ক্রাইম

অবৈধ অস্ত্রের চাহিদা বাড়ছে!

Written by CrimeSearchBD

আন্ডারওয়ার্ল্ডে তথা অপরাধ জগতে বাড়ছে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের চাহিদা। সন্ত্রাসীদের সেই চাহিদার জোগান দিতে তৎপর হয়ে উঠেছে দেশি-বিদেশি অবৈধ অস্ত্র ব্যবসায়ী চক্র। কেননা, গত সপ্তাহেই যশোর ও নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্ত এলাকায় এমন দুটি বড় অস্ত্রের চালান আটক করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। বিশেষ কোনো ‘ইস্যু’ না থাকলেও আকস্মিকভাবে এ রকম আগ্নেয়াস্ত্রের বড় চোরাচালান প্রবেশের কারণ খোঁজছেন গোয়েন্দারা। এর বাইরে পুলিশ ও র‌্যাবের হাতেও সম্প্রতি দেশি-বিদেশি অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনা রয়েছে। ফলে সন্ত্রাসীদের মধ্যে চাহিদা বৃদ্ধির কারণে অস্ত্রের চোরাচালান প্রবেশের চেষ্টা করা হচ্ছে বলে মনে করছেন অপরাধ বিজ্ঞানীরা।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের (ঢাবি) ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড ক্রিমিনাল জাস্টিস বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. জিয়া রহমান সময়ের আলোকে জানান, বর্তমানে দেশে বিশেষ কোনো ‘ইস্যু’ নেই, যেটাকে সামনে রেখে অবৈধ অস্ত্র ঢুকবে। তবে স্বাভাবিকভাবেই সন্ত্রাসীদের মধ্যে যখন চাহিদা বাড়ে তখন অস্ত্র বেশি প্রবেশ ঘটে। আপাতত আলাদা কোনো কারণ দেখছি না। এমন হতে পারে পরবর্তীতে ব্যবহারের জন্য পেশাদার অপরাধী চক্র সময়-সুযোগ বুঝে আগ্নেয়াস্ত্র মজুদের চেষ্টা করছে।
এ প্রসঙ্গে পুলিশের অ্যান্টি টেররিজম ইউনিটের (এটিইউ) প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মো. মনিরুজ্জামান সময়ের আলোকে জানান, ‘অবৈধ অস্ত্রের চাহিদা বৃদ্ধি বা সন্ত্রাসীদের তৎপরতা বেড়ে যাওয়ার সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য আমাদের কাছে নেই। তবে আমরা সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে সার্বক্ষণিক কাজ করে যাচ্ছি।’
জানা যায়, গত ৫ সেপ্টেম্বর বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ যশোর সীমান্তের দুই নম্বর ঘিবা এলাকা থেকে ভারতীয় ১১টি পিস্তল, ২২টি ম্যাগজিন, ৫০ রাউন্ড গুলি এবং ১৪ কেজি গাঁজাসহ তিন অপরাধীকে আটক করে। আটক তিনজন হলোÑ সাজজুল, আলমগীর হোসেন ও আনারুল ইসলাম। আটক তিনজনেরই বাড়ি যশোরের বেনাপোল পোর্ট থানা এলাকায়। এর আগের দিনই ৪ সেপ্টেম্বর বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্ত এলাকায় বিজিবির অভিযানে ৪টি এসবিবিএল (সিঙ্গেল ব্যারেল ব্রিচ লোডিং) ও ১টি দেশীয় অস্ত্র (একনলা বন্দুক), ২টি অস্ত্র তৈরির ব্যারেল, একটি কার্তুজ এবং ৫টি কার্তুজের খালি খোসা জব্দ করা হয়। তবে বিজিবির অভিযান টের পেয়ে এসব অস্ত্রের চালান বহনকারীরা পালিয়ে যায় বলে জানা যায়।
এ প্রসঙ্গে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফয়জুর রহমান সময়ের আলোকে জানান, প্রায় সময়ই বিজিবির অভিযানে অবৈধ অস্ত্র ধরা পড়ছে। তবে একসঙ্গে বেশি পরিমাণের ওই (যশোর ও নাইক্ষ্যংছড়ি) আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধারের ঘটনায় প্রাথমিকভাবে বিশেষ কোনো ইস্যু দেখছি না। এ বিষয়ে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো হয়তো কাজ করছে। ফয়জুর রহমান বলেন, সীমান্তে বিজিবির পক্ষ থেকে শতভাগ নিষ্ঠা ও সতর্কতার সঙ্গে সার্বক্ষণিক নজরদারি করা হচ্ছে। সে কারণে অপরাধী চক্র যখনই অবৈধ কোনো কিছু প্রবেশ বা পাচারের অপচেষ্টা করছে তখনই ধরা পড়ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত বৃহস্পতিবার রাতে র‌্যাব-৪ ব্যাটালিয়নের একটি দল মিরপুর-১০ এলাকা থেকে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রসহ (শুটারগান) দুই ছিনতাইকারীকে গ্রেফতার করে। তার আগে গত ৮ সেপ্টেম্বর রাজধানীর কোতোয়ালি থানাধীন বাদামতলী এলাকায় অভিযান চালিয়ে একটি বিদেশি রিভলবার ও গুলিসহ মাহবুব আলম মিম নামে এক যুবককে গ্রেফতার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের তেজগাঁও বিভাগ। এর আগে গত ১৩ আগস্ট রাজধানীর ভাসানটেক এলাকা থেকে একটি বিদেশি পিস্তল ও দেশীয় অস্ত্রসহ পাঁচজনকে গ্রেফতার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের গোয়েন্দা তেজগাঁও বিভাগ। এ ছাড়া গত ৩১ জুলাই বরিশালের বানারীপাড়া থেকে বিদেশি অস্ত্র ও গুলিসহ এক সন্ত্রাসীকে আটক করে র‌্যাব-৮ ব্যাটালিয়ন।
র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার উপপরিচালক মেজর হুসাইন রইসুল আজম মনি সময়ের আলোকে জানান, অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র ও অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে র‌্যাব সার্বক্ষণিক গোয়েন্দা নজরদারি ও নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করে যাচ্ছে। বিগত সময়ে অনেক বড় বড় অস্ত্রের চালান আটক করতে সক্ষম হয়েছে র‌্যাব। সেই ধারাবাহিকতায় প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে গত আগস্ট পর্যন্ত র‌্যাবের অভিযানে ১৬ হাজার ৬৭৬টি বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। এসব ঘটনায় গ্রেফতার করা হয়েছে ১২ হাজার ৪৯৮ জনকে। কেবল চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে গত ৩১ আগস্ট পর্যন্ত সাত মাসে র‌্যাবের অভিযানে বিভিন্ন ধরনের ৪৩৫টি অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। এ সময়ে গ্রেফতার করা হয় ৩৩৪ জনকে।
‘ইন্টারন্যাশনাল সোসাইটি অব ক্রিমিনোলজি’র বোর্ড অব ডিরেক্টর ঢাবি অধ্যাপক জিয়া রহমান আরও বলেন, প্রায় সময়ই দেখা যাচ্ছে, সীমান্ত দিয়ে অস্ত্র ও ইয়াবাসহ নানা মাদক প্রবেশ করছে। আমাদের সীমান্ত এতটা সুরক্ষিত নয় যে, কোনো কিছু ঢুকবে না। সীমান্তে যে ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা আছে তা পর্যাপ্ত নয়। অবৈধ অস্ত্র বা মাদক প্রবেশ বন্ধ করতে হলে সীমান্তের নিরাপত্তা ব্যবস্থার আরও উন্নয়ন জরুরি। সীমান্তে যারা এ সংক্রান্ত বিষয়ে দায়িত্ব পালন করছেন তাদের বিষয়েও বাড়তি মনিটরিং করতে হবে। যারা আন্তরিকতার সঙ্গে ভালোভাবে দায়িত্ব পালন করবেন তাদের মূল্যায়ন করা বা পুরস্কৃত করতে হবে। তেমনি যারা দায়িত্বহীনতার পরিচয় দেবেন বা অপরাধী চক্রের সঙ্গে কোনোভাবে হাত মেলাবেন তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
একাধিক অপরাধ বিশ্লেষকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দেশে যেসব আগ্নেয়াস্ত্র সন্ত্রাসীরা সাধারণত ব্যবহার করে থাকে তার অধিকাংশই বিদেশি। যার মধ্যে ভারতীয়, চাইনিজ, ইতালিয়ান, কোরিয়ান ও যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি অস্ত্রই বেশি। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদেশি অস্ত্রগুলোর প্রত্যেকটিতেই তাদের কারখানায় তৈরির সময় বিশেষ নম্বর ও কোড ব্যবহার করা হয়। ওই অস্ত্র পরবর্তীতে যে ডিলার প্রতিষ্ঠান খুচরা বা পাইকারি বিক্রির জন্য কিনে নেয় তার সব তথ্য অস্ত্র তৈরির কোম্পানির কাছে সংরক্ষিত থাকে। এভাবে একজন গ্রাহক বা ক্রেতা যখন সেই ডিলার প্রতিষ্ঠান থেকে অস্ত্র কিনে তখন সেই ব্যক্তিরও জন্য সরকারের অনুমতিপত্রসহ সব ধরনের তথ্য সংরক্ষণ করা হয়। অর্থাৎ অস্ত্র তৈরি থেকে শুরু করে যার হাতে ব্যবহার হচ্ছে সব তথ্যই সংশ্লিষ্ট মাধ্যমগুলোর কাছে সংরক্ষিত থাকে। তা হলে প্রশ্ন হলোÑ আগ্নেয়াস্ত্র কেনাবেচার এমন প্রক্রিয়ার মাঝেও কী করে চোরাইভাবে অস্ত্র পাচার হচ্ছে। কী করে অবৈধভাবে দেদার অস্ত্র কেনাবেচা চলছে। অপরাধী চক্রের মাধ্যমে চাইলেই যে কেউ অস্ত্র কিনতে পারছে! তা হলে মূল গলদ কোথায়? এ বিষয়গুলো রাষ্ট্রীয়ভাবে খতিয়ে দেখলে অবৈধ অস্ত্রের চোরাচালানের উৎস সম্পর্কে জানা যেতে পারে। পাশাপাশি অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহারও অনেকাংশেই কমানো সম্ভব বলে মন্তব্য করেন বিশেষজ্ঞরা।

About the author

CrimeSearchBD

%d bloggers like this: