গ্যাসের আবাসিক গ্রাহক সংখ্যা ৪০ লাখ। এ খাতে দিনে ৪৩ কোটি ঘনফুট গ্যাস ব্যবহার হচ্ছে। গ্যাস সংযোগ বন্ধ থাকায় গত কয়েক বছরে বিতরণ কোম্পানিগুলোতে নতুন সংযোগের জন্য এক লাখের ওপর আবেদন জমা হয়েছে।
তিতাসের অবৈধ সংযোগের বিষয়ে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শামসুল আলম সময়ের আলোকে বলেন, এখনই সময় তিতাসের অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্নের জন্য জরুরি ব্যবস্থা নেওয়া। না হলে নারায়গঞ্জের মতো দুর্ঘটনা একের পর এক ঘটতেই থাকবে। আর আমাদের তাকিয়ে থাকা ছাড়া কিছুই করার থাকবে না।

About the author

CrimeSearchBD

%d bloggers like this: